13/05/2026
মহাভারতের এক না শোনা সত্য আমি,
শুনতে কি তোমরা প্রস্তুত?
শোনাচ্ছি এক না বলা কাহিনী,
যা তোমাদের কাছে অজানা।
মহাভারতের সেই রণক্ষেত্রে প্রতিটি বীর যোদ্ধা
ছিলেন কোনো না কোনো দেবতার অংশ,
আমি ছিলাম সেই সাধারণ মানুষ
যাকে নিয়ে গর্বিত ছিলো পুরো যদু বংশ।
বৃষ্ণি বংশের আদরের সন্তান ছিলাম আমি,
নামে পরিচিত ছিলাম সাত্যকি,
রণক্ষেত্রে বড় বড় বীর যোদ্ধাদেরও
তুচ্ছ প্রমাণ করেছিলাম আমি।
শ্রীকৃষ্ণের সারথি দারুকের ভাই আমি,
নারায়ণী সেনার প্রধান সেনাপতি,
তবুও অধর্মের পক্ষে না দাঁড়িয়ে আমি
বেছে নিয়েছিলাম ন্যায়ের সারথি।
বিদ্যার অন্বেষণে যখন ব্যাকুল ছিলো মোর মন,
খুঁজছিলাম এক আদর্শ, এক দিব্য আলোড়ন।
যদিও যদুবংশে জন্ম মোর, বীরত্বের অভাব নেই তিল,
তবু গাণ্ডীবধারীর গাণ্ডীবের ছিলায় খুঁজে পেলাম নিখুঁত মিল।
জিষ্ণু (অর্জুন) শুধু সখা নন, হলেন মোর প্রাণের গুরু,
তাঁর পদতলে বসে মোর নব জীবনের হলো শুরু।
মোর একাগ্রতা দেখে গুরু অর্জুন হলেন প্রসন্ন,
শিষ্য হিসেবে আমায় করলেন তিনি ধন্য।
নিজের তূণীর হতে একে একে দিলেন আমায় দিব্য বাণ,
যে অস্ত্রের তেজে থরথর করে কাঁপে সৃষ্টি ও আকাশ।
ঐন্দ্র, আগ্নেয়, আর বরুণ অস্ত্রের সেই গূঢ় রহস্য,
সযত্নে সঁপে দিলেন আমায়, যেন আমি তাঁর ইষ্ট শিষ্য।
শুনিয়েছিলেন সেই ধ্বনি যা কেবল গাণ্ডীব থেকে ছোটে,
শিখিয়েছিলেন লক্ষ্যভেদ যা বজ্র হয়ে শত্রুর বুকে ফুটে।
বললেন তিনি - "সাত্যকি রে, তুই মোর দ্বিতীয় রূপ,
তোর ধনুকের টঙ্কারে যেনো ভাঙে অন্যায়ের বিজন স্তূপ।"
গুরুর সেই আশিস সাথে নিয়ে যখন রণক্ষেত্রে নামি,
গুরু অর্জুনের ছায়া হয়েই তো কৌরবদের যমদূত হলাম আমি।
বাণের প্রচণ্ড গতি ছিলো এমন,
যেনো আকাশ ছিদ্র হয়ে যেতো,
ধনুকের সামান্য টঙ্কার শুনেই
শত্রু মূর্ছিত হয়ে পড়তো।
মিত্র ধর্ম আসলে কী....
তা আমিই তো শিখিয়েছিলাম,
শান্তি সভায় আমিই তো দুর্যোধনকে
ধর্মের পথ দেখিয়েছিলাম।
আমার রণকৌশল দেখে দেখে
সমগ্র কৌরব দল থরথর করে কাঁপতো,
তোমরা কি তাকে ভুলে গিয়েছ, যে রণভূমিতে সবার আগে অক্ষৌহিণী সৈন্য নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলো?
