Name:Ven. Nyaññasri Mahāthera (Jnanasree)
Date of Birth: 18 November 1925
Ethnicity: Barua Bengali
Father’s Name: Prem Lal Barua
Mother’s Name: Menoka Bala Barua
Ordination Year of Novice:1944
Preceptor for Novice Ordination: Ven. Gunalangkar Mahāthera
Date and time for Novice Ordination: On Friday 7 July 1944,
Place of Ordination/Address: Jobra Sugata Buddha Vihara, Hathazari, Chittagong, Banglad
esh. Date and Time for Higher Ordination as a Monk: On Sunday 10 April 1949
Place of Higher Ordination/Address: Rajānagarā, Chakma Rajā Sakyamuni Buddha Vihara,
Rangunia, Chittagong, Bangladesh. Preceptor of Higher Ordination: Ven. Gunalankāra Mahāthera
Year of Monkhood (Vassa): 74
Nationality: Bangladeshi
Present and Permanent Address: Chittagong Buddhist Monastery,Nandan kanan,Chittagong,Bangladesh. North Guzra Parinirvan Vihar,North Guzra, Raozan,
Chittagong, Bangladesh. A Summary of most Ven. Nyaññasri Mahāthera (Jnanasree)
Sangha Rajā Ven. Nyannasri Mahāthera is one of the most prominent religious
Leaders and revivalists of Theravāda Buddhism in Bangladesh. He has served Buddhist
Communities for education, social welfare, and Dhamma throughout his entire life. In
addition, Ven was born in a remote village called "West Gujara Dhumkhali" in Raozan Upazila
in Chittagong, Bangladesh on Wednesday, November 18, 1925. His given name was Lokanath
Barua; his father’s name was Prem Lal Barua, and his mother's name was Menaka Barua. He
lost his beloved mother when he was very young, and he grew up with his father. However,
Ven. took ordination as a novice at West BinaJuri Shamshan Buddha Vihara in 1944 and
received the Pli name Ven. Saranananda Samanera. In addition, he finished high school and
PL literature when he was a young novice under the guidance of his preceptor, Sayadaw. And
then he took higher ordination as a monk in 1949. His holiness preceptor Sayadaw was most
Ven. Gunalankra Mahāthera, and the instructors were Sangha Rajā, and most Ven. Dhammananda Mahthera, and Rajguru Dhammaratana Mahthera.
2. Social Work and Dhamma Mission
Most notably, Sangha Rajā Ven. Nyaññasri Mahāthera became the abbot of a number of
Buddhist temples in the Chittagong Hill Tracts (CHT) and Chittagong Plan districts. He
traveled door to door to make sure backward communities and orphan children had access to
Basic education and to the light of Dhamma. When he was an abbot of Mirzapore Shantidham
Buddha Vihara (1949–54), he established JATAKA PARISHAD, a social welfare
organization. Later on, he established several social welfare organizations and schools for
orphaned and backward children, such as Dhamma Daya Pli School in 1958, Boalkali Shisu
Sadan in 1960, and so on. Nyaññasri Mahāthera also spread the Dhamma in India's West
Bengal (Kolkata) and fixed many old stupas built during the Pala dynasty in Bangladesh and
India's West Bengal. Moreover, he served Buddhism and education for more than a decade in the Chittagong
Hill Tracts (CHT). In 1974, he returned to Chittagong and became the abbot of Kadalpura
Sudhhammananda Buddha Vihara in Raozan, Chittagong. In 1977, he started another charity
called Mahmandal Dhamma Shikkha Parishad. Its goal was to teach young monks and novices
about Dhamma and Vinaya. In 1995, he was nominated as Chief Abbot of World Peace Pagoda
and Gunalangkar Buddhist Hostel at Jobra, Hathazari, Chittagong. Finally, he became the abbot
of the Chittagong Buddhist Vihara, where he is currently living with the community. In 2020,
His Holiness most Ven. Nyaññasri Mahathera was elected as the 13th Sangha Raj of Sangha Raj
Nikaya Bangladesh Buddha Bhikkhu Sangha.
