07/03/2025
পির হওয়ার শর্ত
মো.আশরাফুল আজিজ
প্রভাষক ফিরোজ মিয়া সরকারি কলেজ
(পর্ব ৪)
এদেশের মানুষ সাধারণত ধর্মপরায়ণ । তাদের ধর্ম পরায়ণতার সুযোগ নিয়ে সমাজে বেশ কিছু ব্যবসায়ী পিরের আবির্ভাব ঘটেছে।যাদের উদ্দেশ্য হলো দুনিয়া।তাদের না আছে ইলম না আছে আমল।এসব ভন্ডপিরদের জন্য আজ কামেল পিরদের লজ্জায় পড়তে হচ্ছে। আমাদের সমাজে কিছু অসাধু ভন্ড পির আছে যাদের কাছে শরিয়তের কোনো ইলম নাই।ওরশের নামে গান বাজনা নাচা নাচি গাজা ইত্যাদি চলছে। মহিলাদের সাথে অবাদ মেলা-মেশা, মহিলাদের নিজের মেয়ে বলে জড়িয়ে ধরা এসব ভন্ডদের কাজ।পর্দার বিষয়ে কিছু বললে তারা বলে মনের পর্দা বড় পর্দা।পিরের পায়ে ধরে সালাম করা।তাদের ভাষ্য মতে এটা আশেক মাশুকের খেলা তা সাধারণ মানুষের বুঝে আসবেনা।বিশেষ করে অনেক মাজারকে কেন্দ্র করে যত সব বিদায়াত ও কবিরা গুনাহর কাজ হচ্ছে।মাজারে পাঞ্জাতনের মোমবাতি জালানো,মাজারে সেজদা করা মাজার ধৌত করে পানি খাওয়া ইত্যাদি।আজ তাদের এ কার্যকলাপ দেখে সত্যিকারের পিরেরা লজ্জিত। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত তাদেরকে ভন্ড হিসেবেই জানে।আমরা মাজার জিয়ার করা সুন্নাত মনে করি কিন্তু মাজারের নামে বাড়া বাড়ি পছন্দ করিনা। আমাদের সমাজ মনে করে যার মুরিদ বেশি তিনি বোধহয় বড়পির। আসলে বেশি মুরিদ হলেই যে তিনি কামেল এমনটা নয়।পির আর অলির মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে।যে কোন সাধারণ মানুষ-ই ওলি হতে পারেন তার জন্য তাকে শরিয়তের বড় আলেম হতে হয় না।কিন্তু পির হতে হলে অবশ্যই তাকে আলেম হতে হবে।সব পিরই ওলি হয় কিন্তু সব ওলি পির হয় না। কামেল পিরদের নাম ভাঙ্গিয়ে সমাজে অনেক আগাছা পির জন্মেছে তাদের জন্য আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতকে লজ্জায় পড়তে হচ্ছে। অনেক পির আছেন দাড়ি নাই টুপি নাই ফরজ সুন্নাত কিছুই নাই তিনিও উত্তরাধিকার সুত্রে পির।হায়রে অবুঝ মুসলমান!
