18/08/2026
প্রশ্নঃ
আমি জানি যে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা আরশের উপর আছেন যা তাঁর সৃষ্টিরাজির উপরে। কিন্তু আমি ইন্টারনেটে কোথাও পড়েছি যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা সালাত আদায়রত ব্যক্তির সামনে আছেন। এর ব্যাখ্যা কি? এ কারণেই কি নামাযির সামনে দিয়ে যাওয়া হারাম?
উত্তরঃ
আলহামদুলিল্লাহ।
প্রথমতঃ
সহীহুল বুখারী ও সহীহ মুসলিমে ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার রাযি. হতে বর্ণিত হয়েছে,
"আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ক্বিবলার দিকের দেওয়ালে থুথু দেখে তা পরিষ্কার করে দিলেন। অতঃপর লোকদের দিকে ফিরে বললেনঃ যখন তোমাদের কেউ সালাত আদায় করে সে যেন তার সামনের দিকে থুথু না ফেলে। কেননা, সে যখন সালাত আদায় করে তখন তার সামনের দিকে আল্লাহ তা‘আলা থাকেন।" [বুখারী, হা/৪০৬; মুসলিম, হা/৫৪৭]
মহিমাময় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বাস্তবিক অর্থেই আরশের উপরে আছেন। তাঁর মর্যাদার সাথে মানানসই ভাবে তিনি বাস্তবিক অর্থেই মুসল্লির সামনেও আছেন ।
ইবনুল কাইয়্যিম রহিমাহুল্লাহ বলেছেনঃ
"...দু'টো বিষয়ের মাঝে পরস্পর বিরোধিতা নেই। যেদিকেই মুসল্লি মুখ ঘোরায়, সেটাই আল্লাহ'র কিবলা এবং সে তার রবের সামনাসামনি। যেহেতু তিনি সর্বব্যাপী বা সবকিছুকে পরিবেষ্টনকারী (واسع)। বান্দা যখন সালাতে দাঁড়ায় সে তাঁর সুমহান রবের সামনাসামনি থাকে এবং আল্লাহ তা'য়ালা প্রত্যেক মুসল্লির সম্মুখে থাকেন। যেমনটা রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে অনেক সহীহ মুতাওয়াতির [অনেকগুলো চেইনে বর্ণিত] হাদীছে এসেছে। ُ
আক্বল, ফিতরাত এবং আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা'র সমস্ত ঐশী কিতাবাদি এটাই নির্দেশ করে যে তিনি সমস্ত মাখলুকের উপরে 'সুউচ্চ' (عال)। তিনি আরশের উপরে আছেন, তাঁর আরশ সমস্ত আসমানরাজির উপরে, পবিত্র সুমহান আল্লাহ সমস্ত জগৎসমূহের পরিবেষ্টনকারী (محيط)। বান্দা যে দেদিকেই মুখ ফেরায়, সেদিকেই আল্লাহর সামনাসামনি থাকে।
বরং তাঁর সৃষ্টিরাজির মধ্যে বড় মাখলুক কর্তৃক অপেক্ষাকৃত ছোট মাখলুককে 'পরিবেষ্টন করার' বৈশিষ্ট্য রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বৃত্তের কেন্দ্রথেকে বৃত্তের পরিধির দিকে নির্গত প্রতিটি রেখা ও বৃত্তের পরিধি পরস্পর সামনাসামনি; এবং কেন্দ্র পরিধির সামনাসামনি।
