10/03/2026
আজ রাতেও হতে পারে লাইলাতুল ক্বদর!
সম্ভাব্য শবে ক্বদর - ২১ রামাদান বিজোড় রাত্রি
আজ (১০ মার্চ, ২০২৬) ২০ রমাদান। আজকের মাগরিবের ওয়াক্তের মধ্য দিয়ে শুরু হয়ে যাবে ২১ রমাদান। অর্থাৎ এটি শেষ দশকের একটি বিজোড় রাত। তাই আজকের রাতটিও হতে পারে মহিমান্বিত লাইলাতুল ক্বদর। যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম! এ রাতের আমলের সওয়াব ইনশাআল্লাহ ৮৩ বছরের প্রত্যেক রাতে করা আমলের সওয়াবের মত বাড়িয়ে দেয়া হবে। এ রাতের ২ রাকাত সালাতের সওয়াব, ৮৩ বছর যাবত প্রতি রাতে ২ রাকাত করে সালাত আদায়ের সওয়াব হিসাবে আমলনামায় যোগ হবে ইনশাআল্লাহ। এ রাতের ১০ টাকা সাদাকা ইনশাআল্লাহ ৮৩ বছর যাবত প্রত্যেক রাতে ১০ টাকা করে সাদাকার সওয়াব হিসাবে আমলনামায় যোগ হবে ইনশাআল্লাহ। যার পরিমাণ প্রায় ৩ লক্ষ টাকা!
তাই আসুন খুব সহজ চারটি ইবাদত করি রমাদানের শেষের ১০ রাতে। তাহলে ইনশাআল্লাহ আমরা শবে ক্বদরের ফজিলত হাসিল করতে পারব। কাজগুলো হচ্ছেঃ
১। সালাত
২। কুরআন তিলাওয়াত
৩। দান সাদাকা
৪। দুআ
এবার একটু বিস্তারিত আলোচনা করা যাক।
১। সালাত
------------------
আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ
যে ব্যক্তি লাইলাতুল ক্বদ্রে ঈমানের সাথে সাওয়াবের আশায় রাত জেগে ‘ইবাদাত করে, তার পিছনের সমস্ত গোনাহ ক্ষমা করা হবে। আর যে ব্যক্তি ঈমানসহ সওয়াবের আশায় রমযানে সিয়াম পালন করবে, তারও অতীতের সমস্ত গোনাহ মাফ করা হবে।
(বুখারী ১৯০১)
তাই প্রতি রাতে, বিশেষ করে প্রতি বিজোড় রাতে মাগরিবের পর থেকে ফজরের আগ পর্যন্ত, সাহরির সময়ে সাধ্য মত ক্বদরের রাতের নিয়তে কিছু সালাত আদায় করি। ২-৪-৬-৮ যত রাকাত ইচ্ছা তত রাকাত। রাকাত সংখ্যার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সালাতের কোয়ালিটি! অর্থাৎ কতটা মনোযোগ দিলাম। কতটা দীর্ঘ রুকু ও সিজদা করলাম। রুকু থেকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম কত সময়? দুই সিজদার মাঝে দীর্ঘ সময় বসে দুআ করলাম কিনা? এগুলো দেখার বিষয়। আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা উচিত সালাতকে সুন্দর করার জন্য। যেই সূরা জানি সেই সূরা পড়ব সালাতে। এ রাতের সালাতের জন্য বিশেষ কোনো নিয়ম বা বিশেষ কোনো সূরা নাই।
২। কুরআন তিলাওয়াত
------------------------------
শেষ দশকের প্রতি রাতে কুরআন থেকে অন্তত কিছু আয়াত তিলাওয়াত করি। কুরআন বের করে কিছু আয়াত হলেও পড়ি। সেটা সম্ভব না হলে ফোনের মাধ্যমে কিছু পড়ি। তাও সম্ভব না হলে যেই সূরাগুলো মুখস্থ আছে সেগুলো অন্তত তিলাওয়াত করি। তিনবার সূরা ইখলাস অন্তত পড়তে পারি। যাতে পুরো কুরআন একবার তিলাওয়াত করার সমান সওয়াব পাওয়া যায়। ইনশাআল্লাহ ক্বদরের রাত্রিতে এই ইবাদত আল্লাহ বহু গুণে বাড়িয়ে দিবেন। কুরআন তিলাওয়াত করা হলে হাশরের দিন কুরআন আমাদের জন্য সুপারিশ করবে! তাই এই মুবারক রাতে কুরআন তিলাওয়াত করি।
৩। সাদাকা
---------------------------
রমাদানের শেষ দশকের প্রতি রাতে সাধ্য মত সাদাকা করি। কারো যদি সামর্থ্য একেবারেই না থাকে ৫ টাকা করে অন্তত দান হয়ত আমরা করতেই পারি। মাগরিবের পর যদি বাইরে বের হওয়া হয় তাহলে কোনো ফকির-মিসকিনকে দান করি। করোনার জন্য লকডাউন সিচুয়েশনে বের হওয়া সম্ভব না হলে গরীবদের জন্য কাজ করে এমন কোনো প্রতিষ্ঠানে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সাদাকা করতে পারি। অথবা আমাদের বাসায় সাদাকা বক্স বানাতে পারি। যেখানো প্রতি রাতেই কিছু টাকা জমা করে পরে একবারে কাউকে দিয়ে দিব। অর্থাৎ শবে ক্বদরের রাতে যেন সাদাকা করার মত এত বড় একটা ইবাদত থেকে আমরা বঞ্চিত না হই।
৪। দুআ করা
----------------------------
দুআ হচ্ছে ইবাদতের মূল। আমাদের উচিত রমাদানের প্রতিটা রাতে আল্লাহর কাছে আমাদের সকল চাওয়া-পাওয়া পেশ করা। করোনা থেকে আমাদের জাতি ও বিশ্বকে মুক্তি দেয়ার জন্য আমরা দুআ করব। অর্থনৈতিক মন্দা ও দুর্ভিক্ষ থেকে আল্লাহর কাছে রক্ষা চাইবো। বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের উপর জুলুম নির্যাতনের বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানাবো। আমাদের পড়াশোনা, চাকরি-বিজনেস, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক শান্তির জন্য দুআ করব। কবরবাসীদের জন্য দুআ করব। আমাদের নিজেদের জন্য দুআ করার পাশাপাশি আমাদের অপর ভাইয়ের জন্য দুআ করব। কারণ নিজের জন্য যে দুআ করব সেটার সাথে যদি অপর ভাইয়ের জন্যও সেই ভাল দুআ করি, তাহলে আল্লাহর উপর ওয়াজিব হয়ে যায় আমার জন্য যে দুআ করেছি সেটাকে কবুল করা! সুবহানাল্লাহ!
