29/04/2025
✅ মানুষের অকাল মৃত্যু হয় কেন?
আমরা প্রায়ই শুনি ও দেখি মানুষের অকালমৃত্যু ঘটছে। কেউ মারা যাচ্ছে মাত্র দশ বছর বয়সে, কেউ বিশ বছরে, কেউ চল্লিশে, কেউ বা জন্মানোর আগে মায়ের গর্ভেই। আবার মৃত্যুর কারণও নানা রকম। কেউ মারা যাচ্ছে পানিতে ডুবে, কেউ গাড়ি দুর্ঘটনায়, কেউ গাছ থেকে পড়ে, কেউ বিষ খেয়ে, আবার কেউ আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। এই যে চলমান সপ্তাহ তে দেখেছি, দুইজন বড়ুয়া যুবক গলায় দঁড়ি দিয়ে মারা গেছে। তাহলে প্রশ্ন জাগে এই অকালমৃত্যুর পেছনের আসল রহস্য কী? কেন এমন হয়? তাহলে আসুন, ত্রিপিটকের আলোকে এই রহস্য খুঁজে বের করি।
তখন ভগবান বুদ্ধ জেতবন বিহারে অবস্থান করছিলেন। সে সময় শুভমানব ভগবান বুদ্ধ কে এ বিষয়ে বললেন, “হে গৌতম, কী কারণে মানুষ একই মানবজন্ম পেয়েও কেউ দুর্ভাগা আর কেউ সৌভাগ্যবান হয়?” যেমন: কেউ হয় অল্পায়ু, কেউ দীর্ঘায়ু; কেউ বহু রোগে ভোগে, কেউ হয় অল্প রোগাক্রান্ত; কেউ হয় কুশ্রী, কেউ রূপবান; কেউ দুর্বল, কেউ শক্তিশালী; কেউ ভোগসম্পদে সীমিত, কেউ ভোগ সম্পদে পরিপূর্ণ; কেউ জন্মায় নীচকুলে, কেউ উচ্চকুলে; কেউ হয় মূর্খ, আবার কেউ হয় প্রজ্ঞাবান। হে গৌতম, কী কারণে (…) মানুষের মধ্যে এই রকম পার্থক্য দেখা যায়?
শুভ মানবের প্রশ্ন শুনে বুদ্ধ বললেন,
হে মানব, এই প্রাণীজগতে কর্মই সত্ত্বগণের নিজস্ব সম্পদ, সত্ত্বগণ কর্মেরই উত্তরাধিকারী। কর্মই জন্ম নির্ধারণ করে, কর্মই বন্ধু, এবং কর্মই একমাত্র আশ্রয়। সুতরাং, কর্মই সত্ত্বগণের জীবনকে হীন ও উৎকৃষ্টরূপে বিভক্ত করে।
বুদ্ধের কথা শুনে শুভমানব বললেন, হে গৌতম, আপনার এই সংক্ষিপ্ত গভীর ভাষণের অর্থ আমি পুরোপুরি বুঝতে পারিনি। আপনি এমনভাবে ধর্মদেশনা করুন, যাতে আমি বিস্তৃত রূপে প্রদত্ত ধর্মোপদেশ যথাযথভাবে জানতে ও বুঝতে পারি।
তাই ভগবান বুদ্ধ শুভমানবকে বললেন, হে মানব, তাহলে শ্রবণ করো, মনোযোগ সহকারে মনোনিবেশ করো। আমি তোমার জন্য বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করব।
হে মানব, অনেকেই আছে যারা প্রাণীহত্যা করে, লোভপরায়ণ হয়, সর্বদা প্রাণীর রক্তে রঞ্জিত হস্ত থাকে, হত্যা ও প্রহার কাজে লিপ্ত থাকে এবং জীবের প্রতি দোয়া-সহানুভূতি প্রকাশ করে না। এইভাবে যা কর্ম সম্পাদিত হয়, সেই কর্ম-প্রভাবে সে দেহাবসানে মৃত্যুর পর অপায়, দুর্গতিতে, অসুরলোকে কিংবা নিরয়ে (নরকে) জন্মগ্রহণ করে। তবে যদি সে অপায়, দুর্গতি বা নিরয়ে জন্ম না নিয়ে মনুষ্যলোকে জন্মগ্রহণ করে, তবে সে হয় অল্পায়ু।