ভীষ্মের সঙ্গে যখন যুদ্ধ হলো,
তাকে পিছিয়ে যেতে হয়েছিলো,
আর দ্বিতীয়বারও তাকে রক্ষা করতে
আলম্বুষকে এগিয়ে আসতে হয়েছিলো।
তারপর আলম্বুষের মায়াকেও
ইন্দ্রাস্ত্র দিয়ে আমি সরিয়ে দিয়েছিলাম,
কৌরব পক্ষের প্রায় প্রতিটি যোদ্ধাকেই আমি
সমরাঙ্গনে পরাজিত করেছিলাম।
অশ্বত্থামা যখন সমরাঙ্গনে
আমার দিকে পা বাড়িয়েছিলেন,
আমার বাণের স্বাদ গ্রহণ করে তাঁর
হুঁশ-ঠিকানা হারিয়েছিলো।
সুদবুদ হারিয়েছিলেন অশ্বত্থামা,
মৌন হয়ে গিয়েছিলো তাঁর অস্ত্রও,
তারপর পুত্রের রক্ষার্থে রণভূমিতে
আমার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন গুরু দ্রোণ।
আমার মহান গুরুর গুরু দ্রোণও সেদিন
আমার ধনুর্বিদ্যার গুণমুগ্ধ হয়েছিলেন,
সেগুলো ক্ষত ছিলো না বরং অলঙ্কার ছিলো -
যখন গুরু নিজের শিষ্যত্বের হাতে আহত হয়েছিলেন।
অঙ্গরাজ কর্ণ ছাড়া আর কোনো কুরু যোদ্ধা
আমাকে জয় করতে পারেনি,
কিন্তু সেই অঙ্গরাজকেও আমি রণভূমিতে
কতোবার যে হারিয়েছি!
ভুলে যেও না, চতুর্দশ দিনে যখন অর্জুন ছিলেন দূরে,
একা আমিই দ্রোণের ব্যূহ ছিন্নভিন্ন করেছিলাম,
এক দিনে কৌরবদের বহু অক্ষৌহিণী সেনাকে
আমি একাই যমালয়ে পাঠিয়েছিলাম।
যখন জয়দ্রথ বধ করার জন্য
অর্জুনকে আগে এগিয়ে যেতে হয়েছিলো,
তখন সম্রাট যুধিষ্ঠিরের রক্ষার্থে গাণ্ডীবধারী
আমাকে নিজের সমান যোগ্য মনে করেছিলেন।
প্রচণ্ড রূপে গুরু দ্রোণ যখন
উত্তম প্রতিদ্বন্দ্বীর অভাবে ছিলেন,
আমার বাণের স্বাদ পেয়েছিলেন
এবং রক্তরঞ্জিত হয়েছিলেন।
একাকী যখন ক্লান্ত আমি, কৌরব ব্যূহ মাঝে,
শ্রান্ত দেহ, শূন্য তূণীর, নিশি নামল সাঁঝে।
ভুরিশ্রবা এলো কাল হয়ে, মহাদেবের বরে বলীয়ান,
আমার পরাজয় ললাটে লেখা, ক্ষুণ্ণ হলো সম্মান।
নিঃশস্ত্র আমায় কেশে ধরি যখন মৃত্যু দিতে চাইলো,
এই অধর্মী সমাজের কারণেই
গুড়াকেশ নিজের পুত্রকে হারিয়েছিলেন,
এবং আবারও সেই অধর্ম দেখে গুরু আমার
আকাশ বিদীর্ণ কারি গাণ্ডীবের হুঙ্কার দিলেন!
দূরে থেকেও গুরুর চোখ ছিলো শিষ্যেরই ওপর,
অর্জুনের বাণ কাটলো সেই হাত, যা ছিলো খড়গ কঠোর।
"সাত্যকি মোর প্রাণসম" - গর্জে উঠলেন পার্থ বীর,
গুরুর কৃপায় জীবন ফিরে পেলাম, চোখে মোর এলো জল।
লোকে বলে অধর্ম সেথা, বলে অর্জুন বীর নন,
কিন্তু গুরু কি সইতে পারেন প্রিয় শিষ্যের বিসর্জন?
জীবনে বিদ্যার গুরুত্ব কতখানি...
তা সাত্যকি তোমাদের শেখায়,
যখন গুরুকুলের বাল্যবন্ধু জিষ্ণুকে
সে নিজের গুরু হিসেবে মেনে নেয়।
প্রতিটি যোদ্ধা হেরেছিলো আমার কাছে,
এমনই ছিলো সেই ভয়ঙ্কর যুদ্ধ,
ভীম ও অর্জুনের প্রতিজ্ঞার মান রাখতে আমি
সবাইকে প্রাণদান দিয়েছিলাম।
সবাই বারণ করা সত্ত্বেও আমি
ভুরিশ্রবার মস্তক ভূমিতে ফেলে দিয়েছিলাম,
অনর্থ ঘটেছিল আমার হাতেও...
আমি আমার বিবেক হারিয়েছিলাম।
লোকে বলে আমি ক্রোধী, আমি অধর্মী,
কিন্তু কেউ কি বুঝেছিলো আমার সেই হাহাকার?
ভুরিশ্রবা যখন আমার চুল ধরে অপমান করছিলো,
কোথায় ছিলো তখন ধর্মের বিচার?