তাই আমরা যখনই অবসর পাব তখনই দুআ করতে থাকব। দুআ করতে তো টাকা-পয়সা লাগে না। বিশেষ ভাবে বসে ক্বিবলামুখী হয়ে যেমন দুআ করা যায়। আবার হাঁটতে চলতে, শুয়ে বসে থেকেও দুআ করা যায়। দুআ আল্লাহর সাথে বান্দার সরাসরি কানেকশন। এই কানেকশন করিয়ে দেয়ার জন্য মাঝখানে কোনো মাধ্যম নাই। আপনি যা বলবেন, আল্লাহ তা শুনবেন। আল্লাহকে আপনার কথাগুলো বলার জন্য কোনো হুজুরের কাছে যেতে হবে না, পীরের কাছে যেতে হবে না, কোনো আল্লাহর ওলীর কাছে বা ওলীর মাজারে যেতে হবে না। আপনি মন থেকে যা বলবেন, আল্লাহ তা সবটাই শুনবেন। আল্লাহ আর তার বান্দার মাঝে সম্পর্কটা সরাসরি সম্পর্ক! মাঝে কোনো মাধ্যম নাই। প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করার জন্য মাঝে মন্ত্রী-এমপির সুপারিশ লাগে। কারণ প্রধানমন্ত্রী আমাকে চিনেন না। কিন্তু সারা জাহানের বাদশাহ আল্লাহ তো আমাদের সবাইকে চিনেন, জানেন। তাই মনের সকল কথা তাঁর কাছে উজার করে দিতে পারি। মাঝে কোনো উকিল ধরার প্রয়োজন হয় না!
শবে ক্বদরের ইবাদতের মধ্যে হাদীসের সরাসরি নির্দেশনা পাওয়া যায় দুআ করার ব্যাপারে। একটা বিশেষ দুআও হাদীসে উল্লেখ আছে। আমাদের দুনিয়া আখিরাতের অন্যান্য দুআর সাথে বেশি বেশি করে নিচের দুআটি পড়ব।
اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ كَرِيمٌ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي
"হে আল্লাহ! তুমি সম্মানিত ক্ষমাকারী, তুমি মাফ করতেই পছন্দ কর, অতএব তুমি আমাকে মাফ করে দাও"
(তিরমিযি ৩৫১৩)
আমরা জানি গফুর আল্লাহর একটি গুণবাচক নাম যার অর্থ ক্ষমাশীল, আবার 'আফুউন অর্থও ক্ষমাশীল। কিন্তু দুটির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। গফুর অর্থ এমন ক্ষমা যেটা ক্ষমা করার পরও আমলনামায় লিপিবদ্ধ থাকবে। কিয়ামতের দিন সমগ্র মানবজাতির সামনে সেটা প্রকাশ পাবে। অপরপক্ষ আফুউন বলতে এমন ক্ষমাকারীকে বুঝায় যিনি ক্ষমা করবেন এমন ভাবে যে সেটা একেবারে মুছে যাবে। কিয়ামতের দিন সেটা প্রকাশ পাবে না। প্রথমটাকে তুলনা করতে পারি কম্পিউটারের ডিলেট অপশনের সাথে। আর শেষেরটা হচ্ছে শিফট-ডিলেটের মত। অর্থাৎ পরিপূর্ণ ভাবে ক্ষমা।
আল্লাহ আমাদেরকে এমন ভাবে ক্ষমা করুন যেন গুনাহগুলো দুনিয়া বা আখিরাতে কারো সামনে প্রকাশ হয়ে না পড়ে। আমীন।
আল্লাহ আমাদের সবার জীবনে বেশি বেশি শবে ক্বদর পাওয়ার তাওফিক দান করুন। আমীন।