25/04/2023
আনন্দ সাধনা
----------------------
দয়াময় স্বয়ং অবতীর্ন হইয়াছেন। তাহার নাম আনন্দ স্বামী। নিজে কিছুদিন গোপনে থাকিয়া কার্য্য করিবার জন্যই তিনি পরলোক গমন করিয়াছিলেন। স্বামী স্ত্রী একযোগে কার্য্য করিবার সাধনে
একটা অসিদ্ধ ব্যাপার ছিল, উহাকে সন্তান সাধন বলে।
আমরা জগতে জন্মগ্রহণ করিয়া মায়াচ্ছন্নভাবে কার্য্য করিয়া থাকি। মায়া সর্ব্বযোগে স্বপ্রকাশ অবস্থা আনিয়া দিলে অযোনিসম্ভব ব্রহ্মযোগ উপস্থিত হয়। মায়া ব্যতিরেকে সন্তান-সাধন পূর্ণ হয় না। এই জন্য বলিতেছি মায়ার সাধন এবং সন্তান-সাধন একই কথা।
দয়াময় কার্য্যকারীদিগের মধ্যে মায়ার সাধনে আর কোন গোলযোগ রাখেন নাই।শ্রীশ্রীআনন্দ স্বামীর স্ত্রী তাহার মায়ার সাধন পূর্ণ করিয়াছেন। জীবন্মুক্ত পুরুষের পত্নী হইয়াও তিনি মায়ার ভাবে সন্তানস্নেহ ভূলিতে পারেন নাই। কার্য্য কারণ এক হইলে স্বীয় আদর্শীভূত পুত্র- কন্যার উপাসনা আরম্ভ হয়। সুতরাং সন্তানের ন্যায় জগতবাসী নর- নারীর প্রতি স্বতঃ প্রেরণাতে প্রীতির স্বভাব জাগিয়া উঠে । ধন্যযোগ লাভ হইলে পর সন্তানের ভাব আর থাকে না, কেবল নামের সেবাতেই জীবন মন বিলীন হইয়া যায়।
দয়াময় ব্রহ্মনাম প্রকাশ করিবার নিমেত্তেই শ্রীশ্রী জয়দুর্গা -আনন্দ স্বামী রূপে অবতীর্ণ হইয়াছেন। তাহাদের উপাসনা প্রত্যেক হৃদয়ে উপস্থিত হইলেই মানব মানবীর সমুদয় জীবনের চরিতার্থতা জানা যাইবে।
সর্ব্বনামের মধ্যে জীবনের ভার অর্পিত হইলেই এ তত্ত্বের উপলব্ধি হইবে। দয়াময় সর্ব্বাধাররূপে জীবের মঙ্গল বিহিত করিয়াছেন, কারণ এই যে, কোন প্রকারের আংশিক ভাব অপরিণত অবস্থায় থাকিয়া গেলে সকল কামনার নিঃশেষ হয় না এবং কামনার অতীত পুরুষোত্তম স্বরূপ লাভ করিতে হইলেও সকল অতিক্রম করিতে হয়। নাম এবং নামী এক, ইহাতে সন্দেহ মাত্র নাই।
সর্বশক্তিমান গুরুসেবা এই নামেতেই সফল হইয়া যায়। পুত্র, পৌত্রাদিক্রমে গুরুতার ভাব এ সাধনের অঙ্গীভূত নহে। কামিনী-কাঞ্চনরূপ বহ্নিমান জীবদেহ সকল অবস্থা পর্যালোচনা করিলে চিন্তাশীল ব্যক্তি ইহা জানিতে পারিবেন।
সার্বজনীন সেবাতে আমাদের শান্তি হইবে। এই সেবা তিন ভাগে বিভক্ত।
# প্রথম অবস্থার কথা এই যে, সাধারণ মানবগণ প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে নিত্য, শুদ্ধ, বুদ্ধ, চৈতন্যস্বরূপ সর্ব্বব্যাপী সত্তার ধ্যান ধারণায় অসমর্থ হইয়া কেবল গুরুতে বিশ্বাস প্রবণ হইবে এবং নামের মধ্যে আশার অনুকূল কার্য্য লাভের নিমিত্ত গুরুর উপাসনা করিবে।
# দ্বিতীয় অবস্থার মধ্যে বিশেষ ভাবে কেহ কেহ কার্য্য করিবেন, তাহাদের সাধনার ভাব এই যে নামের মধ্যে প্রয়োজনানুসারে দর্শন ধারণার কার্য্য প্রকাশ অপ্রকাশ উভয়ভাবে লাভ করিতে করিতে তাহাদের জীবন অতিবাহিত হইবে।
# তৃতীয় কথা এই যে সাধন ভজন পূর্ণ সম্পদ জানিয়া, দেব মানব এক ভাবিয়া হৃষিকেশ শক্তির অধীনে মহাত্মারা কার্য্য করিবেন। তাঁহাদের অগোচর কিছুই থাকিবে না; সেবক সেব্য ভাব ইহাদের জন্য প্রতিষ্ঠিত নহে। তুমি এবং আমি এ ধারণাও ইহাদের হৃদয়নিহিত শক্তির বন্ধন নহে। সুতরাং মহাত্মারা জগতবাসীর নেতা হইবেন। তাহাদের যোগেই জীবন্মুক্তির কার্য সাকারভাবে প্রকৃতি পুরুষ যোগে বিষয় অবিষয় যোগ পথের রসলতা সঞ্চারিত করিবে।
দয়াময় কার্য্যকারীদিগের মধ্যে কেবল কতিপয় ব্যক্তিকে এরূপ অধিকার দিয়াছেন। সমন্বয় মুর্ত্তির প্রতিভা এ সকলের পূর্বাপর কার্য্য হইবেক।
