05/05/2020
#শ্রীনৃসিংহ_চতুর্দশী_ব্রতোপবাস
২৩বৈশাখ ৬মে বুধবার
শ্রীনৃসিংহ চতুর্দশীর পারণ পরাহে মায়াপুর পূর্ব্বাহ্ন ৯ঃ২৫ মধ্যে।
এবং বাংলাদেশে পূর্ব্বাহ্ন ৯ঃ৫৫ মধ্যে।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জিয়ড়নৃসিংহ দর্শনে স্তুতিঃ—
শ্রীনৃসিংহ, জয় নৃসিংহ, জয় জয় নৃসিংহ।
প্রহ্লাদেশ জয় পদ্মমুখপদ্মভৃঙ্গ॥
"শ্রীনসিংহদেবের জয় ! প্রহ্লাদ মহারাজের ঈশ্বর শ্রীনৃসিংহদেবের জয়, ভ্রমরের মতাে তিনি নিরন্তর তাঁর বক্ষবিলাসিনী লক্ষ্মীদেবীর মুখপদ্ম দর্শন করেন।"
( সূত্রঃ শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত, মধ্যলীলা, ৮/৫ )
শ্রীমদ্ভাগবতের টীকায় শ্রীধর স্বামীপাদ বিঘ্নবিনাশ ভগবান শ্রীনৃসিংহের প্রার্থনা করেছেন—
বাগীশা যস্য বদনে লক্ষ্মীর্যস্য চ বক্ষসি।
যস্যাস্তে হৃদয়ে সম্বিৎ তং নৃসিংহং অহং ভজে॥
"বাগদেবী সরস্বতী সর্বদা নৃসিংহদেবের সহযােগিতা করেন এবং লক্ষ্মীদেবী সর্বদা তাঁর বক্ষে বিরাজ করেন। তিনি সর্বদা সম্বিৎ শক্তিতে পূর্ণ ! আমি সেই শ্রীনৃসিংহদেবকে ভজনা করি।"
প্রহ্লাদহৃদয়াহ্লাদং ভক্তাবিদ্যাবিদারণম্।
শরদিন্দুরুচিং বন্দে পারীন্দ্রবদনং হরিম্॥
"প্রহ্লাদের হৃদয়ে আহ্লাদ প্রদানকারী, ভক্তদের অবিদ্যা নিবারণকারী, শ্রীনৃসিংহদেবকে আমি বন্দনা করি। তাঁর কৃপা শরৎকালের পূর্ণচন্দ্রের জ্যোৎস্নার মতাে বিতরিত হয়। তাঁর মুখমণ্ডল সিংহের মতাে, তাঁকে আমি আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি।"
উগ্রোহপ্যনুগ্র এবায়ং স্বভক্তানাং নৃকেশরী।
কেশরীব স্বপােতানামন্যেষামুগ্ৰবিক্ৰমঃ॥
"কেশরী যেমন উগ্রবিক্রম হওয়া সত্ত্বেও স্বীয় সন্তানদের প্রতি শান্ত এবং কোমল, নৃসিংহদেবও তেমনই হিরণ্যকশিপু প্রভৃতি অসুরদের প্রতি উগ্র হলেও প্রহ্লাদ আদি ভক্তের প্রতি অনুগ্র ( স্নেহপূর্ণ )।"
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু স্বয়ংই শ্রীপাদ সনাতন গোস্বামী প্রভুকে বলিয়াছেন—
একাদশী, জন্মাষ্টমী, বামনদ্বাদশী।
শ্রীরামনবমী আর নৃসিংহ-চতুর্দ্দশী॥
এই সবে বিদ্ধা-ত্যাগ, অবিদ্ধা-করণ।
অকরণে দোষ, কৈলে ভক্তির লভন॥
"একাদশী, জন্মাষ্টমী, বামনদ্বাদশী, রামনবমী এবং নৃসিংহ-চতুর্দশীব্রত পালন করার নির্দেশ দিও।"
"একাদশীতে অরুণোদয়-বিদ্ধা ত্যাগ এবং অন্যব্রত সূর্যোদয়-বিদ্ধা ত্যাগ করে অবিদ্ধ ব্রতই পালনীয়। বিদ্ধ-ব্রত পালনে 'দোষ' হয়, আর অবিদ্ধ ব্রত পালনেই 'ভক্তি' হয়।"
