03/01/2026
"আমরা শ্রীরামকৃষ্ণ, স্বামী বিবেকানন্দ আর মা সারদার জীবনের দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখতে পাই মায়ের জীবন কি সাধারণ ছিল! অসাধারণভাবে সাধারণ! আমাদের মতই সাধারণ!কখনো কখনো আমি ভাবি মা কে সারাজীবনে যা যা করতে হয়েছে, ঠাকুরকে তা করতে হলে ঠাকুর কি করতেন?!এক মানসিক ভারসাম্যহীন ভাইঝিকে সামলানো, ঘরের মেয়েদের দেখাশুনা করা, সন্ন্যাসী সন্তানদের যত্ন, ভক্ত ও দর্শনার্থীদের ভোজনের ব্যবস্থা, একদল লোভী আত্মীয়স্বজনের সাথে একত্রবাস, সংসারের সমস্যা সমাধান, নবঅঙ্কুরিত রামকৃষ্ণসঙ্ঘের সঙ্ঘজননীর দায়িত্ব পালন! আমার তো মনে হয় ঠাকুর তৎক্ষণাৎ সমাধিস্থ হয়ে যেতেন! (সবার হাসি) ঠাকুর কিচ্ছু করতেন না এসব! (হাসি) আর যদি বিবেকানন্দকে বলা হত - সারা পৃথিবী ঘুরে অদ্বৈত বেদান্ত প্রচার না করে, বাংলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে একগুচ্ছ অত্যন্ত সমস্যাসৃষ্টিকারী আত্মীয়দের সাথে থাকো, কূটনো কোটো, গোয়ালের গরুদের দেখাশুনা করো, আমি নিশ্চিত - বিবেকানন্দ প্রায়ই বলতেন ইচ্ছে করে এসব ছেড়ে হিমালয়ে গিয়ে তপস্যায় ডুবে যাই- তা উনি হিমালয়ে দৌড়াতেন! (হাসি)
মা কিন্তু সব করেছিলেন। দিব্যত্রয়ীর মধ্যে ওঁরই জীবনটা ছিল আমাদের মতন।ভাবো তো রামকৃষ্ণ, যিনি কিনা বেশীরভাগ সময়েই থাকতেন সমাধিস্থ, যাঁর সর্বদা প্রত্যক্ষ সংযোগ ছিল ঈশ্বরের সাথে, তিনি বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে ঈশ্বরকে দেখিয়ে দিতেন! অথবা বিবেকানন্দ! আর কজন বিবেকানন্দের মত হতে পারবে? এঁরা অসাধারণ। এইরকম দিব্যজীবন আমরা বারবার দেখতে পাব না! কিন্তু মা! তাঁকে যেন আমরা প্রত্যহ প্রত্যক্ষ করি আমাদের জীবনে।ঠাকুর যা বলেছেন, মা ঠিক তাই বাস্তবে জীবনে করে দেখিয়েছেন।আর এই কারণেই তাঁকে বোঝা দুষ্কর! আমি দেখেছি অনেক সন্ন্যাসী ভক্তজন মূলতঃ স্বামিজীর ব্যাক্তিত্বে আকৃষ্ট হন। স্বামিজীর হাত ধরে তারা ঠাকুরের কাছে আসেন। আর আরো অনেক অনেক আধ্যাত্মিক অগ্রগতির পর তারা রামকৃষ্ণ থেকে সারদার কাছে আসেন!আধ্যাত্মিক জীবনের উপান্তে তারা মায়ের শরণ নেন।স্বামী তুরীয়ানন্দের শেষ জীবনটা শুধুই ছিল - মা! মা! মা! আজই আমি স্বামী মহাযোগানন্দজীর থেকে শুনছিলাম - স্বামী জগদীশ্বরানন্দ নাকি স্বামী জগদানন্দ? (দর্শকাসন থেকে অস্পষ্ট উত্তর) ওঃ স্বামী অতুলানন্দ! ব্রহ্মজ্ঞানী। সর্বদা মুখে একটাই কথা - হরি ওম! শেষ জীবনে উনি খালি বলতেন - মা!অর্থাৎ আধ্যাত্মিক জীবনে অগ্রগতির সাথে সাথে আমরা স্বামীজি থেকে ঠাকুর থেকে মায়ের দিকে এগিয়ে যাই!এটা আমি প্র্যাকটিক্যালি নিজে দেখেছি। বেলুড় মঠে শ্রীরামকৃষ্ণের মন্দির টি সবথেকে বড় এবং কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত - ওটিকে কেন্দ্র করে সবকিছু আবর্তিত হচ্ছে। কিন্তু মায়ের মন্দিরটি বেশি জনপ্রিয়! আমি কত সময় দেখি মায়ের মন্দিরে মানুষজন এমনিই বসে আছে, প্রার্থনা করছে, ধ্যান করছে, কখনো বা কাঁদছে! বা এমনিই গল্প করছে। কিন্তু মায়ের মন্দিরে লোকের ভিড় বেশি!
