17/05/2025
বহুবিবাহ সম্পকে আইন ও পর্যালোচনা:
মুসলিম পারিবারিক আইনে অন্যতম বিতর্কিত বিষয় হলো বহুবিবাহ নানাজন নানাভাবে এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা যায় ইসলাম পূর্ব আরবে বহুবিবাহর প্রচলন ছিল। গোত্রীয় সংঘাতের কারণে বহু নারী বিধবা বা এতিম হয়ে পড়াই এর মুখ্য কারণ। মূলত তাদের আশ্রয় ও নিরাপত্তার জন্যই ইসলাম বহুবিবাহ অনুমোদন করে। তবে ইসলাম বহুবিবাহের সংখ্যাকে সীমিত করে দিয়েছে এবং স্ত্রীদের প্রতি আচরণ কেমন হবে সেটা ঠিক করে দেওয়ার মাধ্যমে বহুবিবাহ বিষয়ে ইসলামের উদ্দেশ্য পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে (Dr. Rabia Bhuiyan, Gender & Tradition in Marriage & Divorce, An analysis of Personal Laws of Muslim and Hindu Women in Bangladesh, Published by United Nations Educational, Scientific and Cultural Organization; p.93)
ইসলাম বহুবিবাহের এই প্রচলিত ব্যবস্থা সীমিত করে এর সর্বোচ্চ সংখ্যা নির্ধারিত করে দেয় ৪-এ। এ সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতের নানা ব্যাখ্যার কারণে বিভিন্ন রকম মতবাদের উদ্ভব হয়। ফলে সৃষ্টি হয় জটিলতার। পবিত্র কোরআনে বলা আছে (সুরা নিসা, আয়াত-৪):
"আর তোমরা যদি আশঙ্কা কর যে পিতৃহীনদের ওপর সুবিচার করতে পারবে না তবে বিয়ে করবে (স্বাধীন) নারীদের মধ্যে যাকে তোমাদের ভালো লাগে, দুই, তিন বা চার জনকে। আর যদি আশঙ্কা কর যে সুবিচার করতে পারবে না তবে একজনকে বা তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসীকে। এভাবেই তোমাদের পক্ষপাতিত্ব না করার সম্ভবনা বেশি।"
এই অংশ থেকেই পরিষ্কার যে ইসলাম বরং এক বিবাহই সমর্থন করে। কিন্তু প্রথাগত আইনজ্ঞরা এই আয়াতের ব্যাখ্যা করছেন ইসলাম একই সময়ে একজন পুরুষের চারজন পর্যন্ত স্ত্রী থাকার বিষয়টি শর্তসাপেক্ষে অনুমোদন করে। শর্ত পূরণের কাজটি করতে হবে স্বামীকে। তারা মনে করেন শর্তের মধ্যে শুধু ভরণপোষণ এবং আনুসাঙ্গিক ব্যবস্থাই অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে আধুনিক আইনজ্ঞরা বলছেন শুধু ভরণপোষণই নয়, বরং স্নেহ-মমতা ও গুরুত্বও সমানভাবে দিতে হবে, একজন মানুষের পক্ষে যা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কাজেই বলা যায় ইসলাম বহুবিবাহ নয়, বরং একক বিবাহই অনুমোদন করে এবং বহুবিবাহকে এক রকম নিষেধই করেছে। এই যুক্তির পক্ষে সুরাহ নিসার ১২৯ নম্বর আয়াত উদ্ধৃত করা যায় যেখানে বলা হয়েছেঃ
"আর তোমরা যতই ইচ্ছা কর না কেন তোমাদের স্ত্রীদের সাথে কখনোই সমান ব্যবহার করতে পারবে না।"
পবিত্র কোরাআন আরও বলে (সুরা নাবা, আয়াত-৮)।
"আমি তোমাদেরকে জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছি।"
তাহের মাহমুদ বহুবিবাহের বিষয়টি দেখেছেন এভাবে- 'কোরআনে বহুবিবাহের অনুমোদনের বিষয়টি একটি ব্যতিক্রম, একে নিয়ম বলা যাবে না' (Tahir Mahmood, An Indian civil Code and Islamic Law (Bombay, 1976) pp.87,88).