যখন সব দিক থেকেই পরিবেষ্টনকারী বড় মাখলুক পরিবেষ্টনকৃত ছোট মাখলুকের সামনা-সামনি হয়, তখন সবকিছুকে পরিবেষ্টনকারী আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা'র ব্যাপারটি কেমন হতে পারে? তিনি শুধুই পরিবেষ্টনকারী; পরিবেষ্টনকৃত নন। তাহলে বান্দা আল্লাহ'র সামনা-সামনি হবে, এটা কিভাবে অসম্ভবপর হতে পারে?! বান্দা যেখানেই থাকুক না কেন!" সমাপ্ত। [মুখতাসারু সাওয়ায়িক্বিল মুরসালাহ ১/৪১৭]
শাইখ ইবন উসাইমীন রহিমাহুল্লাহ বলেছেনঃ
আল্লাহ'র সত্তাগতভাবে সবকিছুর উপরে থাকা (علو) এবং মুসল্লির সামনে থাকার বর্ণনাগুলোকে কয়েকভাবে সমন্বয় করা যেতে পারে।
একঃ এই দুটো বিষয়ের মাঝে সহীহ বর্ণনাগুলোকে (নস) সমন্বয় করা, আর এটা অসম্ভব নয়।
দুইঃ সবকিছুর ঊর্ধ্বে থাকা (علو) এবং পরস্পর সামনা-সামনি হওয়ার (مقابلة) মাঝে কোন বৈপরীত্য নেই। কোন কিছু একই সাথে উঁচুতে এবং সামনা-সামনি হতে পারে। কেননা সামনা-সামনি হওয়ার জন্য পরস্পর কাছাকাছি হওয়া প্রয়োজনীয় না। তুমি কি দেখনি কোন ব্যক্তি সূর্যোদয়ের সময় সূর্যের দিকে তাকিয়ে বলল সূর্যটি আমার সামনে। যদিও এটা আকাশে। এটা শব্দগত বা অর্থগতভাবে পরস্পর বিরোধী নয়। সুতরাং যখন এটা সৃষ্টির ক্ষেত্রে যথাযথ হয়, তখন স্রষ্টার ক্ষেত্রে অধিক যথাযথ।
তিনঃ যদি এটা ধরেও নেয়া হয় মাখলুকের ঊর্ধ্বে থাকা (علو) এবং পরস্পর সামনা-সামনি হওয়ার (مقابلة) মাঝে বৈপরীত্য বা অসংগতি আছে তবুও এই দু'টো বৈশিষ্ট্য স্রষ্টার সাথে যথাযথ হওয়াতে কোন বাধা নেই। কেননা তাঁর সুমহান সকল সিফাতের [বৈশিষ্ট্যের] ক্ষেত্রে তাঁর মতো কোন কিছু নেই। ফলে মুসল্লির সামনা-সামনি হতে মুসল্লির জায়গাতে অথবা মুসল্লির সামনের দেওয়ালে আসা প্রয়োজনীয় না। কেননা সত্তাগতভাবে তিনি সকল কিছুর উর্ধ্বে। সৃষ্টিরাজি তাঁকে বেষ্টন করে না, বরং তিনিই সকল কিছুকে পরিবেষ্টনকারী। [মাজমূউল ফাতাওয়া ওয়া রসায়িলিল উছাইমীন ৫১/৪]
শাইখ ইবন উসাইমীন রহিমাহুল্লাহ আরো বলেছেনঃ
সম্মুখ দিকে থুথু ফেলতে নিষেধের কারণ আল্লাহ সামনা-সামনি থাকেন। যখন কেউ সালাতের উদ্দেশ্যে আল্লাহর ঘর কা'বার দিকে মুখ ফেরায়, তখন আল্লাহ তার সামনে থাকেন। ব্যক্তিটি যেখান থেকেই কা'বার দিকে মুখ ফেরাক না কেন। কেননা আল্লাহ সব কিছুকে পরিবেষ্টনকারী। যেমন তিনি বলেছেনঃ
( وَلِلَّهِ الْمَشْرِقُ وَالْمَغْرِبُ فَأَيْنَمَا تُوَلُّوا فَثَمَّ وَجْهُ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ وَاسِعٌ عَلِيمٌ )
"আর পূর্ব ও পশ্চিম আল্লাহ্রই সুতরাং যেদিকেই তোমরা মুখ ফিরাও না কেন, সেদিকই আল্লাহ্র দিক। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ সর্বব্যাপী, সর্বজ্ঞ।" [সূরা বাকারাহ, ১১৫]