একবার আমি মা সারদার মন্দিরের দিকে যেতে যেতে ভাবছিলাম - ঈশ্বরের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমরা কি রকম? ঈশ্বর আমাদের কিভাবে দেখেন? আর মায়ের মন্দিরের সামনে যেতেই উত্তরটা ঝট করে আমার মনে এলো - সন্তান! আমরা ঈশ্বরের সন্তান! আর ঈশ্বর আমাদের মায়ের মত! ঈশ্বরের মাতৃভাবটিই আমার মনে হয় মূলভাব! পৃথিবীর অনেক প্রাচীন ধর্মেই জগৎ সৃষ্টির কারণ হিসেবে ঈশ্বরের মাতৃভাবটিকেই ধরা হয়েছে - মা! যাঁর থেকে জগৎ সৃষ্টি হয়েছে, যিনি জগৎ পালন করছেন, যাঁর মধ্যে জগৎ লয় হয়ে যাবে!
মা সারদার ও মূলস্বরূপটি হচ্ছে - তিনি মা! তাঁর সম্বন্ধে যা কিছু আমরা পড়ি, যা কিছু আমরা শুনি, তার থেকে এই কথাটাই মনে হয়!
স্বামী অরূপানন্দ যিনি মায়ের দীর্ঘকালের সেবক, তিনি যখন মায়ের কাছে দীক্ষা নিতে এসেছিলেন, সেই সময়কার এক সুন্দর স্মৃতিচারণা করেছেন। অরূপানন্দজীর মা ছোটবেলাতেই মা.রা গিয়েছিলেন। যখন তিনি মাকে প্রথম দেখেন, তাঁর মুখমন্ডলের কমনীয় এবং স্নেহপূর্ণ ভাবটি দেখে প্রথম দর্শনেই মনে হয় - ইনিই আমার হারিয়ে যাওয়া মা! সেই ভাবটি তাঁর মধ্যে সারা জীবনের জন্য প্রোথিত হয়ে যায়। অরূপানন্দজীর সাথে মায়ের খুব সুন্দর একটি কথোপকথন আছে।
অরূপানন্দজী জিজ্ঞাসা করেছিলেন
- তুমি কি সত্যিই মা?
-হ্যাঁ আমি সত্যিই মা!
-আমাদের সবার মা?
-হ্যাঁ!তোমাদের সবার মা!
-এই যে গরু বাছুর কীটপতঙ্গ এদেরও মা?
- হ্যাঁ! আমি ওদেরও মা!
এমনকি ঘরে থাকা কুকুর বিড়াল গরু বাছুরও অনুভব করতো মা তাদের ভালোবাসেন এবং তাদের রক্ষা করেন। একটা বিড়াল ছিল, সবাইকে জ্বালাতন করে বেড়াত। কিন্তু কেউ মারতে গেলেই বা তাড়া করলেই ছুটে গিয়ে মায়ের পিছনে লুকিয়ে পড়ত। একবার এক সাধু আর সহ্য না করতে পেরে দু. ঘা বসিয়ে দিয়েছিলেন। তাতে মা অত্যন্ত আহত হয়ে বলেন - ওকে মে.রো না!ওর মধ্যেও আমি আছি। মা বোধহয় চিরকালের জন্য সুনিশ্চিত করেছিলেন বিড়ালটার গায়ে যেন কেউ হা.ত না দেয়। (হাসি)আবার মজার ব্যাপার হচ্ছে মা মাঝেমধ্যে নিজেই ওর সাথে কঠোর ব্যবহার করতেন! মাঝেমধ্যে তিনি একটা লাঠি তুলে বিড়ালটিকে মা.রার ভ.য় দেখাতেন। আর অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে বাকি সবাই ভ.য় দেখালে বিড়ালটা পালিয়ে যেত, কিন্তু মা ভ.য় দেখালে বিড়ালটা বড় বড় চোখ করে মা.য়ের দিকে তাকাত, তারপর মায়ের কোলের কাছে আরো ঘেঁষে বসত!বিড়ালটা মনে হয় আমাদেরই মতন, তাই না?(সবার হাসি)
বেলুড়মঠে তখন স্বামী বিবেকানন্দ আছেন। মঠ নির্মাণের কাজ চলছে। একজন শ্রমিক বোধহয় কিছু চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে। স্বামীজী তাকে মঠ থেকে তাড়িয়ে দিলেন। সে গঙ্গা পেরিয়ে সোজা চলে গেল মায়ের কাছে। গিয়ে কাঁদতে কাঁদতে সব কথা বলল। সে সময় মায়ের বাড়িতে বাবুরাম মহারাজ ছিলেন - স্বামী প্রেমানন্দ। মা তাকে ডেকে বললেন