3. Award
Name of Titles Organization Country Years
1.Vinayachariya Sangha Rajā Bhikkhu
Mahāsabha(Supreme Sangha
Council of Bangladesh )
Bangladesh 2001
2.Mahāsadhammajotikādajā Government of Myanmar Myanmar 2007
3.Ph. D (Honorary) MCU Thailand 2007
4.VisudhanandaGold Padak BD-Buddha-Kristi Prachar
Sangha
Bangladesh 2008
5.Dhammavandagarika Sangha Rajā Bhikkhu
Mahāsabha
Bangladesh 2012
6.Prestigious Award WFBY Thailand 2014
7.Saramedha Punnachar
Memorial Gold Award
Bangladesh Buddhist
Asociation
Bangladesh 2016
8.Babasaheb Dr. Ambedkar
Award
Government of India India 2022
9.Ekushey Padak Government of Bangladesh Bangladesh 2022
10.Agga Mahapandita Union of Government of Myanmar 2023
11.Shasan Shovan Gyanavanok Thailand 1987
4. Publications
1.Tittle of Publication Publication Year
2.Buddha Niti Manjuri (Bengali Version) 1965
3.Jatakabali (Translation work)
4.Buddha Niti Mala (Bengali Version) 1964
5.Bishakha Story (Translation work) 1965
6.Jibaka (Translation work) 1966
Ananada (Translation work) 1966
Organization:
Name of Organizations Year of Establishment
1.Kadalpur Pyari Mohan Sumantissa Buddhist Orphanage 1983
2.Kadalpur Bhikkhu Training Centre 1983
3.Karnaphuli Nalanda Nyaññasri Shishu Sadan 1989
4.Jobra Gunalangkar Buddhist Orphan Home 1980
5.Binajuri Dhammakathika Buddhist Orphanage 1994
6.Moanoghar Shisu Sadan 1974
7.Boal Khali Buddhist Orphan School 1961
8.West Binajuri High School 1999
9.Mahamandal Dharmiya Shiksha Parishad 1977
10.Dichan para Dr. Nyaññasri Sadhana Buddha Vihara 2013
11.Guimara Dewanpara Dr. Nyaññasri High School 2006
12.Uchai Surjapur Dr. Nyaññasri Buddha Vihara Joypurhat 2007
13.Uchai Jnanashree A.H.Primary School 2009
14.Nurpur Nyaññasri Buddha Vihara,Joypurhat 2008
15.Uchai Dr.Nyannasri Orphanage 2010
16.West Binajuri Dr. Jnanashree Vipassana Meditation Centre and
Old Shelter home.
2017
17.Bangladesh Buddha Shasan Kalyan Trust 2014
জীবনী
সূচনা :