আর এটা আদাবের খেলাফ যে তুমি সম্মুখদিকে থুথু ফেলছ। যেহেতু আল্লাহ্ তোমার সামনা-সামনি আছেন। সমাপ্ত। [শারহুল মুমতি' ২৬৯/৩]
দ্বিতীয়তঃ
ইমাম বুখারী [৫০৯] ও মুসলিম [৫০৫] আবূ সাঈদ খুদরী রাদিআল্লাহু 'আনহু হতে বর্ণনা করেছেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছি যে, তোমাদের কেউ যদি লোকদের জন্য সামনে সুতরাং রেখে সালাত আদায় করে, আর কেউ যদি তার সামনে দিয়ে যেতে চায়, তাহলে যেন সে তাকে বাধা দেয়। সে যদি না মানে, তবে সে ব্যক্তি (মুসল্লী) যেন তার সাথে লড়াই করে, কেননা সে শয়তান।
ইমাম আবূ দাউদ [৬৯৫] সাহল ইবনু আবূ হাসমাহ রাদিআল্লাহু 'আনহু সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, তার নিকট সংবাদ পৌঁছেছে যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কেউ সু্তরাহ স্থাপন করে সলাত আদায় করলে যেন সু্তরার কাছাকাছি দাঁড়ায়। যাতে করে শয়তান তার সলাত ভঙ্গ করতে না পারে। আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
সুতরাং এটা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, মুসল্লির সামনে দিয়ে যাওয়া নিষেধের সাথে আল্লাহ'র ব্যাপারে যা উল্লেখ করা হয়েছে তার সাথে কোন সম্পর্ক নেই, বরং এখানে উদ্দেশ্য: শয়তানকে মুসল্লির সামনে দিয়ে যেতে বাধা দেওয়া। মুসল্লির হৃদয়কে সালাতের ব্যাপারে মনোযোগী করা, যাতে সালাত ব্যতীত অন্য কোন দিকে মন না যায়।
আওনুল মা'বূদ [২/২৭৫] গ্রন্থে গ্রন্থাকার উল্লেখ করছেনঃ
"শয়তান মুসল্লিকে ওয়াসওয়াসা এবং প্রভাবিত করার সুযোগের জন্য ওঁতপেতে থাকে। সুতরাহ মুসল্লিকে শয়তানের প্রভাব থেকে দূরে রাখার ফায়েদা দেয়; ক্বলবের উপর শয়তানের ওয়াসওসা থেকে দূরে রাখে। পুরোপুরিভাবে অথবা আংশিকভাবে। মুসল্লির আন্তরিকতা ও সালাতের মধ্যে আল্লাহ্ তা'য়ালার দিকে ব্যক্তির মনোযোগের ভিত্তিতে। আর এর ব্যত্যয় ঘটলে শয়তান মুসল্লিকে সালাতের খুশূ-খুযূ (একাগ্রতা, বিনয় ও বশ্যতা) থেকে অপসারিত করে।" সমাপ্ত।
ইমাম নববী রহিমাহুল্লাহ বলেছেনঃ
"বিদ্বানগণ বলেছেন, সুতরার হিকমাহ হলো সুতরার বাইরে থেকে দৃষ্টিকে আটকে রাখা, কাছ দিয়ে কারো অতিক্রমকে বাধা দেওয়া" [শারহু মুসলিম ৪/২১৬]
ইমাম কামাল ইবনু হুমাম রহিমাহুল্লাহ বলেছেনঃ
"সুতরার উদ্দেশ্য মনঃসংযোগের সাথে অন্তঃকরণের একত্রিতকরণ যাতে মন এদিক-ওদিক বিক্ষিপ্ত না হয়।" [ফাতহুল ক্বাদীর ৪০৮/১]
আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভালো জানেন।
__
উৎসঃ ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জাওয়াব, ফাতাওয়া নং ২২৫০৩১।
লিংকঃ https://tinyurl.com/HadithExplanation
অনুবাদঃ
راشد بن رفيق السرجغنجي