বড় পির আব্দুল কাদের জিলানি (রঃ) বলেন কোনো মানুষ যদি আকাশেও উড়ে আর তার কাছে শরিয়ত না থাকে বুঝতে হবে সে শয়তান।আল্লাহ পাক এসব ভন্ডদের হাত থেকে জাতিকে রক্ষা করুক। ইসলামি শরিয়ত পির হওয়ার জন্য কিছু যোগ্যতা ও শর্তারোপ করেছেন।
ইমাম গা্জ্জালি রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন
১, একজন কামেল পিরের বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে প্রথমটি হলো তাঁকে আল্লাহ্ তা’লার নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দা (কুরবত) ও রাসুলুল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর নায়েব (প্রতিনিধি) হিসেবে দ্বীনের (ধর্মের) যাহেরি (প্রকাশ্য) এবং বাতেনি (আধ্যাত্মিক) জ্ঞানে একজন আলেম বা জ্ঞান বিশারদ হতে হবে। মোট কথা, ইসলামী জ্ঞানের সকল শাখায় তাঁর অগাধ জ্ঞান থাকতে হবে। তাঁকে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা-বিশ্বাস সম্পর্কেও জানতে হবে।
২, দ্বিতীয়তঃ তাঁকে আরেফ বা ভেদের রহস্য সম্পর্কে জ্ঞানী হতে হবে। তাঁর ইহ্সান অবস্থা সম্পর্কে জ্ঞান থাকতে হবে, যেমন হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহর এবাদত এমনভাবে করো যেন তুমি তাঁকে দেখতে পাচ্ছো, আর যদি না দেখতে পাও তবে এটি জানো যে তিনি তোমাকে দেখছেন” (আল হাদিস)। একজন আরেফ তাঁর অন্তরে সাক্ষ্য দেবেন যে আল্লাহ্ তা’লা তাঁর যাত মোবারক, গুণাবলী ও কর্মে এক ও অনন্য।
৩, তৃতীয়তঃ কামেল পির তাঁর পিরের তত্ত্বাবধানে ইতোমধ্যেই পরিশুদ্ধ। তাঁকে নফস তথা একগুঁয়ে সত্তার বিভিন্ন স্তর বা পর্যায়, রোগ ও ত্রুটি- বিচ্যুতি সম্পর্কে ওয়াকেফহাল হতে হবে। শয়তান কোন কোন পদ্ধতিতে কলব্ বা অন্তরে প্রবেশ করতে পারে তাও তাঁকে জানতে হবে। তাঁর মুরিদদের পরিশুদ্ধ করা এবং কামেলিয়াত বা পূর্ণতার পর্যায়ে উন্নিত করার সকল পদ্ধতিও তাঁর জানা থাকা প্রয়োজন।
৪, চতুর্থতঃ তরিকতের পথে অনুসারিদের পথ দেখানোর ক্ষেত্রে একজন কামেল পিরের প্রয়োজন তাঁর পির কেবলার এজাযত বা অনুমতি।
৫, বস্তুতঃ একজন কামেল পিরের বৈশিষ্ট্য ও গুণ হলো তাঁকে দেখলেই আল্লাহর কথা স্মরণ হবে, তাঁর কথাবার্তা শুনলে ঈমান সজীব ও চাঙ্গা হয়ে উঠবে।
হযরত বড়পীর শায়খ আব্দুল কাদির জিলানি (রঃ) পির বা মুর্শিদের জন্য নিম্নোক্ত পাঁচটি গুণ থাকা অবশ্যই কর্তব্য বলে বর্ণনা করেছেন।———
(১) শরিয়তে পরিপূর্ণ জ্ঞানসম্পন্ন আলেম হওয়া।
(২) ই’লমে হাকিকত সম্পর্কে পূর্ণজ্ঞান থাকা।
(৩) সাক্ষাৎ প্রার্থীর সাথে স্নিগ্ধ ও মার্জিত ব্যবহার এবং প্রফুল্ল বদন ও সন্তুষ্টচিত্তে দর্শন দান করা।
(৪) দীন-হীনদের সাথে কথায় ও কাজে নম্রতাপূর্ণ ব্যবহার করা।
(৫) ভক্তবৃন্দের অন্তরের ব্যাধিসমূহ নির্ধারণপূর্বক তা দূরীকরণের উপায় সম্বন্ধে অভিজ্ঞ হওয়া। নিজেকে রিয়া, হিংসা-বিদ্বেষ, লোভ-লালসা, গর্ব-অহমিকা ইত্যাদি থেকে মুক্ত রাখা, কর্তব্যকর্মে শৈথিল্য এবং আরামপ্রিয়তা দূরীভূত করা।
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন।
اتَّبِعُوْا مَنْ لَّا يَسْـــَٔلُكُمْ اَجْرًا وَّهُمْ مُّهْتَدُوْنَ
অনুসরণ কর তাদের, যারা তোমাদের কাছে কোন বিনিময় কামনা করে না, অথচ তারা সুপথ প্রাপ্ত। (সুরা ৩৬ ইয়া- সিন: ২১)।
পিরের দুনিয়ার প্রতি লোভ থাকবেই না। মুরিদকে দুনিয়া উপার্জনের মাধ্যম বানাবে না। একমাত্র আল্লাহ হবে তার সাহায্যকারি।
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন।
اياك نعبد واياك نستعين
শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবি (রহ:) বলেন শায়েখ ও পির হওয়ার জন্য ৫টি শর্ত জরুরী:
*১. পির হওয়ার জন্য প্রথম শর্ত হল,কোরআন- হাদিসের আলেম হওয়া।
[আল কওলুল জামিল: ২০ পৃষ্টা]
*২. পির হওয়ার জন্য দ্বিতীয় শর্ত হল,ন্যায়নীতিবান ও খোদাভীরু হওয়া।কবিরা গোনাহ থেকে বেঁচে থাকবে এবং ছগিরা গোনাহও বার-বার করবে না।
[আল কওলুল জামিল ২৪ পৃ.]