রাসায়নিক শক্তি ব্যতীত উপযোগিতা আসিবে না। নীলবর্ণ এবং হরিৎবর্ণ রাসায়নিক শক্তির বিশেষ বৃদ্ধিতে জগত কোলে দয়াময়কে প্রচার ক্ষেত্রে প্রকাশ করে। দণ্ডকমণ্ডলুধারী বৈষ্ণবগণ নির্মল রস পুষ্টির গৌরবে পতিতপাবন শ্রীশ্রীগৌরহরির উপাসক হইলেও কদাপি কার্য্য কারণ এক করিতে পারেন নাই। নামের মধ্যে না আছে এমন কিছু নাই ।
নাম বিটপীর সর্ব্বাঙ্গসুন্দর কথা এই যে অন্তর বাহিরে কেবল নামের আকার, নামের ব্যাপার অবলোকন করা, কেহই অনুদার হৃদয় লইয়া কার্য্য করেন নাই কিন্তু উদারতার মাধুরী ষড়ৈশ্বর্য্যপূর্ণ হরির কার্য্য লাভে জগন্মুক্তির বিশালতা বিদুরিত করে। অতএব আমাদের কর্তব্য এই যে জীবন্মুক্তি আদর্শের মধ্যে রাখিয়াই অনুকূল প্রতিকূল উভয় ভাবের সামঞ্জস্যযোগের করণকারণ উপাসনার মাধুরী হৃদয়ঙ্গম করতঃ সর্ববনাম চিন্তনে তৎপর হইবে ।
সাধন সম্বন্ধে উপদেশ এই যে নানা ভাবের বাক্তি নানা ভাবের কার্য্য করিবে। জীবের স্বভাবানুযায়ী সাধন ব্যতীত মনের যোগ শেষ হইতে পারে না, মানসিক ব্যাকুলতার মধ্যে প্রকৃতিগত উপাসনার শক্তি সর্বত্র লক্ষিত হইতেছে। ধর্ম্মনিষ্ঠার লক্ষণাদি প্রকৃতির সহিত যোগেই প্রকাশিত হইয়াছে। ভাবের বৈষম্যেই ত্রিভুবন চলিতেছে। নামের মধ্যে প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য নির্দ্দিষ্ট পথ আছে। একপথে মুক্ত হইলে পর জগত উপস্থিত হইবে; কেননা আধার-আধেয়কৃত জীবের প্রকৃতি-পুরুষাত্মক সেবার মধ্যে মঙ্গল নিহিত আছে।
মাতাপিতার মধ্যে জীবের প্রকৃতি সম্পূর্ণরূপে অব্যক্ত অবস্থায় কথঞ্চিৎ বিকশিত হয়। সর্ব্বনাম উপলব্ধিতে মনের প্রকৃতির সকল দিক ফুটিয়া বাহির হইলে পরে কার্য্যকলাপের মধ্যে ক্রমে এই সংবাদ অবতীর্ণ হয়। বাস্তবিক কথা, আমিত্বের যোজনা দ্বারাই একে অন্যের সহিত পার্থক্য বুঝিতেছে। জিতেন্দ্রিয় মহাপুরুষগণের স্বভাবের মধ্যেও ঈদৃশী লীলা দৃষ্ট হইবে। শরীর এবং আত্মার একীভূত দয়াময় কীৰ্ত্তন লাভের পর সকল আশার পূরণ হয়; সুতরাং অহর্নিশ জয়দুর্গা-আনন্দ যোগের মহিমাতে সর্বাগ্রে “রাম কৃষ্ণ হরি” এই বিশ্বজীবনের মূলমন্ত্র উচ্চারিত হইবে। তৎপরে, 'হরি ওঁ দয়াময়' মন্ত্রাধার কার্য্য কারণচ্ছলের সর্বাত্মক মহাসাধন আনয়ন করিবে।