- এই লোকটি বড় গরিব।কোথায় যাবে ? ওকে আবার তোমরা কাজে বহাল কর। মঠে গিয়ে বলো আমি বলেছি।
এবার বাবুরাম মহারাজ বললেন
- ওরে বাবা নরেন বিশাল রেগে যাবে।
মা শুধু বললেন
- নরেন কিছু বলবে না।ওকে বলো, আমি বলছি।
ব্যাস এটুকুই যথেষ্ট।
বাবুরাম মহারাজ লোকটিকে নিয়ে ভয়ে ভয়ে বেলুড়মঠে ফিরে এলেন। আর দেখেন গেটের সামনে কে দাঁড়িয়ে আছে? না স্বয়ং বিবেকানন্দ! বাবুরাম মহারাজ কে দেখিয়ে বিবেকানন্দ বলে উঠলেন
-দেখ দেখ! বাবুরাম কি করেছে?আবার ফেরত নিয়ে এসেছে।
বাবুরাম মহারাজ তখন বললেন
- কিন্তু মা বলেছে ওকে আবার নিয়ে নিতে। ও মায়ের কাছে গেছিল। লোকটি অত্যন্ত ভয়ে ছিল, বিবেকানন্দ বোধহয় খুব বকা দেবেন। কিন্তু বিবেকানন্দ হাসতে হাসতে বললেন
- সোজা হাইকোর্টে পৌঁছে গেছ!
জনৈকা মহিলা ভক্ত একবার আক্ষেপ প্রকাশ করেছিলেন
- ঠাকুর কিন্তু আমাদের ভক্তজনদের অনেক বেশি ভালবাসতেন।
মা তাতে বলেছিলেন
- মনে হতেই পারে সে কথা! উনি তো নিজে বাছাই করে মানুষ নিয়েছিলেন, তাও আবার কত পরীক্ষার পর! আর আমার কাছে পাঠিয়েছেন পিঁপড়ের সারি!(সবার হাসি) সত্যিই মা কাউকে কখনো ফেরাননি!
মা কাউকে কৃপা করতেন, তাকে দীক্ষা দিয়ে।একবার তিনজন ভক্ত স্বামী ব্রহ্মানন্দের কাছে দীক্ষা নিতে চেয়েছিলেন কিন্তু ব্রহ্মানন্দ তাদেরকে না করে দেন। তিনি বলেন - তোমরা জয়রামবাটি চলে যাও।সেখানে মা আছেন, তিনি যদি চান তিনি তোমাদের দীক্ষা দেবেন।কিন্তু আমি দিতে পারবো না। সম্ভবত তাদের অতীত জীবনের কর্ম খুব একটি ভাল ছিলনা। এমনটি মনে করা হয় দীক্ষার মাধ্যমে গুরু শিষ্যের সমস্ত পা.প নিয়ে নেন এবং তাকে ফলভোগ থেকে মুক্ত করেন।এই প্রথমবার মা কিন্তু সেই তিনজনকে মানা করলেন। দ্বিতীয়বার অনুরোধ করার পরেও মানা করলেন।তৃতীয়বার আর মা না বলতে পারলেন না। বেলুড়মঠে যখন সেই সংবাদ এসে পৌঁছায়, গঙ্গার ধারে বেঞ্চে স্বামী ব্রহ্মানন্দ, স্বামী তূরীয়ানন্দ, স্বামী শিবানন্দ ও প্রমুখরা বসেছিলেন। সবাই খানিকক্ষণ নিস্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। তারপর স্বামী প্রেমানন্দ বললেন
- কি মহাশক্তি! যে বিষ আমাদেরকে ভ.স্ম করে দিত, মা একটি শব্দ পর্যন্ত না করে তার ধারণ করলেন!
এই মানুষেরা কোনভাবে বুঝতে পারেন, আমাদের অতীত, আমাদের ভবিষ্যৎ। রামকৃষ্ণদেব কিন্তু কখনো এ ধরনের কথাবার্তা বলতেন না। কিন্তু একবার অত্যন্ত ভাব চলে আসায় তিনি এক অন্যরকম কন্ঠে মাষ্টার মহাশয় কে বলেন
- বল কি জানতে চাও! তোমার অতীত তোমার ভবিষ্যৎ সব আমি দেখতে পাচ্ছি! কি? পাচ্ছি না?