*৩. পির হওয়ার জন্য তৃতীয় শর্ত হল, দুনিয়াত্যাগী ও আখেরাতমুখী হওয়া। যিকির ও মামুলাত নিয়মিত পালন করা এবং সঠিক হাদিস দ্বারা প্রমাণিত সুন্নতে মুয়াক্কাদা ও নফল ইবাদত সময়মত আদায় করা।অন্তরে সর্বদা আল্লাহ পাকের স্বরণ রাখা।যাকে ‘ইয়াদ-দাশত’ বলা হয়, তা যেন অন্তরের স্থায়ী গুণে পরিণত হয়ে যায়।[আল কওলুল জামিল ২৫ পৃ.]
*৪. পির হওয়ার জন্য চতুর্থ শর্ত হল,সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করা।সঠিক জ্ঞানের অধিকারী হওয়া, কথা ও কাজে বিশ্বস্ত থাকা।যেন তার আদেশ-নিষেধের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা যায়।যেমন আল্লাহ পাক বলেন,
ﻣِﻤَّﻦْ ﺗَﺮْﺿَﻮْﻥَ ﻣِﻦَ
ﺍﻟﺸُّﻬَﺪَﺍﺀ “
যে সব সাক্ষীগণের সাক্ষী দেওয়ার প্রতি তোমরা সন্তুষ্ট থাকো,তাদের সাক্ষী গ্রহণ করো”।তাহলে পিরের প্রতি কেমন ধরনের সুধারণা হওয়া উচিত? কারণ সাক্ষী গ্রহণ করার ক্ষেত্রে যদি সাক্ষীগণের বিশ্বস্ত হওয়ার প্রয়োজন হয়,তাহলে পির হওয়ার জন্য বিশ্বস্ত হওয়া কত বেশি প্রয়োজন
হওয়া উচিত।
[আল কওলুল জামিল ২৫ পৃ.]
বর্তমানে মূর্খ পির-ফকির নামধারীরা এমন ধারণা নিয়ে বসে আছেন যে, পির- হওয়ার জন্য শরিয়তের ইলম থাকার দরকার নেই, বরং ইলম থাকা দরবেশদের পক্ষে ক্ষতিকারক। কারণ তাদের ভাষায় শরিয়ত এক জিনিস এবং তরিকত-তাসাউফ অন্য জিনিস! প্রথম যুগের সুফি-সাধকদের কিতাব, তাদের বাণী, যেমন ‘কুতুল-কুলুব’, ‘আওয়ারিফুল মাআরিফ’, ‘এইহয়াউল-উলুমিদ্দিন’, ‘কিমিয়ায়ে সা’আদাত’, ‘ফুতুহুল-গায়ব’, ‘গুনিয়াতুত-তালেবিন’ গ্রন্থগুলোতে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, তরিকত ও তাসাউফের পথ-পরিক্রমার জন্য শরিয়তের জ্ঞান থাকা শর্ত।
হজরত জুনাইদ বাগদাদি (রহ.) বলেন,
যে ব্যক্তি পবিত্র কোরআন মুখস্থ করেনি, হাদিসের জ্ঞান অর্জন করেনি, তাসাউফের ক্ষেত্রে তাকে অনুসরণ করা যাবে না। কেননা আমাদের তাসাউফ ও মাজহাববিষয়ক সব ধরনের ইলমই কোরআন-সুন্নাহর জ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। তার আরেকটি উক্তি হচ্ছে, ‘যে তরিকত-তাসাউফ শরিয়ত-পরিপন্থি, তা ধর্ম-দ্রোহিতার শামিল।’
হজরত সিররি সিকত্বি (রহ.) বলেন,
তিনটি বিষয়ের সমন্বিত রূপের নাম হচ্ছে তাসাউফ,
১. মারেফতের নুর বা জ্যোতি যেন তাকওয়া-পরহেজগারির জ্যোতিকে আহত না করে।
২. আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধি বা ইলমে বাতিন বিষয়ে এমন কোনো উক্তি করবে না, যা বাহ্যিকভাবে পবিত্র কোরআন বিরোধী হয়ে যায়।
৩. মহান আল্লাহ কর্তৃক নির্দেশিত সীমারেখা লঙ্ঘিত হয়, এমন কোনো কেরামত বর্ণনা বা প্রকাশ করতে যাবে না।
পূর্ববর্তী ওলি-দরবেশদের পক্ষ থেকে এ ধরনের আরও বক্তব্য বর্ণিত হয়েছে।
প্রথম শর্ত : পির-মাশায়েখদের সর্বসম্মত অভিমত হচ্ছে, ‘যিনি কোরআন পড়েননি এবং হাদিসের জ্ঞান অর্জন করেননি, তিনি ওয়াজ-নসিহত করতে যাবেন না।’ তবে হ্যাঁ, মহান আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহে কোনো ব্যক্তি যদি পরহেজগার আলেমদের সাহচর্যে দীর্ঘ জীবন অতিবাহিত করেন এবং বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ পরিশুদ্ধি অর্জন করে থাকেন এবং হালাল-হারামবিষয়ক বিধিবিধান পরিপক্বরূপে অবহিত হন এবং পবিত্র কোরআন ও রাসুলের সুন্নাহ বিষয়ে ভালো জ্ঞান রাখেন, তাহলে তেমন কোনো ব্যক্তি ব্যতিক্রম হিসেবে আশা করা যায় ওই দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।
দ্বিতীয় শর্ত : কামিল পিরের ক্ষেত্রে বায়াত নেওয়ার জন্য দ্বিতীয় শর্ত হচ্ছে, তার সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও তাকওয়া-পরহেজগারি থাকতে হবে। সুতরাং মুর্শিদকে অবশ্যই কবিরা গোনাহ থেকে বেঁচে থাকতে হবে এবং সগিরা গোনাহেও বারবার জড়িয়ে পড়বেন না।
মাওলানা শাহ আবদুল আজিজ দেহলভি (রঃ)বলেন, পিরের জন্য তাকওয়ার শর্তের কারণ হচ্ছে, শরিয়তে বায়াত বিষয়টি বিধিবদ্ধ হয়েছে অভ্যন্তরীণ পরিশুদ্ধির লক্ষ্যে। মানবতার এ আত্মিক পরিশুদ্ধি তাদের সমশ্রেণির সবার দ্বারা হয়ে ওঠে না। কারণ বাস্তবতা হচ্ছে যাদের আমল নেই, তাদের কথায় পরিশুদ্ধি আসে না।
যিনি মুর্শিদ হবেন, তিনি যদি অভ্যন্তরীণ আমল-তাকওয়া, তাজকিয়া সম্পন্ন না হন, তাহলে তার দ্বারা বায়াতের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে অনিবার্যভাবেই।
তৃতীয় শর্ত : বায়াত গ্রহণকারীর ক্ষেত্রে তৃতীয় শর্ত হচ্ছে, তাকে মনের দিক থেকে দুনিয়াত্যাগী হতে হবে, পরকালমুখী হতে হবে, তাকিদপূর্ণ ইবাদত-আনুগত্যে এবং সহিহ হাদিসগুলোতে বর্ণিত জিকির-দোয়া নিয়মিত পালন করতে হবে এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার সঙ্গে তার কলবের সম্পর্ক সার্বক্ষণিক থাকতে হবে, আর এটি তার স্বাভাবিক যোগ্যতা ও স্থায়ী অভ্যাসে পরিণত হতে হবে।
