12/09/2026
নীশাপুরের অন্তর্গত হারুণ নামক ছোট্ট শহরে (কস্বায়) বেলায়েত গগনের চিরদীপ্তিমান চিরোজ্জ্বল সূর্য, মারেফতের দলিল, আওতাদ ও আবদাল এবং কোতোবগণের মাথার মুকুট এমামোল আউলীয়া হজরত খাজা উছমান হারুনী রাঃ আঃ ছৈয়দ বংশীয় একটি সম্মানিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার সঠিক জন্ম সন ও তারিখ বলা দুঃসাধ্য। তিনি হজরত আমীরোল মোমেনীন আলী মরতোজা আঃ হইতে একাদশ পুরুষ। তিনি বাল্যকালেই কোরআন মজিদ কণ্ঠস্থ করিয়াছিলেন। অতঃপর নিশাপুর ধর্মীয় আরবী ইউনিভারসিটি হইতে প্রশংসার সহিত শিক্ষা সমাপ্তির ছনদ লাভ করিয়াছিলেন। তিনি বাহ্যিক বিদ্যায় (জাহেরী এলমে) ঐ যুগের শ্রেষ্ঠ আলেমরূপে প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছিলেন।
হজরত খাজায়ে কুল্লে খাজেগান ছরদারে লামাকান শাহান শাহে আউলীয়া ছোলতানে হিন্দ হাবীবোল্লাহ গরীব নওয়ায রাঃ আঃ তাঁহার নিকট বায়াত গ্রহণ করিয়া আতাসমর্পণ করতঃ তাঁহার আনুগত্য ও পথ প্রদর্শনায় আধ্যাত্যিক রাজ্যের ছোলতান হইয়াছিলেন; ইহাই তাঁহার মরতবা, প্রশংসা ও শ্রেষ্ঠত্বের সর্বাপেক্ষা অধিক পরিচয়।
তিনি (হযরত ওসমান হারুনী)হজরত খাজা হাজী শরীফ জেন্দানী রাঃর নিকট বায়াত হইয়া তাঁহার খেদমত ও সাহচর্যে কয়েক বৎসর অতিবাহিত করিয়া এমামোল আউলীয়া হইয়াছিলেন।
অনেকগুলি গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে যে, একদা জনৈক ব্যক্তি ছোলতানে ছঞ্জরকে স্বপ্নে দেখিয়া তাঁহার পরকালের অবস্থা কিরূপ জিজ্ঞাসা করিলে ছোলতান বলিলেন, "আমার নেকের আমল হইতে গুনাহের আমল অত্যধিক হওয়ায় আমার উপর আজাবের ফেরেশতাগণ আজাব করিতে উদ্যত হইলে হঠাৎ দৈববাণী হইল, 'হে ফেরেশতাগণ। দামেস্কের জামে মছজেদে এই ছোলতান ছঞ্জর আমার মাহবুব খাজা হাজী শরীফ জেন্দানীর কদমবুছি করিয়াছিল। আমি হাজী শরীফ জেন্দানীর তাজিমের উছিয়াল তাহার মাগফেরাত করিলাম। সুতরাং তোমরা তাহার উপর আজাব করিওনা।,তদবধি আমি সুখে আছি।
(ছিয়ারোল আউলীয়া, ছিয়ারোল আকতাব, ছিয়ারোল আরেফিন প্রভৃতি গ্রন্থ দ্রষ্টব্য।)