হে শুভমানব, যে ব্যক্তি প্রাণীদের প্রতি নিষ্ঠুর, লোভী, হত্যা ও প্রহারকর্মে রত তার সেই পাপকর্মই অল্পায়ু হওয়ার মূল কারণ ও হেতু। (ম.নি.৩.২৮৯)
[উপরোক্ত বিষয়গুলো এই নিবন্ধের আলোচ্য বিষয় নয়। তাই শুধু সেগুলোর নাম উল্লেখ করার পর বিস্তারিত আলোচনা থেকে বিরত থাকলাম।]
এ প্রসঙ্গেও মিলিন্দপ্রশ্নে সাত প্রকার লোকের অকাল মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে, যারা আয়ু বেশি হলেও বিভিন্ন কারণে অকালেই মৃত্যুবরণ করে। সেই সাত প্রকার হলো-
১. ক্ষুধার্ত ব্যক্তি: যে ব্যক্তি খাবার না পেয়ে নিজের পেটের ক্ষুধায় ভুগে, আয়ু থাকার সত্ত্বেও অকালেই মারা যায়।
২. পিপাসিত ব্যক্তি: যে ব্যক্তি পানীয় না পেয়ে শরীর শুকিয়ে যায়, আয়ু থাকা সত্ত্বেও অকালে মৃত্যু ঘটে।
৩. সর্পদংশন: যে ব্যক্তি সাপের কামড়ে বিষাক্ত হয়ে পড়ে, চিকিৎসা না পেয়ে আয়ু থাকা সত্ত্বেও অকালেই মারা যায়।
৪. বিষ খাওয়া ব্যক্তি: যে ব্যক্তি বিষ খেয়ে পেট ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রজ্বলিত হয়, ওষুধ না পেয়ে আয়ু থাকার পরও অকালে মারা যায়।
৫. অগ্নিদগ্ধ ব্যক্তি: যে ব্যক্তি আগুনে পুড়ে যায়, এবং পানি বা চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যুবরণ করে।
৬. জলে ডুবছে ব্যক্তি: যে ব্যক্তি পানিতে ডুবে যাচ্ছিল, আশ্রয় না পেয়ে আয়ু থাকা সত্ত্বেও অকালেই মারা যায়।
৭. শরবিদ্ধ ও রোগী: যে ব্যক্তি শারীরিকভাবে দুর্বল বা অসুস্থ, চিকিৎসা না পেয়ে আয়ু বেশি হলেও অকালে মারা যায়।
এর কারণ কী? তার রহস্য কী?
ক. ক্ষুধায় মৃত্যুর ফল:
যে ব্যক্তি পূর্বজন্মে অন্যকে কষ্ট দিয়ে ক্ষুধায় মেরে ফেলে, সে বহু হাজার বছর ক্ষুধার্ত অবস্থায় কাটায়। বার্ধক্য, যৌবন বা শৈশবে সে দুর্বল, শুষ্ক, ক্লান্ত, পেট জ্বালা করে, এবং সেই ক্ষুধার কষ্টে মৃত্যু হয়। এটা তার কালমৃত্যু।
খ. পিপাসায় মৃত্যুর ফল:
যে ব্যক্তি পূর্বজন্মে কাউকে পিপাসায় রেখে মেরেছে, সে পরবর্তীতে বহু বছর প্রেত হয়ে তৃষ্ণায় কাতর থাকে। সে দুর্বল, শুকনো ও কষ্টে ভোগে, এবং বাল্য, যৌবন বা বৃদ্ধ বয়সে পিপাসার কারণেই মারা যায়। এটাও কালমৃত্যু।
গ. সাপে কাটা মৃত্যুর ফল:
