20/05/2026
"আজ ২০মে, চুকনগর গণহত্যা দিবস"
- ইতিহাসের অন্তরালে হারিয়ে যাওয়া এক নৃশংস হিন্দু হত্যাকান্ড।।
"চুকনগর গণহত্যা" বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সবচেয়ে নৃশংস হত্যাকান্ডের অন্যতম একটি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও এদেশীয় দোসর রাজাকার আলবদর বাহিনীর সহায়তায় ১৯৭১ সালে এমন বর্বরোচিত কর্মকাণ্ড সংঘটিত করে।
স্বাধীনতা প্রত্যেক মানুষের জন্মগত অধিকার এবং প্রতিটি মানুষ জন্মমাত্রই স্বাধীন। কিন্তু সে স্বাধীনতা বারংবার হস্তচ্যুত হয় হায়নাদের আঁচড়ে। পরাধীনতার সে শেকল পড়িয়ে, আমাদের করা জর্জরিত। কিন্তু সে শেকল কিছু মুক্তিকামী মানুষেরা চূর্ণ করে এনে দেয় মুক্তির সোপান। ভিয়েতনাম থেকে দক্ষিণ এশিয়া স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করেই তাহা অর্জিত হয়েছে।
এরুপ এক স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ নয় মাস মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে এ ভূমি মুক্ত হয় হানাদারদের থেকে। কিন্তু দেশ স্বাধীন হলেও রেখে যায় অসংখ্য বধ্যভূমি। যাহাদের ইতিকথা বরই মর্মান্তিক এবং নৃশংস। এমনই এক মর্মান্তিক, হৃদয়বিদারক ঘটনা খুলনার চুকনগর গণহত্যা।
ভারত সীমান্তের নিকটবর্তী চুকনগর খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলায় অবস্থিত। আটলিয়া ইউনিয়নে চুকনগর বাজার অবস্থিত। চুকনগর খুলনা শহর থেকে প্রায় ৩২ কি,মি পশ্চিমে ভদ্রা নদীর তীরে অবস্থিত।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পাক-হানাদার বাহিনীর বর্বরতা থেকে নিজেদের প্রাণ রক্ষার্থে হাজারো মানুষ খুলনা জেলার চুকনগরে এসে উপস্থিত হয়। কারণ এই স্থান ছিল ভারতীয় সীমান্তের নিকটে। কিন্তু ১৯৭১ সালের ২০মে ঘটে ইতিহাসের নির্মমতার চরম দৃষ্টান্ত। দেশত্যাগ করে নিজেদের প্রাণ রক্ষার্থে আসা হাজারো শরণার্থীদের উপর পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ও এদেশীয় দোসর রাজাকার আলবদর বাহিনীর বর্বরতার শিকার হয়। উল্লেখ্য যে, চুকনগরে আসা জড়ো হওয়া মানুষ জন ছিলেন সনাতন ধর্মের অর্থাৎ হিন্দু জনগোষ্ঠী।
আটলিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন গোলাম হোসেন। শান্তি কমিটির সদস্য রাজাকার চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন ও ভদ্রা নদীর খেয়া ঘাটের ইজারাদার শামসুদ্দিন খাঁ নামের এক বিহারী ১৯ মে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাতক্ষীরা ক্যাম্পে যোগাযোগ করে বললেন, চুকনগর বাজারের হিন্দুদের ঢল নেমেছে। পাকিস্তানি ক্যাম্পে যোগাযোগ করার পরে হানাদারেরা খবর পেয়ে একটি ট্রাক ও একটি জিপে করে সেনা পাঠায়। ১৯ মে অর্ধ লক্ষের বেশি মানুষ চুকনগরের পাতখোলা বিল, চুকনগরের কাঁচাবাজার, মাছবাজার, কাপুড়িয়া পট্টি, গরুহাটা, বাজারের কালী মন্দির, বটতোলাসহ বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান নেয়। পরবর্তী দিন সকলে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে এই নৃশংসতা থেকে মুক্তি পাবে এটাই ছিল লক্ষ্য। সে সীমান্ত পাড়ি আর দেওয়া হয়নি।