সমাজ সদ্ধর্ম পরিমন্ডলে কাল পরিক্রমায় কিছু কিছু বিরল ব্যক্তিত্ব বিদগ্ধ অনুভাবকের দেখা মেলে যারা নিজেদের জ্ঞান-পূত আলোর দ্যুতি ছড়িয়ে দূর করেন সমাজের অজ্ঞানতার অন্ধকার, আলোকিত করেন চারপাশ, মোহমুক্ত করেন মানুষকে, সবার সামনে খুলে দেন আলোকজ্জ্বল এক উদ্বেলিত এবং মহাজীবনের ঠিকানা। পৃথিবী পৃষ্ঠের চমৎকার সবগুলো সৃষ্টির মাঝে মানুষের নিরন্তর আসা যাওয়া অপূর্ব তো বটে,যাঁরা গভীরভাবে এই আসা যাওয়াকে অবলোকন করেছেন তাদের অন্তরে হয়েছে ভাবোদয় এবং তার থেকে জন্ম নিয়েছে বৈরাগ্য।সহস্র কোটি এ আসা যাওয়ার অন্তরালে নিত্যদিন হারিয়ে যাচ্ছে কত,আবির্ভূত হচ্ছে কত তার হিসাব না থাকলেও এমন কিছু মহান প্রাণের হিসাব মেলে যাঁদের আত্মত্যাগ আর জীবন ধারণের আদর্শ হয়ে থাকে অবিরাম এ আসা যাওয়ার মাঝে বাকীদেও পথ নির্দেশনা।তেমন মহান ব্যক্তির সংখ্যা খুব বিরল হলেও তাঁদের জীবনালেখ্য হয়ে থাকে সময়ের সীমারেখা।যে মহান ব্যক্তির জীবন ধারার প্রতি এখানে বর্ণনা করা হচ্ছে তাঁর জীবনের আদর্শ ও আত্মত্যাগের মহিমা বাংলাদেশের বৌদ্ধ জনগণ,বুদ্ধেও শাসন সর্বোপরি মানব কল্যাণে সমুজ্জ্বল। নিবৃতচারী প্রাতঃস্মরণীয় এই মহামনীষী হলো ধর্ম সমাজ জনকল্যাণের বহু প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা, অনাথের নাথ,বিনয়াচার্য,১৩তম সংঘরাজ জ্ঞানশ্রী মহাথেরো মহোদয় যিনি মিতভাষী,স্মিতহাস্য,সৌম্য দর্শন,স্থিরবুদ্ধি,বহুদর্শী,কল্যাণকামী ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যক্তিত্ব সে দিনের লোকনাথ বড়ুয়া।
জন্ম ও শৈশবঃ
হালদার কূলে কূলে,পাল তোলা নৌকার কাছ থেকে ভেসে আসা ভাটিয়ারী গানের সুরে সুরে,স্রোত¯্স্বিনীর ঢেউ এর মৃদু নিনাদ সান্ধ্যকালীন পাখির কুজনে মুখরিত অথচ আধুনিক পুর সজ্জায় নিরাভরণ ঐতিহ্যবাহী রাউজান উপজেলার একটি প্রত্যন্ত গ্রাম ডোমখালী যেই গরবিনী প্রসবিনীর আর্তনাদে ঘোষনা করেছিল,“আমি ধারণ করছি এমন এক সন্তান--সে লোকনাথ,সে লোকনাথ,সে লোকনাথ।” তখন ছিল ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দের ১৮ই নভেম্বর রোজ বুধবার,২রা অগ্রহায়ন ১৩৩২ বঙ্গাব্দ। শিশু লোকনাথ হেসে খেলে প্রাণ চঞ্চল মাতৃদেবী মেনকার কোলে, পিতা প্রেমলাল সাধু সজ্জন অতি যত্ন ভরে কর্তব্য নিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছিলেন পুত্র সন্তানের লালন পালনের দায়িত্ব বহন করে।ডোমখালীর নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সেই শিশু লোকনাথ শৈশবের পায়ে ভর দিয়ে বাল্যে উপনীত হতেই মাতার কোল,উঞ্চ পরশ আর হৃদয়ের উত্তাপ। কী জানি কেন প্রসংগত দেখা যায় এমনটি প্রায়ই ঘটেছে তাদের জীবনে অন্ততঃ পক্ষে যদেও জীবনের আদর্শ প্রাত:স্মরণীয়। উল্লেখ্য মহামানব বুদ্ধকবি রবীন্দ্রনাথ,বিদ্রোহী কবি নজরুল,শীল তেজদপ্ত সংঘরাজ শীলালংকার।ভাষান্তেও বিধৃত হয়,বিয়োগ বেদনাহত হৃদয় উৎসারিত প্রেম স্বজনে সীমাবদ্ধ থাকে না,তা বহুজনের সুখে বহুজনের হিতে উৎসারিত।