( সূত্রঃ শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত, মধ্যলীলা, ২৪/৩৪১-৩৪২ )
শ্রীনরসিংহ চতুর্দশী বার্তা।—বৈশাখের শুক্লা চতুর্দশী তিথিযোগে শ্রীনরসিংহদেবকে অর্চনা করিয়া মহোৎসব করা একান্ত কর্তব্য।
শ্রীনৃসিংহ চতুর্দশী ব্রতের নিত্যতা।— বৃহৎনারসিংহ পুরাণে শ্রীহরি নৃসিংহ প্রহ্লাদ সংবাদে লিখত আছে হে প্রহ্লাদ! যাহারা ভব ভয়ে ভীতু, তাহারা আমার প্রীতির জন্য এই অতি গোপনীয় বৈশাখী শুক্লা চতুর্দশী তিথিকে উত্তম যোগ ভাবিয়া আমাকে পূজার্চনা করিবে।
আর লিখিত আছে যে, আমার এই দিবস বিদিত হইয়াও যে ব্যক্তি ব্রত লঙ্ঘন করে তাহাকে পাতকে ( নরকে ) নিমজ্জিত হইতে হয়। সুতরাং জ্ঞাত হইয়া মদ্দিনে ব্রতোত্তমের অনুষ্ঠান করিবে ; নতুবা চন্দ্র-সূর্য্যের স্থিতিকাল যাবৎ নিরয়বাস করিতে হয়।
চতুর্দশী ব্রতের অধিকারী নিরূপণ।—উক্ত পুরাণে লিখিত আছে সকল মানুষই আমার ব্রতের অধিকারী। বিশেষতঃ যাহারা আমার ভক্ত ও বৈষ্ণবগণের ব্রতাচরণ অবশ্য কর্তব্য।
অতঃপর নৃসিংহ চতুর্দশী ব্রতের মাহাত্ম্য কথিত হইতেছে।—উক্ত পুরাণেই প্রহ্লাদের উক্তি আছ, হে ভগবন্! হে বিষ্ণো! হে নৃসিংহমূর্তে!
আপনাকে প্রণাম করি। হে সুরেশ্বর! আমি জিজ্ঞাসা করছি, হে প্রভু, তোমার প্রতি আমার ভক্তি কিরূপ উৎপন্ন হল? কিরূপ আমি তোমার প্রিয় ভক্ত হলাম?
শ্রীনৃসিংহদেব বললেন, হে মহামতে! হে বৎস! মদ্ভক্তি ও মৎ-প্রিয়ত্বলাভের কারণ বলিতেছি, অবহিত হইয়া শ্রবণ কর। হে তাত! পূর্বজন্মে তুমি ব্রাহ্মণকুলে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলে, কিন্তু কিছুমাত্র অধ্যয়ন কর নাই। তুমি বসুদেব নামে প্রথিত ছিলে এবং নিরন্তর বেশ্যাসক্ত হইয়া দিন যাপন করিতে। সে জন্মে তোমার কোন পুণ্যকর্ম ছিল না, মদ্ব্রত বিসর্জন পূর্বক কেবলমাত্র বেশ্যায় আসক্ত হইয়াছিলে। পরে মদ্ব্রতেরপ্রসাদেই এতাদশী ভক্তি প্রাপ্ত হইয়াছ। প্রহ্লাদ–বলিলেন, হে নৃসিংহ! হে অচ্যু! হে প্রভো! আমি কাহার তনয় ছিলাম, কি কার্যই বা করিয়াছিলাম, বেশ্যাসক্ত থাকিয়াই বা কিরূপে ত্বদ্ব্রতের অনুষ্ঠান করিলাম? এই সমস্ত সবিস্তার প্রকাশ করুন।