যে পূর্বজন্মে কাউকে সাপে কামড় দিয়ে হত্যা করেছে, সে বহু হাজার বছর সাপের মুখে পড়ে কাটায়—এক অজগর থেকে আরেক অজগরের মুখে, এক কৃষ্ণসর্প থেকে আরেক কৃষ্ণসর্পের মুখে ঘুরতে থাকে। শেষে সেই সাপের দংশনে মৃত্যু হয়। এটাও কালমৃত্যু।
ঘ. বিষপ্রয়োগে হত্যার ফল:
যে ব্যক্তি পূর্বজন্মে কাউকে বিষ খাইয়ে হত্যা করেছে, সে বহু বছর ধরে বিষের যন্ত্রণায় দেহে আগুনের মতো জ্বালা অনুভব করে। তার শরীর ছিন্ন-ভিন্ন হয়, পঁচা গন্ধ বের হয়, এবং সেই কষ্টেই তার মৃত্যু ঘটে। এটাও কালমৃত্যু।
ঙ. আগুনে পোড়ানোর ফলে মৃত্যু:
যে আগুন দিয়ে কাউকে আগের জন্মে পুড়িয়ে মেরেছে, সে পরবর্তীতে এক অগ্নিপাহাড় থেকে আরেক অগ্নিপাহাড়ে, এক যমলোক থেকে আরেক যমলোকে ঘুরতে থাকে। তার দেহ পুড়ে যায়, আর সেই আগুনেই মৃত্যু হয়। এটাও কালমৃত্যু।
চ. জলে ডুবিয়ে হত্যার ফল:
যে পূর্বজন্মে কাউকে জলে ডুবিয়ে হত্যা করেছে, সে পরবর্তীতে বহু বছর দুর্বল দেহ ও কষ্টে ভোগে, এবং শেষে জলে ডুবে মৃত্যুবরণ করে। এটাও কালমৃত্যু।
ছ. অস্ত্রে হত্যা করার ফল:
যে ব্যক্তি তির বা শেল দিয়ে কাউকে মেরেছে, সে বহু বছর ছিন্ন-ভিন্ন শরীর নিয়ে কাটায়। তার দেহ তিরবিদ্ধ অবস্থায় থাকে এবং বাল্য, যৌবন বা বৃদ্ধ বয়সে সেই যন্ত্রণায় মৃত্যু হয়। এটাও কালমৃত্যু। (মি.প.৮.৪৩-৪৪)
আবার আট প্রকারে জীবের মৃত্যু ঘটিয়া থাকে। সেগুলো হলো: বায়ুর প্রকোপে, পিত্তের প্রকোপে, কফের প্রকোপে, সন্নিপাত দ্বারা, ঋতুর পরিণতিতে, বিষম ব্যবহারে, বাহিরের কোনো উপক্রম দ্বারা এবং কর্মবিপাকবশত জীবগণের মৃত্যু ঘটিয়া থাকে।
এগুলের মধ্যে কর্মবিপাকবশত উচিত সময়ে যে মৃত্যু হয়, সেটা কাল মৃত্যু। অবশিষ্টের অসময়ে মৃত্যু হয়। (মি.প..৮.৪৩)
অভিধর্মে মতেও সত্ত্বেগণের মৃত্যু আর পুনর্জন্ম হওয়ার সম্বন্ধে চার প্রকারে কথা উল্লেখ আছে। সেগুলো হচ্ছে, আয়ুষ্কাল ফুরিয়ে যাওয়ার কারণে, জনক কর্মের শক্তি ফুরিয়ে যাওয়ার কারণে, উভয়ের ফুরিয়ে যাওয়ার কারণে এবং ধ্বংসাত্মক কর্মের হস্তক্ষেপের কারণে।
তাহলে এই সকল ভয়াবহ কালমৃত্যু থেকে বাঁচার উপায় কী? উপায় হচ্ছে, কোনো প্রাণীকে কায়, বাক্য, কিংবা মন দ্বারা আঘাত বা হত্যা না করা। কারণ, যেমন নিজের জীবন নিজের কাছে প্রিয়, তেমনি অন্য প্রাণীর জীবনও তার কাছে প্রিয়। তাই, কোনো প্রাণীকে অস্ত্রসস্ত্র বা অন্য কোনো উপায়ে আঘাত বা কষ্ট দেওয়া উচিত নয়। এটাই বুদ্ধের উপদেশ।
সকলের সম্যক জ্ঞানের উদয় হোক 😒।
“সব্বে সত্তা সুখিতা হোন্তু
জগতে সকল প্রাণী সুখী হউক”
সংগৃহীত...
— feeling sad in Dhaka.