বৃটিশ সরকারের কনোষ্টেবল বাবা কর্মক্ষেত্রে ন্যায় নিষ্ঠা ও কর্তব্যপরায়নতার জন্য ‘সাধু’ হিসেবে অভিহিত হলেও শৈশবের ক্রান্তিলগ্নে লোকনাথের সুন্দর জীবন গড়ার প্রয়াসে সযত্ন শাসনে ছিলেন তিনি কঠোর।মাতা মেনকাও সন্তানের উন্নতি কামনায় স্বামীর পার্শ্বে ছিলেন একান্ত সহযোগী হিসেবে।পাড়া প্রতিবেশী,অন্য দশজন সাধারণ স্ত্রী লোকের তুলনায় মেনকা দেবী সংসার ধর্ম পালনে ছিলেন ব্যতিক্রমী।ধর্মে কর্মে ছিল তার প্রগাঢ় অনুরাগ।মাতা পিতার সুকঠোর পারিবারিক বাধনে বাল্যেও কোঠায় পদার্পনের আগেই মাতা মেনকা কালের অমোঘ বিধান মেনে নিয়ে ধরাধাম থেকে বিদায় নিলেন চিরকালের তরে।বাবা প্রেমলাল তখন কিংকর্তব্যবিমূঢ়।জীবনের এক সন্ধিক্ষণে লোকনাথ কান্ডারী বিহীন তরণী সদৃশ সময়ের পরম মুহূর্তগুলোকে একে একে যখন হারানোর বেদনাকে আনন্দের আতিশয্যে অতিবাহিত করে বিনোদনে ব্যাপৃত হয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন ঠিক সেইক্ষণে নবজাত ছোট্ট বোনের দেখাশোনার ভার নিতে হলো তাকে ঠাকুরমার সাথে।উলট পালট হয়ে গেল সব।ছেদ পড়লো পড়াশোনায়।গ্রামবাসীর মুষ্টিচাল নির্ভর পাঠশালার ছাত্র লোকনাথের প্রথম শ্রেণীর পাঠ শেষ হলো না।ইতিমধ্যে পাঠশালার একমাত্র শিক্ষক লোকনাথর পিতৃব্যমহ মাষ্টার বীরমোহন বড়–য়া পাঠশালার শিক্ষকতা ত্যাগ করেন।পাঠশালার অংগনেও তিনি হারালেন এক পরম হিতৈষীকে।এ যেন দু:সময়ের অন্তরালে দুর্যোগের অবস্থান,সুযোগের অবকাশে উদ্ধত ফনার ছোবল।একে অন্যরা নিয়তি বললেও আমরা বলি কর্মের বিপাক। বাল্যকাল ও শিক্ষাজীবনঃ
বাল্যের স্বভাব সুলভ চপলতা যখন মাতৃহারা লোকনাথের হৃদয় কন্দরে বেদনার ছাফ হয়ে জীবনের স্বাভাবিক গতিকে নিয়ন্ত্রিত করছিল,চাকুরে বাবার অনুপস্থিতিতে গৃহ ছিল যখন নি:সঙ্গ নবজাতকের আর্তকান্নায় আহাজারীতে পূর্ণ তখন ঘরে নিয়ে এলেন প্রেমলাল তার দ্বিতীয় স্ত্রী লোকনাথের বিমাতা স্নেহলতা বড়ুয়া।বিমাতার আগমনে বালক লোকনাথ বোনের দেখাশোনার কাজ থেকে অব্যাহতি পেলেও বাবা প্রেমলাল দীর্ঘ ছয় বছরের ব্যবধানে আবার সেই পাঠশালায় তাকে দ্বিতীয় শ্রেণীতে ভর্তি করে দিলেন।পাঠশালার শিক্ষকতা কাজে নিয়োজিত হয়ে আসলেন আঁধারমানিক গ্রামের পন্ডিত ধর্মরাজ বড়ুয়া।শিষ্যের তুলনায় একলভ্য আরুনী অদ্যাবধি যেমন অনুপম,গুরু আর পাঠশালার তুলনায়ও সেদিনের শিক্ষাব্যবস্থা আজও অম্লান।ক্ষয়ে যাওয়া সেই দিনের শিক্ষাব্যবস্থার অকৃত্রিমতা,শিষ্যের গুরুর পরিচর্যা,গুরুর দেহমন দিয়ে শিষ্যের কল্যাণ সাধন সে কী আর পাঠশালার আদর্শ ছিল।অবশেষে পন্ডিত ধর্মরাজ বড়ুয়াও পাঠশালা ছাড়লেন এবং তার স্থলাভিষিক্ত হলেন বিনাজুরী নিবাসী মাষ্টার রজনী বড়ুয়া।