শ্রীনৃসিংহদেব বলিলেন, হে তাত! পুরাকালে অবন্তীনগরে সর্বজনপ্রথিত বসুশর্মা নামে জনৈক বেদবিচক্ষণ ব্রাহ্মণ বাস করিতেন। তিনি প্রত্যহ হোমানুষ্ঠানে রত ও নিখিল বৈদিকক্রিয়ায় নিরত ছিলেন। তিনি অগ্নিষ্টোমাদি যজ্ঞসমূহ দ্বারা দেবতোদ্দেশ্যে যাগানুষ্ঠান করিতেন। জীবিতাবস্থায় তাঁহার কোনরূপ দুষ্ক্রিয়াই নেত্রগোচর হয় নাই। সুশীলা নাম্নী তদীয় পত্নী নিরন্তর সদাচারানুষ্ঠান ও পতিভক্তি প্রদর্শন করাতে ত্রিলোকে প্রসিদ্ধি প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। কালসহকারে সেই বিপ্রের ঔরসে সুশীলার উদরে পাঁচটি পুত্রের উৎপত্তি হইল। পুত্রগণ বিদ্যায় বিচক্ষণ, সদাচারপরায়ণ ও পিতৃভক্তিমান হইল; কিন্তু তন্মধ্যে সর্ব কনিষ্ঠ নিরন্তর বেশ্যারত হইয়া উঠিল। তুমিই সেই কনিষ্ঠ সন্তান।
তুমি নিরন্তর বেশ্যারত থাকাতে মদ্যপানে ও পাপকর্যে লিপ্ত হইয়া কিঞ্চিন্মাত্রও অধ্যয়ন করিলে না, নিরন্তর বেশ্যালয়েই তোমার বাস হইল। একদিন সেই বেশ্যার সহিত তোমার তুমুল কলহ সংঘটিত হইল, সেইহেতু সেদিন তুমি নিরাহারে অবস্থান করিলে। সেইদিন অজ্ঞানবশে ত্বদীয়কর্তৃক মদব্রতরাজের অনুষ্ঠান হয় এবং সেই বেশ্যাসহ কলহ নিবন্ধন নিশাজাগরণও ঘটিয়া উঠিল। তোমার সঙ্গ নিবন্ধন সেই বেশ্যা কর্তৃকও ব্রতাদি সমস্ত আচরিত হয় এবং নিশাজাগরণ বশতঃ ত্বদীয় দেহও পবিত্র হইল। এই প্রকারে তুমি অজ্ঞানে বহুপুণ্যপ্রদ মদ্ব্রত অনুষ্ঠান করিয়াছিলে।
এই ব্রত করিয়াই সুরগণ অধুনা সুরধামে আনন্দ ভোগ করিতেছেন। ব্রহ্মাও মদীয় এই ব্রত সাধন করেন, এই ব্রতের প্রসাদেই তিনি চরাচর বিশ্বের স্রষ্টা হইয়াছেন। মহেশ্বর ত্রিপুরাসুর বিনাশার্থ এই ব্রতের অনুষ্ঠান করিয়া ইহারই প্রসাদে উক্ত দানবকে বধ করেন। অন্যান্য বহুসংখ্যক দেবতা, প্রাচীন ঋষি ও মহামতি নৃপতিগণ এই ব্রতোত্তমের অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন। এই ব্রতের প্রসাদে সকলেই সিদ্ধিলাভ করিয়াছেন এবং বেশ্যাও ইহার প্রসাদে ত্রিভুবনসুখচারিণী ও মদীয় প্রিয়পাত্রী হইয়াছে। হে তাত! আমার এই ব্রত ত্রিভুবনে বিদিত, ধূর্ত বিলাসিনী নারীর জন্যও এই ব্রত উপস্থিত হয় অর্থাৎ তাহারাও এই ব্রত করিয়া তৎফল লাভ করিতে পারে। হে প্রহ্লাদ! এই কারণেই আমার প্রতি ত্বদীয় উত্তমা ভক্তি জন্মিয়াছে।
সেই বেশ্যা সুরপুরে অপ্সরারূপে বহুবিধ ভোগ সম্ভোগ করিয়া আমাতে বিলীনা হইয়াছে, তুমিও আমাতে প্রবেশ কর। কার্যসাধনার্থ মদীয় দেহ হইতে পৃথক হইয়াই তোমার এই অবতার হইয়াছে, তুমি আবশ্যকীয় কর্ম সম্পাদন পূর্বক আশু আমাতে প্রবিষ্ট হইবে। মদীয় এই ব্রতরাজের অনুষ্ঠান করিলে শতকোটি কল্পেও আর সংসারে পুনরাগমন করিতে হয় না। এই ব্রতের প্রসাদে পুত্রহীনের পরম সুন্দর মদ্ভক্ত পুত্র লাভ হয়, দীনজন কুবের সদৃশ লক্ষ্মীমান হইতে পারে এবং তেজস্কামী