কিন্তু ইহাতে শান্তির সাধন বিলম্বিত হয় বলিয়া আবার একটি বিষহারিনী উপাসনার প্রকাশ হইবে। ইহাতে ব্রহ্মনামের ধ্বনিতে আসুরিক সাধনে সিদ্ধযোগ কিয়ৎপরিমাণে জগৎশক্তির মৌলিক তত্ত্বোপলব্ধি অনুভূতির অগোচর রাখে । এই উপাসনা বিষয় অবিষয় “রাম কৃষ্ণ হরি দয়াময়” এবং “হরি ওঁ দয়াময়” নামকে কোলে করিয়া “সংগ্রাম সিদ্ধি জয় দয়াময়” নামের বিচার আনয়ন করিতে থাকে। কিন্তু কার্যকারণের মধ্যে সংসারসেবা অপূর্ণ আছে বলিয়াই উক্ত উপাসনাতে “বাধা বিঘ্ন জয় দয়াময়" নাম কার্য্য করিবে। আমি বলিতেছি উল্লিখিত নামত্রয়ের শক্তি কেবল “দয়াময়” নামে ষোল আনা বর্তমান আছে। প্রকৃতিপুরুষ যোগে কার্যকর, --দেখিবে।
দয়াময় কৃপাপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণের মধ্যে এই রহস্য উদ্ঘাটন করিবেন। সকলের জন্য এই কথা নহে। সাৰ্ব্বভৌমিক সত্যের অধিকারী না হইলে কেহ এই কথার মর্ম বুঝিবেন না। পরস্পর উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে অবশ্য একদিন প্রত্যেকেই এই সাধন পাইবেন।
কারণ এই যে মুক্তির অধিকার সকলের জন্যই নির্দিষ্ট হইয়াছে। তামসিক ভাবে কার্য্য করিলে কামের সেবা পূর্ণ হইবে, কিন্তু নামের সেবা আদর্শের মধ্যে সর্ব্বনাম প্রকাশিত না হইলে হইতে পারে না ।
জীবের স্বভাব সর্ব্বযোগের মধ্যে প্রেম অপ্রেম, জ্ঞান অজ্ঞান, কর্ম অকর্ম্ম আশ্রয় করিয়াই বিশ্ব-প্রেম আকর্ষণ করিতেছে। অনন্তের মহিমা হৃদয়কে মথিত করিলেই শান্ত, দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য, মধুর ক্রমে জীবজগত সর্ব্বনামের মধ্যে অচিন্ত্য-স্বরূপিণী রাধাকৃষ্ণ লীলার অবতরণিকা করে। প্রেমের শক্তিতেই নামরসে জীবের স্বভাব পূর্ণ হইতে পারে।
সংসারের মধ্যে থাকিয়াই 'নাম' করিবে। বিষয়শক্তির পূর্ণ মাধুরী অবিষয় যোগে উপলব্ধি করিবে। ভোগের শক্তি ইন্দ্রিয়াতীত কর্ম্মযোগ নায়িকা সাধনে আনিলে দেখিবে মধুর লীলাতে বিষয়সেবা প্রখরভাবে বিরাজ করে এবং গৃহিণীযোগেই এই সম্পদ পূর্ণ হইতে পারে। গৃহিণী সৃষ্টি স্থিতির কেন্দ্র। স্বামী এবং স্ত্রী যুগলরূপের মহিমাতে সিদ্ধ হইলে জগন্ময় জ্যোতি লাভে ধন্য হয়। কেননা প্রকৃতিপুরুষ যোগেই সৃষ্টি স্থিতি প্রলয় নামে বিচরণ করে। ধর্মব্রত স্ত্রী-পুরুষ যোগে সিদ্ধ হইবে।
কালী-কৃষ্ণ-শিবযোগ পূর্ণ হইলে মহাসাধন আসে। এ তিন আদর্শের মধ্যে সমন্বয় ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত না হইলে উপাসনাই আরম্ভ হয় না; সুতরাং অগ্রে 'কালী' পরে 'কৃষ্ণ' শেষে 'শিব এ তিন ভাবের মধ্যে নিরত থাকিয়া কার্য্য করিবে। শান্তির সাধনা প্রেমের শক্তি জাগিলেই দেখা দিবে এবং 'ব্রহ্ম দয়াময়' নামেতে শিবযোগ পূর্ণ হইয়া গেলে আনন্দ জয়দূর্গার সাধন আসিবে। তবে কখন কখন সাকার নিরাকার উভয়ভাবে সকলদিকের কার্য্যই হইবে। আমি বলিতেছি, জগত্ সাধন পূর্ণ করিবার জন্য সর্ব্বযোগিনী মহাশক্তির কার্য্যে সিদ্ধকাম হইলেই নামের শক্তি বিশেষভাবে আসিবে।।
( সূত্র : মহারাজ আনন্দ স্বামীর বিশেষ আশীর্বাদপুষ্ট, মহর্ষি মনোমোহনের অন্যতম শিষ্য সাধক লব চন্দ্র পাল প্রণীত " আশীর্বাদ " নামক গ্রন্থ থেকে নেয়া। লেখাটি মহারাজ আনন্দ স্বামীর ১৯২ তম শুভ আবির্ভাব উৎসব উপলক্ষে নিবেদন করা হলো। আশীর্বাদ গ্রন্থখানা অনেকের সংগ্রহে নাই ভেবে লেখাটি প্রচার করা হলো।) 🙏🙏