মাস্টার মহাশয় কিন্তু তৎক্ষণাৎ জোড়হস্তে মাথা নিচু করে বলেন
-হ্যাঁ !আমি জানি, আপনি সব জানেন!
মা বোধহয় সর্বত্রই দীক্ষা দিয়েছিলেন। রাস্তায়,নিজের ঘরে,মঠে, যে যখন যেখানে কৃপা চেয়েছে। একবার এক রেলওয়ে স্টেশনে একজন কুলি তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। কুলি কিন্তু চিনত না কে তিনি। সে কিন্তু আচমকাই মায়ের কাছে গিয়ে কেঁদে পড়ে
- মেরে সীতা মাইয়া, আব তক কাঁহা থি তুম!
অদ্ভুত ব্যাপার বাকিরা অবাক হলেও মা কিন্তু অবাক হননি। তিনি শান্তচিত্তে কুলিটিকে ডেকে নেন এবং সেই রেলওয়ে প্লাটফর্মে দাঁড়িয়েই সেই মুহূর্তে তাকে দীক্ষা দেন। আসলে কোন নারীকে সীতা বলে সম্বোধন করার মধ্য দিয়ে হি.ন্দুমনের এক অনির্বাচনীয় ভক্তির আভাস পাওয়া যায়। আমরা জানি শ্রীবিষ্ণুর অবতার হচ্ছেন শ্রীরাম আর স্বয়ং মহাশক্তি লক্ষ্মীর অবতার হচ্ছেন মা সীতা। সুতরাং সেই নামে কাউকে সম্বোধন করার মধ্য দিয়ে তার প্রতি এক অদ্ভুত ভক্তি এবং ভালোবাসার পরিচয় আমরা পাই।
এতকিছুর পরেও কিন্তু মায়ের সাথে সাধারণ মানুষের এক বিরাট পার্থক্য ছিল। যেকোনো মুহূর্তেই মা তাঁর এক সম্পূর্ণ অন্য স্বরূপ প্রকাশ করতেন, যা অদ্ভুত ছিল এবং সময়ে সময়ে ভীতিপ্রদও ছিল। এই স্বামী অরূপানন্দজী, যিনি মায়ের দীর্ঘকালীন সেবক ছিলেন, জয়রামবাটিতে মায়ের নতুন কুটির নির্মাণ করার কাজে যুক্ত ছিলেন। এবার মায়ের ভাইয়েরা অত্যন্ত লোভী প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। তারা দেখতেন কলকাতা থেকে বহু মানুষ আসছে। এবং অরূপানন্দজীকে তারা বলতেন তোমরা যখন কিছু টাকা পয়সা পাচ্ছ, তাহলে আমাদেরও কিছু দাও। এবং এইভাবে বারবার অরূপানন্দজীকে বিরক্ত করায় তিনি একসময় মায়ের কাছে গিয়ে বলেন
- মা! মামারা বড্ড লোভী এবং সংসারিক।তারা আমাকে এইভাবে ক্রমাগত টাকার জন্য চাপ দিতে থাকেন। কিন্তু আমি তো সন্ন্যাসী হতে এসেছি। এসব তো আমার কাজ নয়! তাই আমি আপনাকে জানাতে এসেছি এই কাজ আমি আর করব না।
অরূপানন্দজী ভেবেছিলেন মা হয়তো তাকে উৎসাহ দেবেন কাজ করার জন্য বা জোর করবেন। মা সেই সময় দালানে খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এক অদ্ভুত দূরবর্তী দৃষ্টি নিয়ে তিনি অরূপানন্দজীর দিকে না তাকিয়ে, সম্পূর্ণ অন্যদিকে তাকিয়ে উত্তর দিলেন
- ও! তুমি আমার কাজ করবে না? বেশ।তোমায় করতে হবে না!
আমি চেতনানন্দজীর মুখে শুনেছি সেই সময় অরূপানন্দজী মায়ের দিকে তাকিয়ে ছিলেন এবং তিনি মায়ের চারপাশে এক সূক্ষ্ম দিব্যজ্যোতি দেখতে পান! অরূপানন্দজী বলেছিলেন
- মাকে তখন আর সাধারণ গ্রাম্য মহিলা বলে মনে হচ্ছিল না। সম্পূর্ণ অন্যরকম লাগছিল তাকে।
অরূপানন্দজী তৎক্ষণাৎ বলেন
- না, মা!তোমার সব কাজ আমি করব!
বক্তা: স্বামী সর্বপ্রিয়ানন্দ ( minister in charge, Vedanta society, New York)
স্থান: বেলুড় মঠ
"সংগৃহীত"