হজরত খাজা উছমান হারুণী ৭০ বৎসর যাবৎ একটি বারের জন্যও শয়ন করেন নাই। প্রত্যেক দিন ও রাতের মধ্যে দুই বার কোরআন শরীফ খতম করিতেন। পাঁচ কিংবা সাত দিন অন্তর কিংবা তিন দিন অন্তর তিনটি অঙ্গুলিতে (শুধু বৃদ্ধ, শাহাদাত ও মধ্যম অঙ্গুলি একত্রিত করিয়া) যাহা উঠিত, এইরূপ তিন বা চার কিংবা পাঁচ লোকমা আহার করিতেন। পানিও নেহায়েত কম পান করিতেন। কথিত আছে যে সামান্য এক কুল্লি পানি পান করিতেন। একাধারে দশ বৎসর যাবৎ তিনি নফছকে আহার দেন নাই। অর্থাৎ তিনি আহার করেন নাই। সাত দিন অন্তর এক কুল্লি পানি পান করিতেন। অনুরূপ অসাধারণ অলৌকিক কৃচ্ছ্রসাধনা দ্বারা তিনি এহেন অদ্বিতীয় রূহানী শক্তি লাভ করিয়া ছিলেন যে, তিনি তাঁহার জামানায় পৃথিবীর সর্বশেষ্ঠ অলী আল্লাহ্ হইয়াছিলেন। হজরত খাজা গরীব নওয়ায তাঁহার মনমত আধ্যাত্মিক শক্তিশালী পীরের খোঁজে নানা দেশ ঘুরিয়া বহু প্রসিদ্ধ আউলীয়াকে দেখিয়া অবশেষে হজরত খাজা উছমান হারুণীকেই আশানুরূপ সর্বশেষ্ঠ অলী আল্লাহ্ রূপে পাইয়া তাঁহার নিকট আত্ম-বিক্রয় করিয়াছিলেন বা বায়াত হইয়াছিলেন। হজরত খাজা উছমান হারুণীর রূহানী মরতবা ও তাঁহার শ্রেষ্ঠত্ব হৃদয়ঙ্গম করার জন্য এই নজিরটিই যথেষ্ট।
হজরত খাজা উছমান হারুণীর একটিমাত্র দৃষ্টি যাহার উপর পতিত হইত, সে কাশফ ও কেরামতের অধিকারী হইয়া যাইত এবং আর্শ হইতে তাহতাচ্ছারা (পৃথিবীর সর্বনিম্নস্তর) পর্যন্ত দেখিতে পাইত। এবং কামেল পীর ও আল্লাহর নিগূঢ়তম বাতেনী রহস্য সম্পর্কে অবগত হইতে পারিত। তাঁহার নিকট মুরীদ হওয়া মাত্রই আল্লাহর কোরব বা নৈকট্যে পৌছিয়া যাইত। মা'রেফত ধনে ধনী হইত। তাঁহার প্রত্যেক মুরীদই বড় বড় প্রসিদ্ধ কামেল অলী আল্লাহ্ ছিলেন।
হজরত খাজা হাজী শরীফ জেন্দানী রাঃ হজরত খাজা উছমান হারুণীকে বায়াতের তিন বৎসর পর খেরকা ও খেলাফত এবং এছমে-আজম শিক্ষা প্রদান করেন। তাঁহার পবিত্র মস্তকে 'চারতরকি কোলাহ' বা টুপি পরাইয়া তিনি বলিলেন, "বৎস উছমান হারুণী।
চারতর্কী টুপির অর্থ এই যে প্রথমে দুনিয়াকে পরিত্যাগ
দ্বিতীয়তঃ নফছের খায়েশ বা আকাঙ্ক্ষাকে বিসর্জন, তৃতীয়তঃ আহার ও নিদ্রা পরিত্যাগ (অবশ্য জীবন শক্তি ধ্বংস না হয় তৎপ্রতি খেয়াল রাখিয়া)
চতুর্থতঃ জাহের-বাতেন গায়রোল্লাকে পরিবর্জন। যে ব্যক্তির এই চারটি বর্জন করিয়াছে, সেই ব্যক্তি এই টুপির হক আদায় করিয়াছে।
সূত্র: বাংলা ভাষায় লিখিত অন্যতম জীবনি গ্রন্থ— “হজরত খাজা বাবা গারীব নাওয়াজের জীবনী”।
গ্রন্থকার: হজরত কোতবুল আলম শামপুরী (রাঃআঃ)
উৎসগ্রন্থ থেকে অবিকল উদ্ধৃত।
উপস্থাপনায়:— Gulshan-e-Chishty।