২০ মে ১৯৭১ ভোর হতেই চারপাশ জেগে উঠলো। মানুষের স্রোত তখন সীমান্তের পানে। পায়ে হেঁটে সীমান্তের দিকে যাচ্ছে কিছু মানুষ, কেউ মালপত্র গুছিয়ে নিচ্ছে, কেউ রান্না চাপিয়েছে। কারো রান্না হয়ে গেছে, অনেকে রওনা দিয়ে দিয়েছে সীমান্তের উদ্দেশ্যে, অনেকে মাত্র খেতে বসেছে কেবল।
সকাল সাড়ে ১১টার ঠিক এমন সময়েই সাতক্ষীরা থেকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ১টি ট্রাক ও ১টি জিপ চুকনগর- সাতক্ষীরা সড়ক ধরে মালতিয়া মোড়ের ঝাউতলায় এসে উপস্থিত হয়। সে সময় পাশের পাট খেতে কাজ করছিলেন মালতিয়া গ্রামের চিকন আলী মোড়ল নামে একজন। তিনি গাড়ির শব্দে উঠে দাঁড়ালে পাকিস্তানি হানাদারেরা তাকে দেখে গুলি করতে গেলে তিনি হাতের কাস্তে ছুঁড়ে মারেন হানাদারদের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে ব্রাশফায়ার। এরপর একই গ্রামের সুরেন্দ্রনাথ কুন্ডুকেও গুলি করে মারা হয়।
এরপর হানাদার বাহিনী বাজারে ঢুকে গণহারে নিরীহ মানুষদের লাইনে দাঁড়িয়ে গণহত্যা শুরু করে হানাদারেরা। পাকিস্তানি হানাদারেরা ভাগ হয়ে এক দল পাতখোলা বিল থেকে চাঁদনী, ফুটবল মাঠ, চুকনগর স্কুল, মালতিয়া, রায়পাড়া, দাসপাড়া, তাঁতিপাড়া, ভদ্রা ও ঘ্যাংরাইল নদীর পাড়ে জমা হওয়া মানুষের উপর গুলি চালাতে শুরু করে। চুকনগরের আকাশ যেন ছেয়ে গিয়েছিল মৃত্যু যন্ত্রণায়। প্রাণ বাঁচাতে মানুষের আপ্রাণ চেষ্টা হওয়া সত্ত্বেও হালকা মেশিনগানের অবিরাম গুলিতে ধ্বংসলীলা নেমে এসেছিলো এই জনপদের বুকে। পাশ্ববর্তী ভদ্রা নদীর জল সেদিন লাল টকটকে রক্তে ভেসে গিয়েছিল। কোথাও লাশের কারণে নদী পথ আটকে গেছে।
সকাল ১১টায় শুরু হত্যাকান্ড তাদের সর্বশেষ গুলি শেষ হওয়া পর্যন্ত চলেছিলো। চার মাইল ব্যাপী চলা এই নিষ্ঠুর গণহত্যায় শহীদদের প্রকৃত সংখ্যা আজও পাওয়া যায়নি। দিনশেষে একটি ধারণা করার প্রয়াস যায় কি? মাত্র ০৪ ঘন্টায় ব্রাশফায়ারে ঠিক কত মানুষ হত্যা করা সম্ভব। ৩০০ থেকে ৪০০ মানুষ, নাকি আরেকটু বেশি ৬০০ কিংবা ৭০০! তবে বাস্তবে সেদিনের নৃশংতা ধারণা চেয়েও ছিল ভয়ংকর সংখ্যাটা প্রায় ১২ হাজারের মতো! প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে এই গণহত্যায় শহীদ হয়েছেন প্রায় ১২ হাজারের মতো নিরীহ মানুষ।
এই গণহত্যায় প্রকৃত সংখ্যা না পাওয়ার কারণ নদীর পানিতে প্রথমে অজস্র লাশ ভাসিয়ে দেয়া হয়েছিল। অন্যদিকে আঞ্চলিকভাবেও উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি কারণ গণহত্যায় শহীদ বেশিরভাগ মানুষ ছিলেন চুকনগর কিংবা ডুমুরিয়া ও খুলনার বাইরের অঞ্চলের। বিশেষ করে বাগেরহাট বরিশাল, ফরিদপুর, রামপাল, মোড়েলগঞ্জ, কচুয়া, শরণখোলা, মংলা, দাকোপসহ নানা জায়গা থেকে যারা এসেছেন তাদের স্বজনদের খোঁজ পাওয়া যায়নি। কারণ স্বজন পরিজনেরা ভেবেছিলো তারা হয়তো নিরাপদে ভারতে পৌঁছে গেছেন, মুক্তিযুদ্ধের পর আর ফিরে আসেননি।
চুকনগর গণহত্যা থেকে বেঁচে ফেরা গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শীদের মন্তব্য থেকে জানা যায় কতটা নৃশংসতা সেদিন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও এদেশীয় দোসররা দেখিয়েছিলো।