প্রণীত আইনে বহুবিবাহ
মুসলিম পারিবারিক আইন বহুবিবাহ অনুমোদন করলেও, The Dissolution of Muslim Marriages Act, 1939-এর ধারা-২ (iia) এ বলা হয়েছে- মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের, ১৯৬১ এর বিধান লঙ্ঘন করে স্বামী যদি অতিরিক্ত স্ত্রী গ্রহণ করে, তবে স্ত্রী বিবাহ-বিচ্ছেদের ডিক্রি পাবেন। পরবর্তী সময়ে এই বিধান আরও সীমিত করা হয়। পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ধারা-৬ এর মাধ্যমে। এতে বলা হয়েছেঃ
(1) No man, during the subsistence of an existing marriage, shall, except with the previous permission in writing of the Arbitration Council, contract another marriage, nor shall, any such marriage contracted without such permission be registered under the Muslim Marriages and Divorces (Registration) Act, 1974 (LII of 1974).
(2) An application for permission under sub-section (1) shall be submitted to the chairman in the prescribed manner, together with the prescribed fees, and shall state the reasons for the proposed marriage, and whether the consent of the existing wife or wives has been obtained thereto.
(3) On receipt of the application under the sub-section (2), the Chairman shall ask the applicant and his existing wife or wives each to nominate a representative, and the Arbitration Council so constituted may, if satisfied that the proposed marriage is necessary and just, grant, subject to such conditions, if any, as may be deemed fit, the permission applied for.
(4) In deciding the application the Arbitration Council shall record its reasons for the decision, and any party may, in the prescribed manner, within the prescribed period, and on payment of the prescribed fee, prefer an application for revision to the Assistant Judge concerned and his decision shall be final and shall not be called in question in any court.
(5) Any man who contracts another marriage without the permission of the Arbitration Council shall-
a. pay immediately the entire amount of the dower, whether prompt of deferred, due to the existing wife or wives, which amount, if not so paid, shall be recoverable as arrears of land revenue; and b. on conviction upon complaint be punishable with simple imprisonment which may extend to one year, or with fine which may extend to ten thousand taka or with both.
অর্থাৎ আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতি ছাড়া এক বিয়ে বর্তমান থাকা অবস্থায়, দ্বিতীয় বিয়ে রেজিস্ট্রেশন করা যাবে না, করলে তা হবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ শর্ত আরোপের মাধ্যমে বহুবিবাহকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
এছাড়া পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ এর অধীনে প্রণীত ১৪ ও ১৫ বিধিতে আরো একটি বিবাহ করার সম্ভাব্য কারণসমূহ উল্লেখ আছে যা আরবিট্রেশন কাউন্সিল যুক্তিপূর্ণভাবে প্রয়োগ করবে।
অন্যান্য দেশের উদাহরণ