তেজ, রাজ্যেচ্ছু রাজ্য ও আয়ুষ্কামী শিবসদৃশ দীর্ঘায়ু প্রাপ্ত হয়। এই ব্রত নারীগণের পক্ষে অতি বিশুদ্ধ, পুত্রপ্রদ, সৌভাগ্যজনক অবৈধব্যকর, সুতশোকনাশন, ধনধান্যপ্রদ, স্বামীহিতকর ও পবিত্র। এই ব্রত করিলে তৎপ্রসাদে নারীগণ সার্বভৌমানন্দ ও স্বর্গসুখ প্রাপ্ত হইতে পারে। হে প্রহ্লাদ! এই ব্রতোত্তমের অনুষ্ঠান করিলে কি নর কি নারী সকলকেই সুখ ও ভুক্তি-মুক্তি-ফল অর্পণ করিয়া থাকি। হে তাত! এই ব্রত-ফলের বিষয় অধিক আর কি বলিব, ইহার ফল অর্পণে আমার বা শিবেরও শক্তি নাই; বিধাতা আজীবন চতুর্মুখে কীর্তন করিতেও সক্ষম নহেন। উক্ত স্থলে ব্রতবিধিকথনে আরও লিখিত আছে যে, কলিকাল যখন যখন পাপের উদ্ভব হয়, তখন তখনই মানবগণ এই বিরল ব্রতের বিধান করেন। এই ব্রতানুষ্ঠান করিলে দুরাত্মা ও নিরন্তর পাপলিপ্ত ব্যক্তিগণেরও মতি বিরুদ্ধ ধর্মে প্রবর্তিত হয় না। হে তাত! এইরূপ বিবেচনা করিয়া বৈশাখের শুক্লা চতুর্দশীতে সর্বপাপহরা মদ্ব্রত করা কর্তব্য।
এই চতুর্দশী ব্রত পালন করিলে মহাত্মা মনুষ্যগণ সহস্র দ্বাদশী ব্রতের ফল প্রাপ্ত হইয়া থাকে। হে প্রহ্লাদ! কখনও আমার বাক্য মিথ্যা মনে করিবে না।
উক্ত প্রকরণের শেষ ভাগে লিখিত আছে, ভক্তিসহকারে এই পাপ হরণকারী ব্রত কথা শ্রবণ করিলে ব্রহ্মহত্যা পাপের বিমোচন হয়। এই গোপনীয় পবিত্র ব্রত আচরণ করিলে এবং কীর্তন করিলে কীর্তনকারীর যাবতীয় অভিষ্ট পূর্ণ হয়।
অতঃপর নৃসিংহচতুর্দশী-ব্রতের দিননির্ণয় হইতেছে।—আগমে লিখিত আছে, বৈশাখী শুক্লা চতুর্দশী মহাতিথির সন্ধ্যা-সময়ে প্রহ্লাদের প্রতি (তৎপিতার) ধিক্কার (তাড়না) সহ্য করিতে না পারিয়া পরমপুরুষ শ্রীহরি তৎক্ষনাৎ কটকটা শব্দে সভাস্থ সকলকে চমকিত করিয়া লীলাবশে স্তম্ভাভ্যন্তর হইতে ভীষণ শব্দ সহকারে প্রাদুর্ভূত হইলেন। নৃসিংহদেব অবতীর্ণ হইয়াছিলেন বলিয়া এই মহাপুণ্য স্বরূপা তিথিতে উপবাসী থাকিয়া সন্ধ্যা-সময়ে সযত্নে শ্রীজনার্দনের অর্চনা করা কর্তব্য। বৃহৎনারসিংহ-পুরাণে নৃসিংহদেবের উক্তি আছে, বৈশাখী শুক্লা চতুর্দশীতে মদীয় জন্ম হেতু সমুদ্ভূতা, পাপহরা, পুণ্য ব্রতের অনুষ্ঠান করিবে। আরও লিখিত আছে, দৈবাৎ স্বাতীনক্ষত্র-সমন্বিত শনিবারে বা সিদ্ধি যোগের সংযোগে মদ্ব্রত হইলে উক্ত ব্রত হত্যাকোটিজনিত পাপ ধ্বংস করিয়া দেন।