খুলনার বটিয়াঘাটার উত্তর বাঙ্গিমারি গ্রামের বলাই গোলদার বলেন, ‘হত্যাকাণ্ড শুরু হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে চুকনগর কলেজের ভিতরে আমাদের একটি মেয়ে হয়। ওদের পরিষ্কার টরিস্কার করে যখন ভারত যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাসে উঠিয়ে দিই তখন দক্ষিণপাশ থেকে গুলি শুরু হয়। বাসওয়ালা ওদের নামিয়ে দিয়ে বাস নিয়ে চলে যায়। তখন একটা ছত্রভঙ্গ অবস্থা হলো। কাউকে খুঁজে পেলাম না। আমি কাঁদতে লাগলাম। গুলি চললো আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা। সবাইকে খুঁজে ফিরছি, কাউকে পাইনা...। সেদিনের কথা কি বলবো আর! একজনের পেটের ভুঁড়ি আরেকজনের সঙ্গে লেগে গিয়েছিল। এখানে সেখানে বহু লোক মেরেছে, ২০ হাজারের উপরে হবে।’
চুকনগর গ্রামের আনসার আলী সরদার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে বলেছিলেন, ‘শুধু আমরা ৪২ জনই ২১টি বাঁশে করে লাশ ঠেলে নদীতে ফেলেছিলাম। প্রতিবার ২০০টি করে লাশ। ২১ মে ভোর থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত লাশ ফেলেছি।’
চুকনগরের কৃষক গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী আফসার আলী সরকার বলেছিলেন, ‘সকালবেলা একখানা মিলিটারি গাড়ি আসলো। আমাদের বললো লাশ ফেলানোর জন্য। এক হিন্দু বাড়ি থেকে বাঁশ নিলাম। বাঁশ নিয়ে বেশ খাটো খাটো করে এপাশ বেঁধে দুই জনে মিলে আমরা ৯টা/ ১০টার দিকে নদীতে লাশ ফেলতে শুরু করলাম। আমার সাথে ছিল আমার বেয়াই ইনসার আলী। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত লাশ ফেললাম। প্রথমে গুনেছি তারপর গুনিনি। অগণিত লাশ ফেললাম। রাতে বাড়ি এসে গোসল করে শুয়ে পড়লাম। সারাদিনে কম করে হলেও আমরা ৫ থেকে ৬ হাজার লাশ ফেলেছি।’
চুকনগর গণহত্যায় অজস্র শিশু হারিয়েছিল তাদের বাবা মা কে। অনেক নবজাতককে চুকনগরসহ আশপাশে বহু গ্রামের মানুষ লালনপালন করেছিলেন। এর মধ্যে এমনই এক শিশু ‘সুন্দরী’। গণহত্যার পরদিন তথা ২১ মে সকালে বর্তমান চুকনগর কলেজের সামনে পাতখোলা বিলে বাবা চিকন আলী মোড়লের লাশ খুঁজতে গিয়েছিলেন এরশাদ আলী মোড়ল। এসময় লাশের স্তুপের মধ্যে মৃত মায়ের স্তন থেকে দুধপানরত ৬ মাস বয়সী এক শিশুকন্যাকে দেখে স্তব্ধ হয়ে গেলেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে শিশুটিকে বাড়ি নিয়ে যান তিনি। তিনি নাম রেখেছিলেন সুন্দরী। এদিকে সুন্দরীর মায়ের কপালে সিঁদুর ও হাতের শাঁখা দেখেছিলেন এরশাদ আলী মোড়ল। তাই হিন্দু ধর্মাবলম্বী হিসেবে এক হিন্দু পরিবারেই বড় করিয়েছেন তিনি।
© বেদ
এক সাক্ষাৎকারে সুন্দরী বলেছিলেন, "চুকনগর বধ্যভূমিতে গেলে আজও বুকটা হাহাকার করে ওঠে। খুঁজে ফিরি মা-বাবাকে। কিন্তু আমি তো জানি না আমার পৈত্রিক বাড়ি কোথায়। শুধু জানি, বাঁচার আশায় আমার পরিবার এখানে এসেছিলো।"
চুকনগর গণহত্যা বিশ্বের কোনো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ একক গণহত্যা। হাজারো বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রাণ রক্ষার্থে শেষ আশ্রয়ের উপর চালানো নৃশংসতা ছিল চুকনগর গণহত্যা। যে গণহত্যার শিকার হয়েছিলো অগণিত হিন্দু শরণার্থী। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যেন হয়ে উঠেছিলো হিটলারের নাৎসি বাহিনী।
আজ ২০ মে! সে চুকনগর গণহত্যা দিবস। সশ্রদ্ধ প্রণাম জানাই গণহত্যার শিকার হওয়া সে সকল আত্মত্যাগকারীদের প্রতি।
🔎Run with