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশসহ অন্যান্য মুসলিম দেশ কোরআনের যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা বিবেচনায় নিয়ে এগিয়ে গিয়েছে অনেক দূর। কোরআনের ব্যাখ্যার আলোকেই তারা নারী-পুরুষের সমান অধিকারের বিষয়ে পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে তিউনিসিয়া, মিসর, মরক্কো, তুরস্ক, ইরাক, যদিও মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে শরীয়াহ আইনের উৎস একই। কিন্তু এর ধরণ, অবস্থা, প্রয়োগ ও অর্জন ভিন্ন। ইরাকে সেক্যুলার পারসোনাল স্ট্যাটিউট কোড গ্রহণ করা হয় ১৯৫৯ সালে। এরপর ১৯৭৮ সালে সংশোধনী এনে বহুবিবাহ নিষেধ করে দেওয়া হয়, যদি না প্রথম স্ত্রীর স্পষ্ট অনুমোদন থাকে। পরবর্তীতে অবশ্য অন্তবর্তীকালীন সরকার এই কোডটি ২০০৩ সনে বাতিল করে ধর্মীয় আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করে। এ বিষয়ে সবচেয়ে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে তিউনিসিয়া। ১৯৬৬ সালে 'পারসোনাল স্ট্যাটিউট কোড'এ বহুবিবাহ সম্পূর্ণ নিষেধ করে দেওয়া হয়। সিরিয়া, তুরস্ক, জর্ডান, মিশর, লিবিয়া, আলজেরিয়াও একবিবাহ সংক্রান্ত অনুচ্ছেদ যুক্ত করেছে তাদের আইনে। মরক্কো ২০০৩ সালের 'পারসোনাল স্ট্যাটাস ল'এর মাধ্যমে বেশ কয়েকটি কঠিন শর্ত আরোপের মাধ্যমে বহুবিবাহ কে বৈধতা দিয়েছে যেমন, কেবল আদালতের অনুমতি নিয়ে বহুবিবাহ করা যাবে। আর এ ক্ষেত্রে আদালত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আর্থিক অবস্থা এবং যৌক্তিকতা বিবেচনায় নেবে (Valentina M. Domini Polygamy and Family Law, (http://www.resendoc.org/story/00000001317) on line version visited 31.01.2012)। মালয়েশিয়ার উচ্চ আদালতও এক বিবাহকে বাধ্যতামূলক করে বহুবিবাহকে ব্যতিক্রম ঘোষণা করেছে (Dr. M. Shah Alam, In Pursuit of True Interpretation of the Islamic Scriptures to Promote Human Righus, ELOP Journal, Dhaka, 2008, P.24-45) 1
মাঠপর্যায়ে প্রাপ্ত জরীপের ফলাফল
আমাদের দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, দ্বিতীয় বিয়ে করতে আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতি লাগে। প্রথম স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদের পর আরবিট্রেশন কাউন্সিল দ্বিতীয় বিয়ের কারণ নিয়ে সন্তুষ্ট হলে অনুমতি প্রদান করবে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতি না নিয়েই দ্বিতীয় বিয়ে করে থাকে। আবার অনুমতি চাইলেও আরবিট্রেশন কাউন্সিল বাস্তব কারণ অনুসন্ধান না করেই সিদ্ধান্ত দেয়। এ বিষয়ে আইন কমিশন আরবিট্রেশন কাউন্সিলের ক্ষমতা কমিয়ে বরং সুনির্দিষ্ট কিছু শর্ত আরোপ করা যায় কিনা, সে বিষয়ে মাঠ পর্যায়ের মতামত জানতে চেয়েছিল। উল্লেখ্য ১৯৬১ সনের আইনের বিধি ১৪ ও ১৫ তে কতিপয় শর্তের উল্লেখ রয়েছে।
প্রশ্নঃ বহুবিবাহের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট শর্ত থাকার দরকার আছে কি?
মোট উত্তরদাতা-----না ------হ্যাঁ -------মন্তব্য নেই
২৩৭-----------++১০-------২১২-----১৫
এ বিষয়ে আইন কমিশনের মাঠ পর্যায়ে ফোকাস গ্রুপ আলোচনাতেও একই ফলাফল উঠে আসে। তবে কী কী শর্ত আরোপ করা যায়, সে বিষয়টি নির্ধারিত হতে পারে আলোচনা সাপেক্ষে। আলোচকবৃন্দ যেসব শর্তের ওপর জোর দেন তার মধ্যে রয়েছে প্রথম স্ত্রীর অনুমতির আবশ্যকীয়তার পাশাপাশি আদালতের অনুমতি নেয়া বা আর্থিক সঙ্গতি থাকা।
আলোচকরা জোর দিয়ে বলেন ওই শর্তগুলোর বাইরে অন্য যে কারণই থাকুক, এক স্ত্রী থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ে রেজিস্ট্রেশন করা অবৈধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং এর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
#বিবাহ