06/03/2026
💸 কোন কোন সম্পদের উপর যাকাত ফরয
যাকাত ফরয হওয়ার জন্য মূলত তিনটি প্রধান শর্ত পূরণ করতে হয়। এই শর্তগুলো পূরণ হলে, একজন মুসলিমকে অবশ্যই তার সম্পদের যাকাত আদায় করতে হবে।
প্রধান শর্তসমূহ:
ক. নিসাব পরিমাণ সম্পদ
নিসাব (نصاب) হলো শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত ন্যূনতম পরিমাণ সম্পদ, যা কোনো ব্যক্তির মালিকানায় থাকলে তার ওপর যাকাত ফরয হয়। নিসাব পরিমাণ সম্পদের দুটি মান রয়েছে:
স্বর্ণের নিসাব: ৭.৫ তোলা (প্রায় ৮৭.৪৮ গ্রাম) খাঁটি সোনা।
রূপার নিসাব: ৫২.৫ তোলা (প্রায় ৬১২.৩৬ গ্রাম) খাঁটি রূপা।
নগদ অর্থ, ব্যবসায়িক পণ্য বা অন্যান্য সম্পদ পরিমাপ করার জন্য সাধারণত রূপার নিসাব মানটিই বর্তমানে ভিত্তি হিসেবে গণ্য হয়, কারণ এর মূল্য কম হওয়ায় অধিক সংখ্যক দরিদ্র মানুষ উপকৃত হতে পারে। যখন কোনো ব্যক্তির নগদ অর্থ, ব্যাংক ব্যালেন্স বা অন্যান্য যাকাতযোগ্য সম্পদের মূল্য এই নিসাব মানের সমান বা তার বেশি হয়, তখনই যাকাত ফরয হওয়ার প্রথম শর্ত পূরণ হয়।
খ. হাওলানে হাওল
যাকাত ফরয হওয়ার জন্য দ্বিতীয় শর্ত হলো, নিসাব পরিমাণ সম্পদ পুরো এক চান্দ্র বছর (Lunar Year) ধরে ব্যক্তির মালিকানায় থাকা। অর্থাৎ, যেদিন তার সম্পদ নিসাব পরিমাণ হলো, ঠিক তার পরের বছর সেই দিন পর্যন্ত যদি ঐ পরিমাণ সম্পদ তার মালিকানায় থাকে, তবেই যাকাত দিতে হবে।
গ. ঋণমুক্ত হওয়া (Free from Debts)
সম্পদশালী ব্যক্তির যদি এমন কোনো ঋণ থাকে যা ঐ সম্পদের মূল্যকে নিসাব পরিমাণের নিচে নামিয়ে আনে, তবে তার ওপর যাকাত ফরয হবে না। অর্থাৎ, যাকাত দিতে হবে সেই পরিমাণ সম্পদের ওপর, যা ঋণ পরিশোধের পরেও নিসাব পরিমাণের সমান বা তার বেশি থাকে।
যাকাতযোগ্য সম্পদের প্রকারভেদ
উপরে উল্লিখিত শর্তগুলো পূরণ হলে, নিম্নলিখিত সম্পদের ওপর ২.৫% (শতকরা আড়াই ভাগ) হারে যাকাত ফরয হবে:
ক. নগদ অর্থ ও সঞ্চয় (Cash and Savings)
ব্যাংক ব্যালেন্স, হাতে থাকা নগদ টাকা, সঞ্চয়পত্র, ফিক্সড ডিপোজিট এবং বন্ডের মতো সহজে রূপান্তরযোগ্য সকল আর্থিক সঞ্চয়ের ওপর যাকাত ফরয।
খ. স্বর্ণ ও রূপা (Gold and Silver)
ব্যবহারের জন্য রাখা হোক বা সঞ্চয় হিসেবে, সোনা ও রূপা যদি নিসাব পরিমাণে পৌঁছায়, তবে তার ওপর যাকাত ফরয।
গ. ব্যবসায়িক পণ্য (Merchandise/Trading Goods)
ব্যবসায় বিক্রির উদ্দেশ্যে রাখা সকল প্রকার পণ্যের বর্তমান বাজারমূল্যের ওপর যাকাত ফরয। এই পণ্যগুলো হতে পারে কাপড়, খাদ্যদ্রব্য, ইলেকট্রনিক্স বা অন্য যেকোনো পণ্য। বছর শেষে এই পণ্যের পাইকারি বা খুচরা বিক্রয়মূল্য হিসাব করতে হয়।
ঘ. বিনিয়োগ (Investments)
বিক্রির উদ্দেশ্যে বা মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে করা শেয়ার, মিউচুয়াল ফান্ড, এবং অন্যান্য বিনিয়োগের (যদি না তা ব্যবসার স্থায়ী সম্পদ হয়) বর্তমান বাজারমূল্যের ওপর যাকাত ফরয।
ঙ. কৃষি পণ্য (Agricultural Produce)
জমির উৎপাদিত ফসল বা ফলের ওপর যাকাত (উশর বা নিসফে উশর) ফরয। এর হার নির্ভর করে সেচ পদ্ধতি কী ছিল তার ওপর:
বৃষ্টি বা প্রাকৃতিক সেচের মাধ্যমে উৎপন্ন ফসলে ১০% (উশর)।
নিজ খরচে সেচের মাধ্যমে উৎপন্ন ফসলে ৫% (নিসফে উশর)।
চ. গবাদি পশু (Livestock)
নির্দিষ্ট সংখ্যক উট, গরু, ছাগল ও ভেড়ার ওপর যাকাত ফরয। তবে তা হতে হবে এমন পশু, যা চারণভূমিতে চরে বেড়ায় এবং ব্যবসার উদ্দেশ্য ছাড়া দুধ, মাংস বা বংশবৃদ্ধির জন্য পালন করা হয়।
🚫 যেসব সম্পদের ওপর যাকাত ফরয নয়:
নিম্নলিখিত সম্পদগুলো সাধারণত যাকাতমুক্ত থাকে:
ব্যক্তিগত ব্যবহার্য জিনিসপত্র: বাসস্থান, ব্যবহৃত যানবাহন, আসবাবপত্র, পোশাক, বাসনপত্র ইত্যাদি।
পেশাগত সরঞ্জাম: কারখানার মেশিন, অফিসের যন্ত্রপাতি, চিকিৎসকের সরঞ্জাম ইত্যাদি (এগুলো ব্যবসার স্থায়ী সম্পদ, পণ্যের আওতায় পড়ে না)।
ঋণের টাকা: যে ঋণ শোধ করা অসম্ভব বলে মনে হয় বা যে টাকা ফেরত পাওয়ার আশা কম।
যাকাতের সঠিক হিসাব ও পরিশোধের মাধ্যমে একজন মুসলিম তার সম্পদকে পরিশুদ্ধ করে এবং সমাজের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে আধ্যাত্মিক প্রশান্তি লাভ করে।