28/08/2026
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
🌎 ইসলামের ইতিহাস-ঐতিহ্যে রবিউল আউয়াল মাস:
⌛ সোনালী অতীতের কুশলী নির্মাতা:
💠 হযরত খাজা সৈয়দ মুহাম্মদ কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকী চিশতি (রহ.)
🗓️ ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরী তাঁর ওফাত দিবস।
কুতুবুল আকতাব হযরত খাজা সৈয়দ মুহাম্মদ কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকী (১১৭৩-১২৩৫) ছিলেন একজন মুসলিম সুফি সাধক। তিনি চিশতিয়া তরিকার সাধক ছিলেন। তিনি হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতীর (রহ.) শিষ্য এবং প্রথম খলিফা ছিলেন। তাঁর নামেই দিল্লীর বিখ্যাত কুতুব মিনার উৎসর্গ করা হয়। শিষ্যত্ব গ্রহণ করার আগেই চিশতিয়া তরিকা শুধুমাত্র আজমির এবং নাগাউর এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। দিল্লিতে স্থায়ীভাবে এই তরিকাকে প্রতিষ্ঠায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তার দরগাহ মেহরাউলের জাফর মহলের পাশেই অবস্থিত। ভারতের অনেক বিখ্যাত শাসক তার উরস মহাসমারোহে উদযাপন করতেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন কুতুবউদ্দিন আইবেক, ইলতুতমিশ যিনি কাকীর জন্য “ঘান্দাক কি বাউলি” নামে এক গভীর নলকূপ স্থাপন করেন, শের শাহ সুরি যিনি একটি বড় গেইট তৈরী করেন, বাহাদুর শাহ (১) যিনি দরগাহের পাশে মতি মসজিদ নির্মাণ করেন, ফারুকশিয়ার যিনি মার্বেলের স্ক্রিন এবং মসজিদ নির্মাণ করেন। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত শিষ্য এবং খলিফা হলেন হযরত খাজা ফরিদউদ্দিন গঞ্জেশকর (রহ.) যিনি আবার দিল্লির বিখ্যাত সাধক হযরত খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়ার (রহ.) পীর। নিজামউদ্দিন আউলিয়ার শিষ্য হলেন মুসলিম সুফি সাধক কবি আবুল হাসান ইয়ামিন উদ-দিন খসরু প্রকাশ আমির খসরু এবং শেখ নাসিরুদ্দিন চিরাগ-ই-দিল্লি।
📗 প্রাথমিক জীবন
কুতুব উদ্দিন বখতিয়ার কাকী ৫৬৯ খ্রিষ্টাব্দে দক্ষিণ কিরগিন্তানের ‘উশ’ নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। ষোলতম শতাব্দিতে মোগল সম্রাট আকবরের উজির আবুল ফজল ইবনে মোবারক রচিত কুতুবউদ্দিনের জীবনী ‘‘আইন-ই-আকবর” তে উল্লেখ করা হয়, তাঁর পিতার নাম কামালুদ্দিন, কুতুবউদ্দিনের দেড় বছর বয়সে ইন্তিকাল করেন। খাজা কুতুবউদ্দিন এর আসল নাম বখতিয়ার এবং পরবর্তিতে কুতুবউদ্দিন নামটা দেয়া হয়। তিনি হোসাইন ইবনে আলী’র (রাদি.) মাধ্যমে প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (সাঃ) এর বংশের সাথে মিলিত হয়েছেন। তাঁর মা, যিনি নিজেই একজন শিক্ষিত মহিলা ছিলেন, তাঁর শিক্ষার জন্য শাইখ আবু হিফসকে নিয়োগ দেন। হযরত মঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.) তাঁর ভ্রমণের সময় যখন আউশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, খাজা বখতিয়ার তাঁর হাতে বায়াত গ্রহণ করেন এবং তার থেকে খেলাফত গ্রহণ করেন। এভাবেই তিনি হযরত মঈনুদ্দিন চিশতির প্রথম খলিফা হিসেবে নিযুক্ত হন।