উক্ত যোগ না ঘটিলে ফলেচ্ছু ব্যক্তিরা কেবলমাত্র শুদ্ধা চতুর্দশীতে উপবাস করিবেন। ত্রয়োদশী-বিদ্ধা চতুর্দশীতে উপবাস করা বৈষ্ণবের অকর্তব্য। আগমে লিখিত আছে, কুজবারে ( মঙ্গলবারে ) মৎপ্রীতিকরী চতুর্দশী হইলে তাহাতে মদ্ব্রতানুষ্ঠান নিখিলপাপনাশন জানিবে। ত্রয়োদশীবিদ্ধা চতুর্দশীতে কুজবার বা স্বাতীনক্ষত্রের যোগ হইলেও সে দিনে ব্রত অকরণীয়।
এক্ষণে নৃসিংহচতুর্দশী ব্রতের বিধান কথিত হইতেছে।—শ্রীনৃসিংহ বলিলেন, হে তাত! প্রভাতে গাত্রোত্থান করিয়া দশনধাবন পূর্বক আমাকে হৃদয়ে স্মরণ করিতে করিতে নিয়ম গ্রহণ করিবে।
উক্ত নিয়মমন্ত্র।—হে নৃসিংহ! হে মহাভীম! মৎপ্রতি কৃপা প্রদর্শন করুন, আমি অদ্য ত্বদ্ব্রতের অনুষ্ঠান করিতেছি, ইহা নিরাপদে সম্পন্ন করিয়া দিবেন। পাপীগণের সহিত আলাপ করা ব্রতদিনে ব্রতীর অনুচিত। যিনি ব্রতের সম্পূর্ণ ফল কামনা করেন, মিথ্যালাপ করা তাঁহার পক্ষে অকর্তব্য।
মহানুভব ব্রতীজন একেবারে ভার্যা ও দ্যূতক্রীড়া বিসর্জন পূর্বক সমস্ত দিবস মদীয় রূপ স্মরণ করিবেন। তৎপরে সুধী ব্যক্তি মধ্যাহ্ন সময়ে নদী প্রভৃতি বিমল সলিলে বা গৃহে অথবা দেবখাতে কিম্বা মনোরম তড়াগে বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ সহকারে স্নান করিবেন। কিম্বা মহানুভব ব্রতী মৃত্তিকা, গোময়, আমলকী ফল দ্বারা বা সর্বপাপহর তিল দ্বারা স্নান করিয়া বিশুদ্ধ-ভাবে বসনযুগল পরিধান পূর্বক নিত্যক্রিয়ার অনুষ্ঠান করিবেন। তদনন্তর ভক্তিমান হইয়া আমাকে ধ্যান করিতে করিতে গৃহে প্রত্যাগত হইবে। পরে গোময়োপলিপ্ত ভূমির উপর অষ্টদল পদ্ম অঙ্কিত করিয়া তাহাতে সরত্ন তাম্রকুম্ভ স্থাপন পূর্বক তদুপরি অক্ষতপূর্ণ পাত্র স্থাপন করিবে। তদুপরি শ্রীনৃসিংহদেবের ও লক্ষ্মী দেবীর স্বর্ণমূর্তি স্থাপন করিতে হয়।
অর্থ বিষয়ে কৃপণতা পরিত্যাগ করিয়া সামর্থ্যনুসারে এক পল, অর্ধ পল বা তদর্ধ পল স্বর্ণ দ্বারা শ্রীনৃসিংহ ও লক্ষ্মী দেবীর মূর্তি নির্মাণ করিয়া পঞ্চামৃতে স্নান করাইয়া স্থাপনপূর্বক অর্চনা করিবে।
অনন্তর লোভহীন, শাস্ত্রদর্শী, দান্ত, শান্ত, জিতেন্দ্রিয়, দ্বিজাতিকে আমন্ত্রণ করিয়া আচার্যপদে বরণ করিবেন। শাস্ত্রানুযায়ী তাঁহার দ্বারা অর্চনা করাইবেন। আচার্যের বচনানুসারে ব্রত উপবাস করিয়া পূজা করাই বুদ্ধিমানের উচিত।
প্রহ্লাদ অর্চনা।—আগমে লিখিত আছে, শ্রীপ্রহ্লাদের দুঃখ নাশ করার জন্য যে পবিত্রা চতুর্দশীর উদ্ভব সেই তিথিতে শ্রীনৃসিংহদেবকে পূজা করার পূর্বে সযত্নে ভক্ত শ্রীপ্রহ্লাদের পূজা করা কর্তব্য।
বৃহৎনারসিংহ পুরাণে লিখিত আছে, ঐ স্থানে কুসুমস্তবক দ্বারা মদীয় মূর্তি প্রস্তুত করিয়া ঋতুকালজাত পুষ্প দ্বারা বিধানে অর্চনা করিবে।