মহাভারতের শেষেও আমি বেঁচে ছিলাম,
যদুবংশের ধ্বংস দেখেছি নিজ নয়নে,
প্রভাস তীর্থে যখন সবাই মত্ত কলহে,
আমিই প্রথম অস্ত্র তুলেছিলাম ন্যায়ের কারণে।
দুর্যোধনও তো আমার মিত্র ছিলো,
কিন্তু আমি ছিলাম গাণ্ডীবধারীর সাথে,
হে বন্ধু, প্রতিটি পাণ্ডবই ছিলেন শ্রেষ্ঠ
তাই তো কৃষ্ণ মুরারি ছিলেন তাঁদের সাথে।
এখন ধর্ম ও কর্মই যদি শ্রেষ্ঠ হয় তবে
কেনো অধর্মের কুৎসিত জাল বুনবো?
দুর্যোধন ও কর্ণকে ত্যাগ করে আমি কেনো না
গাণ্ডীবধারীর সাথে সেই গোপালকেই বাছবো?
আজকের এই কলিযুগে দাঁড়িয়ে যখন শুনি অর্বাচীনের আস্ফালন....
বিদীর্ণ হয় মোর হিয়া, জাগে এক তীব্র দহন।
যাঁকে নিয়ে তোমরা আজ মাতামাতি করো, সেই কর্ণের বীরত্ব.... আমার গাণ্ডীবধারীর সামনে ছিলো তাসের ঘরের মতো নশ্বরত্ব।
লোকে বলে কর্ণ দানবীর, বলে সে-ই শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর,
কিন্তু তারা কি দেখেছে আমার গুরুর সেই দিব্য তেজের থরথর?
যাঁকে তোমরা 'ছলনা' বলো, তা ছিলো ধর্মেরই বিধান,
মোর গুরু অর্জুনের পায়ে লুটাতো সহস্র কর্ণের মান।
ধিক্ সেই আধুনিক তর্কাচারীদের, যারা গুরুকে করে ঘৃণা,
অর্জুন না থাকলে কি বাজতো আজ ধর্মের এই জয়বীণা?
আজকালকার বাজারে দেখি গুরুর চেয়ে শিষ্যের বড়াই বেশি,....
সাত্যকি কি তবে ভুলে যাবে সেই দিব্য বাণের হাসি?
লোকে বলে অর্জুন নাকি অর্ধাঙ্গ ছেদ করেছিলেন ভুরিশ্রবার...
কিন্তু কেউ কি দেখেছে সাত্যকির রক্তে ভেজা সেই হাহাকার?
মোর গুরুর অপমান সইবো না আমি, থাকবো হয়ে তাঁর ছায়া,....
অর্জুন মানেই সত্যের জ্যোতি, বাকি সবটাই কর্ণের মায়া।
তাই শোনো হে মর্ত্যের জীব, সত্যকে করো হৃদয়ঙ্গম,
ধর্মের পথে কৃষ্ণ যেখানে, বিজয় সেখানে মনোরম।
আমি সাত্যকি, গুরুর চরণে সঁপেছি মোর পরিচয়,
যুগে যুগে অর্জুন আর কৃষ্ণেরই হবে শেষ জয়।
কর্ণের কবচ নয়, অর্জুনের লক্ষ্যভেদই হোক তোমার আদর্শ,
তবেই পাবে জীবনে তুমি সেই দিব্য আলোর স্পর্শ।
আজকের লেখা একটু নতুন ধরণের কবিতার মাধ্যমে সাত্যকির সম্পূর্ন জীবন তুলে ধরেছি.... আশা করি আপনাদের ভালো লাগবে।
পরিবর্তী কবিতা মহাভারতের কোন চরিত্রের ওপরে চান সেটা কমেন্ট করে বলুন।
Writer - SB Bubai (Sangram)
নিচে Note আর Warning দেবার পরেও যারা লেখা কপি করে নিজেদের Profile বা Page এ পোস্ট করছেন কোনো রকম অনুমতি না নিয়ে.... এমনকি Credit পর্যন্ত দিচ্ছেন না তারা সাবধান হয়ে যান কারণ আমার কাছে নোটিফিকেশন আসছে আমি কিন্তু Copy Right মেরে দেবো। তখন কিন্তু Facebook আপনাদের পেইজ বা প্রোফাইল Down করে দিলে কিছু আর করার থাকবে না।
আপনারা Direct শেয়ার অপশন থেকে শেয়ার করুন এতে কোনো সমস্যা নেই।
(End)
Noted: This Text is protected under copyright law and copyrighted by Puran Kotha Samgra . Unauthorized copying, posting, may result in DMCA takedown, legal action, and Facebook account penalties. Content is tracked digitally—violators will be reported and penalized.