✅ দিল্লী গমন:
দিল্লী সালতানাতের প্রতিষ্ঠাতা ইলতুতমিশের (১২১১-১২৩৬) এর অবসরের সময় নিজ পীর, খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.)’র একান্ত ইচ্ছায় খাজা বখতিয়ার দিল্লিতে চলে যান এবং সেখানেই বসবাস করতে থাকেন। খাজা বখতিয়ারের আধ্যাত্মিক ক্ষমতা ও দক্ষতা এবং মানবতার অপার মহিমা অবলোকন করে প্রচুর মানুষ প্রায় তাঁর সাক্ষাত লাভে প্রতিদিনি আসা যাওয়া করতেন। তিনি এই আধ্যাত্মিক পথে সাধারণ মানুষকে বায়াত দানও শুরু করে দিয়েছিলেন।
ফলাফলের বা প্রতিদানের আশা না করে অভাবগ্রস্তদের সাহায্য করার মতাদর্শের বিশ্বাসী ছিলেন তিনি। তাঁর বিশিষ্ট শিষ্য, খাজা ফরিদউদ্দিন গঞ্জেশকর, তাঁকে কবচের (তাবিজ) বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন করেন যেগুলো ছিল বিতর্কিত কেননা এগুলো ইসলামে মূর্তিপূজার মত ধর্মীয় সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। এর উত্তরে কাকি বলেন, ইচ্ছা বা বাসনার পরিপূর্ণতা হওয়া কোন কিছুর উপর নির্ভর করে না, কবচ বা তাবিজে আল্লাহর নাম এবং তাঁর কথা বা আয়াত রয়েছে এবং এগুলো মানুষকে দেয়া যাবে। সেমায় নিমগ্ন হয়ে তিনি চিশতিয়া তরিকার আধ্যাত্মিক সঙ্গীতের ঐতিহ্যকে বজায় রাখেন এবং আরো সমৃদ্ধ করেন। ধারণা করা হয় যে হিন্দু ধর্মে ভক্তি নিবেদনের সঙ্গীতের সাথে সুরের সমন্বয় করা হয়, যাতে স্থানীয় মানুষদের সাথে সর্ম্পক স্থাপনের সহায়ক হিসেবে কাজ করে এবং দুই সম্প্রদায়ের মাঝে পারষ্পরিক সমন্বয় সহজ হয়। ১৪ রবিউল আউয়াল ৬৩৩ হিজরীতে (২৭ নভেম্বর ১২৩৫ খ্রিষ্টাব্দ) তিনি একটি সেমা মাহফিলে অংশগ্রহণ করেন যেখানে কবি আহমদ-এ-জাম নিম্নোক্ত পংক্তিটি গেয়ে শোনান:
“যারা আত্মসর্ম্পণের খঞ্জরে নিহত হয়েছে,
অদৃশ্য থেকে তাঁরা প্রতিনিয়ত নব জীবন প্রাপ্ত হয়।”
খাজা বখতিয়ার কাকী এই আধ্যাত্মিক পঙক্তি দ্বারা এতটাই পরমানন্দ লাভ করলেন যে তিনি ততক্ষণাৎ মূর্ছা গেলেন। ঐ আধ্যাত্মিক পরমানন্দের মাঝেই চারদিন পর তিনি ইন্তিকাল করেন। তার দরগাহ (মাজার), দিল্লির মেহাউরুলে অবস্থিত কুতুব মিনার কমপ্লেক্সের নিকটে জাফর মহলের পাশে অবস্থিত। তাঁর জোর নির্দেশ ছিল, ইন্তিকালের পর তার নামাযে জানাযার নেতৃত্ব সে ব্যক্তিই দিবেন, যিনি কখনও কোন হারাম কাজ করেননি এবং আসরের সালাত এর সুন্নত কখনও ছাড়েননি।