চতুর্থ শর্ত : বায়াত গ্রহণকারী পিরের ক্ষেত্রে চতুর্থ শর্ত হচ্ছে, তাকে কল্যাণ কাজে আদেশ প্রদান এবং অকল্যাণ কাজে নিষেধের দায়িত্ব নিজের বুদ্ধি-বিবেচনায় উত্তম পন্থায় পালন করে যেতে হবে, যেন তার আদেশ-নিষেধে আস্থা-বিশ্বস্ততা প্রমাণিত হয়। এমন যেন না হয় যে, তিনি একগুঁয়েমি করছেন, চাটুকারিতার বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছেন, যার কোনো স্বকীয়তা নেই, আত্মমর্যাদাবোধ নেই।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘সাক্ষীদের মধ্যে যাদের ক্ষেত্রে তোমরা সন্তুষ্ট।’ (সূরা বাকারা : ২৮২)। অর্থাৎ যারা আস্থাভাজন তাদের সাক্ষী হিসেবে গ্রহণ কর। সুতরাং বায়াত গ্রহণকারীরও তেমন আস্থাভাজন ব্যক্তিত্ব হতে হবে।
পিরের প্রতি ভক্তি, আস্থা পোষণ করার মতো তার তাকওয়া, যোগ্যতা, বাহ্যিক আচরণ থাকা চাই। তাহলে মুসলমানরা এগুলোকেই তার অভ্যন্তরীণ অদৃশ্য যোগ্যতার বাস্তব প্রমাণ মনে করে তার কাছে বায়াত হতে পারবে
পঞ্চম শর্ত : বায়াত গ্রহণকারী পিরের পঞ্চম শর্ত হচ্ছে, তাকে পির-মাশায়েখদের দীর্ঘ সাহচর্য গ্রহণকারী হতে হবে। ওস্তাদ-পিরের সুহবতে থেকে দীর্ঘকাল সাধনার মাধ্যমে নিজেকে আদব-আখলাকে নিজেকে তৈরি করে নিয়েছেন, এমন হতে হবে এবং আত্মিক সাধনার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ নুর, প্রশান্তি প্রাপ্ত হতে হবে। এটি জরুরি এজন্য যে, মহান আল্লাহর সৃষ্টিগত রীতি ও বাস্তবতা হচ্ছে, সফলতা লাভকারীদের দেখে দেখে অন্যরা সফলতাপ্রাপ্ত হয়ে থাকে। যেমন কোনো ব্যক্তি আলেমদের দীর্ঘ শিষ্যত্ব গ্রহণ না করে ইলম শিক্ষা করতে পারে না। একই নিয়মে অপরাপর জ্ঞান, বিজ্ঞান, কারিগরি ক্ষেত্রেও দীর্ঘ সময় ব্যয় না করে বাস্তব যোগ্যতা-অভিজ্ঞতা অর্জন সম্ভব হয় না।
পির-মুর্শিদের ক্ষেত্রে বায়াত নেওয়ার জন্য তার কেরামত প্রকাশ পাওয়া, অলৌকিক কিছু প্রদর্শনে সক্ষম হওয়া এবং তার হালাল রুজি উপার্জনের পেশা-চেষ্টা পরিত্যাগ করার শর্ত আরোপ করা যাবে না। কেননা কেরামত বিষয়টি একজন শায়খ বা পিরের কঠোর সাধনা-প্রচেষ্টার ফল হিসেবে মহান আল্লাহ কারও কারও জন্য প্রকাশ করে থাকেন। এটি সংশ্লিষ্ট পিরের যোগ্যতার মাপকাঠি নয় এবং তার নিজের ইচ্ছাধীনও নয়।