মদীয় মন্ত্র, মদীয় নাম ও পৌরাণিক মন্ত্র সমূহ উচ্চারণ করিয়া বিশেষ প্রকারে ষোড়শোপচারে মদীয় অর্চনা করিতে হয়।
তন্মধ্যে চন্দনদানমন্ত্র কথিত হইতেছে।—হে নৃসিংহ! হে পরমেশ্বর! আপনার প্রীত্যর্থ কর্পূর কুঙ্কুমান্বিত উত্তম শীতল চন্দন অর্পণ করিলাম।
উক্ত পূজার পুষ্পদান-মন্ত্র।—হে নৃসিংহ! হে ঈশ! যথাকালজাত কুসুম ও তুলসীদল দ্বারা আপনার ও লক্ষ্মী-দেবীর অর্চনা করিতেছি, আপনাকে প্রণাম।
উক্ত পূজার ধূপদানমন্ত্র।—হে মহাবিষ্ণো! নিখিল কামসমৃদ্ধি লাভের জন্য সর্বদেব-দুর্লভ কালাগুরুধূপ আপনাকে প্রদান করিলাম।
উক্ত পূজার দীপদানমন্ত্র।—দীপ দ্বারা পাতকনাশ ও অন্ধকাররাশি বিনাশ পায়, দীপ দ্বারা তেজোলাভ হয়; সুতরাং আপনাকে দীপ অর্পণ করিতেছি।
উক্ত পূজার নৈবেদ্যদানমন্ত্র।—হে লক্ষ্মীপতে! হে রমাকান্ত! ভক্ষ্য ভোজ্যযুক্ত সুখকর নৈবেদ্য আপনাকে প্রদান করিতেছি, আপনি নিখিল পাতক দূর করুন।
উক্ত পূজার অর্ঘ্যদানমন্ত্র।—হে নৃসিংহ! হে অচ্যুত! হে রমাকান্ত! হে বিশ্বপতে! আপনাকে এই অর্ঘ্য সমর্পণ করিতেছি, ইহার প্রসাদে আমার মনোরথ সফল হউক।
অনন্তর পূজামন্ত্র।—হে পীতাম্বর! হে মহাবিষ্ণো! হে প্রহ্লাদভয়হারিন্! হে নাথ! চতুর্দশী পূজনে যথাবিহিত ফল প্রদান করুন।
অনন্তর গীত ও বাদ্য সহযোগে নিশাকালে জাগরণ, পুরাণাদি পাঠ, নৃত্য ও আমার কথা শ্রবণ করিয়া অতিবাহিত করিবে।
তদনন্তর প্রভাতে স্নানান্তে নিরলস হইয়া পূর্ব কথিত বিধানে সযত্নে আমাকে অর্চনা করিতে হয়। আরও লিখিত আছে, হে দেবেশ! যাহারা আমার বংশে জন্ম গ্রহণ করিয়াছে অথবা আমার সাক্ষাতে ( পরে ) জন্ম গ্রহণ করিবে, তাহাদিগকে দুঃসহ সংসার-সমুদ্র হইতে পরিত্রাণ কর। হে শেষশায়িন্! হে বিশ্বপতে! আমি ভবসাগরে নিমগ্ন হইয়াছি, ভীষণ ব্যাধিরূপ দুঃখসলিলে পরাভূত হইয়াছি এবং মহাদুঃখে নিমগ্ন হইয়াছি, আপনি আমাকে করাবলম্বন অর্পণ করুন। হে নৃসিংহ! হে রমাপতে! হে ভক্তভয়ভঞ্জন! হে ক্ষিরোদবাসিন! হে জনার্দন! হে দেব! এই ব্রত দ্বারা আপনি আমার প্রতি সন্তুষ্ট হইয়া ভুক্তি মুক্তি প্রদান করুন। একইরূপে প্রার্থনা করিয়া বিধানে প্রভুকে বিসর্জন পূর্বক উপহার প্রভৃতি যাবতীয় দ্রব্য আচার্যকে নিবেদন করিবে। তৎপরে দক্ষিণা প্রভৃতি দ্বারা সম্যকরূপে দ্বিজাতিগণকে সন্তুষ্ট করিয়া বিদায় করিবে এবং আমার ধ্যান নিবিষ্ট হইয়া বন্ধুবর্গের সহিত আহার করিবে।
( সূত্রঃ শ্রীহরিভক্তিবিলাস, ১৪/৪১৪-৪৯০)