🖋️ কাকী উপাধির ঘটনা:
কাকি নামটি দিল্লীর একটি ঘটনার পর তার উপাধি হিসেবে যুক্ত হয়। ঘটনাসুরে, তিনি তাদের চরম দারিদ্রতা, দারিদ্র্য সত্ত্বেও স্থানীয় রুটিওয়ালা থেকে ঋণ না নিতে তিনি তার স্ত্রীকে নিষেধ করেন। পরবর্তীতে তিনি স্ত্রীকে বলেন, যখনই প্রয়োজন হবে তখন ঘরের এক কোণা থেকে যেন কাক (এক ধরনের রুটি) নেন। এরপর, যখনই প্রয়োজন হত আশ্চর্জনকভাবে তারঁ স্ত্রী ঘরের কোণা থেকে কাক পেয়ে যেত। ইতিমধ্যে রুটিওয়ালা এটা ভেবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল যে, কেন খাজা ঋণ নেয়া বন্ধ করে দিল। তিনি চিন্তা করলেন হয়ত তিনি প্রায়শ খাজার সাথে রাগারাগি করতেন, সেজন্য খাজা ঋণ নেয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। ফলে, রুটিওয়ালার স্ত্রী কুতুবউদ্দিনের স্ত্রীর কাছ থেকে এর কারণ জানতে চাইলেন। তিনি তাকে কাক এর আশ্চর্যজনক ঘটনাটি বর্ণনা করলেন। এই গোপন রহস্যটি উন্মোচিত হওয়ার পর যদিও কাক আসা বন্ধ হয়ে যায়, ঐ দিন থেকে মানুষ কুতুবউদ্দিকে কাকী নামে সম্বোধিত করতে থাকে।
📍মতাদর্শ:
চিশতিয়া তরিকার অন্যান্য সাধকদের মত খাজা বখতেয়ার কাকী কোন আনুষ্ঠানিক মতবাদ প্রণয়ন করেননি। তিনি সবসময় মজলিসের আয়োজন করতেন যেখানে তিনি তরিকতের গোপন রহস্যতত্ত্ব নিজ শিষ্যদের কাছে উন্মোচিত করতেন। জনসাধারণের মধ্যে পরিচালিত এই মজলিসে যেসব বিষয়ের উপর জোর দেয়া হতে সেগুলো হল- আত্ম-ত্যাগ ও বাসনাশূন্য প্রেম, আল্লাহর উপর সম্পূর্ণ বিশ্বাস, সকল মানুষকে একইরূপ আচরণ করা এবং যথাসাধ্য তাদের সাহায্য করাসহ ইত্যাদি। তাকে যেসব অর্থ দান করা হত, তিনি সে দিনই ঐ অর্থ দান করে দিতেন। ফলাফলের বা প্রতিদানের আশা না করে অভাবগ্রস্তদের সাহায্য করার মতাদর্শের বিশ্বাসী ছিলেন তিনি।
প্রভাব:
সূফি সাধক হিসেবে খাজা বখতেয়ার কাকী মানুষের উপর প্রচন্ডভাবে প্রভাব বিস্তার করতে থাকেন। তিনি তখনকার সরকারের সাথে জড়িত না থাকার নীতি অব্যাহত রাখেন। এটি দক্ষিণ এশিয়ার চিশতিয়া তরিকার সাধকদের পরম্পরা যে, তারা মনে করেন শাসকগোষ্ঠী এবং সরকারের সাথে সম্পর্ক তাদেরকে দুনিয়াবি চিন্তা ভাবনার মধ্যে ডুবিয়ে রাখতে পারে।
🎓 উপাধি:
• কুতুব-উল-আকতাব
• মালিক-উল-মাশায়খ
• রাইস-উস-সালেকীন
• সিরাজ-উল-আউলিয়া
গবেষণা:
• দিওয়ান-এ-বখতেয়ার উদ্দিন কাকী (উর্দু ভাষায়)। কানপুর মুন্সি নাভাল কিসুর। ১৮৭৯।
🟢 আদর্শ:
ভারতের দিল্লিতে যার নামে ‘কুতুব মিনার’ দাঁড়িয়ে আছে তিনি হলেন খাজা কুতুবউদ্দীন বখতিয়ার কাকী। গোনাহমুক্ত জীবনের একটি নমুনা ফুটে ওঠেছে তার জীবনীতে। ‘ওলামায়ে হিন্দকা শানদার মাজি’ কিতাবে একটি ওয়াকেয়া লিখিত হয়েছে। ওয়াকেয়াটি হলো- আল্লামা কুতুবউদ্দীন বখতিয়ার কাকী ইন্তিকালের আগে তার সন্তান ও খলিফাদের ওসিয়ত করলেন যে, আমার ইন্তিকালের পর যাকে-তাকে দিয়ে আমার জানাযা পড়াবে না। আমার জানাযা যে ব্যক্তি পড়াবে; তার মধ্যে ৪টি গুণ থাকতে হবে। যদি এ ৪টি গুণ কোনো ব্যক্তির জীবনে পাওয়া না যায়; তবে বিনা জানাযায় আমার লাশ দাফন করবে। খাজা কুতুবউদ্দীন বখতিয়ার কাকী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির শর্তগুলো হলো:
(১) যে ব্যক্তি জীবনে কোনো দিন তাকবিরে উলা ব্যতিত নামায পড়েনি; এমন ব্যক্তি।
(২) যার জীবনে একদিনও তাহাজ্জুদ কাযা হয়নি; এমন ব্যক্তি।
(৩) যে ব্যক্তি তার চোখের দ্বারা পরনারী দেখে কখনো গোনাহের কল্পনা করেনি;
(৪) যে ব্যক্তি জীবনে কোনো দিন আসরের সুন্নাতও কাযা করেনি।
খাজা কুতুব উদ্দীন বখতিয়ার কাকী ইন্তিকাল করলেন। ইন্তিকালের পর তাকে জানাযার জন্য প্রস্তুত করে মাঠে নেয়া হলো। সেখানে উল্লেখিত ৪টি শর্ত উল্লেখ করে ঘোষণা করা হলো- যিনি বা যারা এ গুণগুলোর অধিকারী; তিনি খাজা কুতুবউদ্দীন বখতিয়ার কাকীর জানাযা পড়ানোর জন্য সামনে আসুন। মাঠ ভর্তি মানুষ। কোনো সাড়া শব্দ নেই। এতো অনেক বড় গুণের কথা। এ গুণ অর্জন করা সহজ ব্যাপার নয়। সারা মাঠের লোকগুলো মাথা নিচু করে অশ্রু বিসর্জন দিতে লাগলো। নিজেদেরকে অপরাধী মনে করে নিরবে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকল। মাঠ থেকে কোনো প্রতি উত্তর না আসায় খাজা কুতুবউদ্দীন বখতিয়ার কাকী’র ছেলে, খলিফা, ছাত্রসহ শুভাকাঙ্ক্ষীরা বিনা জানাযায় তাঁকে দাফনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। সন্তান ও খলিফারা লাশের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁকে বিনা জানাযায় দাফন করার জন্য রওয়ানা হবেন। এমন সময়- সামনের কাতার থেকে একজন লোক কদম বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘থামো!’ কফিনে হাত লাগিয়ে বললেন, ‘আমি জানাযা পড়াব। এ ব্যক্তি আলেম নয়, তবে সাধারণ মানুষও নয়; তিনি হলেন দিল্লির সুলতান শামসুদ্দিন আল-তামাশ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি। দিল্লির সুলতান শামসুদ্দিন আল-তামাশ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি, কফিনের সামনে গিয়ে কাফন সরিয়ে খাজা কুতুব উদ্দিন বখতিয়ার কাকীর কপালে চুমু খেয়ে বললেন, ‘ওগো আল্লাহর ওলি! সারা জীবন নিজে আমল করে করে; তোমার আমল গোপন করে তুমি চলে গেলে; আর আজকের এ ময়দানে আমার আমলগুলোকে প্রকাশ করে দিলে।’ আমি ভয় করি; আমার আমলগুলো প্রকাশ হয়ে যাওয়ায় না জানি আমি ধ্বংস হয়ে যাই।
📓 তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া।