দ্বিতীয় বিষয়টি অর্থাৎ প্রয়োজনীয় হালাল আয়-উপার্জনের পেশা ও চেষ্টা পরিহার করা শরিয়ত-বিরুদ্ধ কাজ। সুতরাং মাজজুব-অসহায় লোকদের দেখে উপার্জন/সম্পদ বিষয়ে ধোঁকায় পড়া যাবে না। অবশ্য এক্ষেত্রে শরিয়তের নির্দেশ এটুকুই যে, অল্পে তুষ্ট থাকা এবং সন্দেহজনক আয় ও পেশা থেকে বেঁচে থাকা জরুরি।
শাহ সাহেব (রহ.) এখানে বলছেন, পির বা শায়খের ক্ষেত্রে এমনটিও শর্ত বলা হয়নি যে, তার চূড়ান্ত পর্যায়ের সন্ন্যাসব্রতী হতে হবে অর্থাৎ নিজেকে কঠিন ইবাদত, সাধনায় জড়িয়ে রাখতে হবে। যেমন একনাগাড়ে সারা বছর রোজা পালন, সারা রাত জেগে ইবাদত করা, স্ত্রী-সংসার পরিত্যাগ করা, সুস্বাদু খাবার পরিহার করা, পাহাড় বা জঙ্গলে চলে যাওয়া, যেমন আমাদের সময়কার সাধারণ জনগণ এসবকে কামালতি মনে করে থাকে। এগুলো ধর্ম বিষয়ে বাড়াবাড়ি এবং নিজ জীবনকে অত্যাচারে নিমজ্জিত করার নামান্তর।
প্রিয়নবী (সা.) এরশাদ করেছেন ‘নিজ জীবনকে কঠোরতায় জড়াতে যাবে না, নতুবা মহান আল্লাহও তোমাদের কঠোরতার মুখোমুখি করে দেবেন।’ প্রিয়নবী (সা.) আরও বলেছেন ‘ইসলাম ধর্মে বৈরাগ্যের স্থান নেই।’
সূত্র : আল কাউলুল জমীল
আর কাজি সানা উল্লাহ পানিপথি (রহঃ)’র এরশাদুত তালিবীন কিতাবের ২৬৩ নং পৃষ্ঠায় ৮টি শর্ত আরোপ করেছেন। মোটকথা: কামেল পির হওয়ার জন্য ১৩ টি শর্ত লাগবে।
*১. তাফসির,হাদিস,ফিকাহ,সম্পর্কে বিজ্ঞ হতে হবে,কমপক্ষে তাফসিরে জালালাইন অথবা তাফসিরে মাদারেক শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শরিয়াত সম্মত আলেমের নিকট ভালোভাবে পড়ে আয়ত্ব করতে হবে,হাদিস শাস্ত্রে কমপক্ষে মেশকাত অথবা তার সমপরিমাণ কোন হাদিসের কিতাবকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শরিয়াত সম্মত আলেমের নিকট ভালোভাবে বুঝে পড়ে আয়ত্ব করতে হবে,ফিক্বাহের ব্যাপারে
কমপক্ষে ইবাদাত ও মোয়ামেলাত এর মৌলিক ২০ প্রকার ইলম,যথা আকাইদ,ত্বহারাত,নামাজ, যাকাত,রোজা,হজ্ব,তেলাওয়াত কোরআন, জিকির ও দোয়া, তারতিবুল আওরাদ।
খানাপিনা,নিকাহ,রোজগার,হালাল-হারাম,নির্জন বাস, দুস্তি-ছোহবাত,সফর, পিতা-মাতা সন্তান গংয়ের হক্ব,আত্বীয় স্বজনের হক্ব যথা (ইয়াতীম,মিসকিন, প্রতিবেশি,পথিক,ধনী, দরিদ্র,রাজা,প্রজা,রাজনীতি,ও অনন্য যাবতীয় সৃষ্টির হক) পির ও মুরিদের হক) প্রকার মাসায়েল আবশ্যক পরিমান শিক্ষা করে আমলদার হতে হবে।
*২. পির সাহেবের মুত্তাকি-পরহেজগার এবং ন্যায় পরায়ন হতে হবে।
*৩. দুনিয়াদার হতে পারবে না,সর্বদা আখেরাতের ফিকেরকারি হতে হবে, জরুরী ইবাদাত জেকের আজকার ইত্যাদিতে মাশগুল হতে হবে।
*৪. সৎ কাজের আদেশ অসৎ কাজের নিষেধকারী উত্তম চরিত্রবান ও স্বাধীনচেতা হতে হবে।
*৫. দীর্ঘদিন পর্যন্ত কামেল পিরের সঙ্গ লাভ করতে হবে।
*৬. নাহু,সরফ,আদব,মানতেক,ইত্যাদি শাস্ত্রে পারদর্শী হতে হবে।
*৭. তাছাউফের কিতাব সমূহ ভালভাবে পড়তে হবে।
*৮. তাছাউফের ইলম শিক্ষা করার পর সৎ স্বভাব অর্জন এবং অসৎ স্বভাব বর্জন করতে সক্ষম হতে হবে।
*৯. কামালিয়্যাতের নুর এবং ফয়েজ পরিপূর্ণ অর্জন করতে হবে।
*১০. কামেল মুর্শিদের নিকট ইলমে তাছাওফ অধ্যয়ন করতে হবে।
*১১. শায়েখের অনুমতি প্রাপ্ত হতে হবে।
‘
আশরাফ আলি থানবির কসদুস সাবিল কিতাবের মধ্যে কামেল পিরের ১০ টি আলামত উল্লেখ করেন।
*১. তাফসির,হাদিস,ফিকহ শাস্ত্রে বিজ্ঞ হতে হবে।
*২. আকিদা,আমল,আখলাক শরিয়াত অনুযায়ী হতে হবে।
*৩. নাজায়েজ পন্থায় দুনিয়ার মহব্বত থাকতে পারবে না।
*৪. কামেল পিরের সঙ্গ লাভ করে আত্মশুদ্ধি করতে হবে।
*৫. সম সাময়িক সুন্নত তরিকার পির মাশায়েখরা তাকে ভালো জানবে।
*৬. দুনিয়াদার লোকদের তুলনায় দিনদার লোকেরা তাঁকে বেশি ভালো বাসবে।
*৭. অধিকাংশ মুরিদ দুনিয়াকে ভালোবাসবে না এবং সাধ্য অনুযায়ি শরিয়াতের পাবন্দি করবে।
*৮. তিঁনি গুরুত্বের সাথে মুরিদের তালিম, তালকিন দিবে এবং তাদের ভুল ত্রুটিগুলো সংশোধন করে দিবেন।
*৯. কিছু দিন এখলাসের সাথে তিনার সঙ্গ লাভ করলে দুনিয়ার মহব্বত কমে যাবে এবং আখেরাতের চিন্তা ও আল্লাহ- রাসুলের মহব্বত বেড়ে যাবে।
*১০. তিনি নিজেও জেকের আজকারে মাশগুল থাকবেন।
হাফেজ ইবনে কাইয়্যূম রহমতুল্লাহি আলাইহি “আল ওয়াবিলুস’সায়্যিব মিনাল কালিমিত তায়্যিব” নামক কিতাবের ৬৯ পৃষ্ঠায় তাছাউফ নিয়ে বিস্তর আলোচনা করেছেন। তাঁর এ কিতাব সম্পূর্ণভাবে পিরদের বিভিন্ন অবস্থা ও তাঁদের যিকির আযকার ও ওয়াজিফার বর্ণনা প্রসঙ্গে লেখা হয়েছে। এ কিতাবের মধ্যে তিনি পির ও শায়েখ হওয়ার জন্য এ শর্ত লিখেছেন যে, কেউ যদি কারো কাছে মুরিদ হতে চায় তাহলে সর্ব প্রথম তাকে লক্ষ করতে হবে, শায়েখ যেন
(১) যিকির কারি হন
(২) যিকির থেকে উদাসীন না হন
(৩) সুন্নতের অনুসারী হন
(৪) নফস পুজারী না হন
(৫) দ্বীন ও দুনিয়ার ব্যাপারে হুঁশিয়ার হন। এমন শায়েখ যদি তুমি পাও তাহলে তাঁর আচলকে মজবুতভাবে ধরো।
(হুজুরের আইডি থেকে কপি পোস্ট )