তার হাতে বালক লোকনাথ চতুর্থ শ্রেণীর পাঠ শেষ করেন।কিন্তু গ্রামের পাঠশালায় ইংরেজি পড়া হয়নি বলে পরবর্তীতে বিনাজুরী নবীন এম,ই, স্কুলে পুন: তাঁকে ভর্তি হতে হলো তৃতীয় শ্রেণীতে।সেখানে তিনি চতুর্থ শ্রেণীতে বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন এবং পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত অধ্যয়ণ সমাপ্ত না করেই তিনি তিনি বাধ্য হলেন বিনাজুরী নবীন উচ্চ বিদ্যালয় ত্যাগ করতে।কারণ তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের(১৯৩৯-১৯৪৫) রণ দামামা বাজছিলো।যুদ্ধ পরবর্তী ভয়াবহ মহামারী আর দুর্ভিক্ষ সারা বিশ্বেও ঘওে ঘরে অজস্র মৃত্যু আর আর্তনাদের হাহাকার তুলেছিল তার থেকে লোকনাথের পিতা প্রেমলাল ও অব্যাহতি পেলেন না।কনোস্টেবেল প্রেমলালতখন হাবিলদার প্রেমলাল হলেও রোজগারের টাকা দিয়ে তভার পক্ষে সংসার চালানো কষ্টকর ছিলো।ওঁতপেতে থাকা দু:সময় আবারও এক ছোবল মারলো,কেড়ে নিলো ঠাকুরমাকে।হাবিলদার প্রেমলাল কর্তব্য নিষ্ঠার পরাকাষ্ঠায় তিলে তিলে নিজেকে সঁপে দিলেন কঠিন পীড়ার নিষ্ঠুর ছোবলে।হাঁপিয়ে উঠলেন তিনি।বিশ্বযুদ্ধেও করাল গ্রাস থেকে মুক্তি পেলেও তিনি জীবনযুদ্ধে নিরন্তর হেরে যাচ্ছিলেন।অগ্রিম পেনশন নিয়ে অবসর গ্রহণ কওে তিনি কৌশল বদলালেন বঠে কিন্তু বালক লোকনাথের পড়ালেখা বন্ধ কওে দিয়ে তাঁকে দোকানদারের কএজ নিয়োজিত করলেন।সংসার চললো ঠিক কিন্তু পিতা প্রেমলাল অন্তরে শান্তি পাচ্ছিলেন না একমাত্র ছেলের পড়ালেখ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে।তাঁকে ভীষণ দু:চিন্তায় পড়তে হলো।তখন বালক লোকনাথের সময়ের ঘন্টায় বেজে উঠলো কৈশোরের সংকেত ধ্বনি।
প্রব্রজ্যা ও প্রব্রজিত জীবন এবং মাধ্যমিক পাঠঃ
বিনাজুরী নবীন এম,ই স্কুলের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র বালক লোকনাথ বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ কালে তাঁর ঠাকুরমার মৃত্যু হয়।ঠাকুরমার সাপ্তাহিক ক্রিয়া উপলক্ষে বালক লোকনাথ প্রথানুসারে সর্বপ্রথম প্রব্রজিত হন।কিন্তু পারিপার্শ্বিকতা শ্রমনের স্কুল গমনের উপযোগী ছিলনা বলে সপ্তাহের মধ্যেই তিনি প্রব্রজিত শ্রামন্য জীবন ত্যাগ করলেন।সময়ের ব্যবধানে কৈশোরের কোঠায় পদার্পন করতে করতে লোকনাথের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে গেলেও পড়ালেখায় তাঁর আগ্রহের আগ্রহের তীব্রতা বিনাজুীর শ্মশান বিহারের শ্রামন সারানন্দকে আকৃষ্ট করলো।শ্রামণ সারানন্দ ছিলেন লোকনাথের মাতুল।শ্রামন সারানন্দেও গৃহী নাম নগেন্দ্রলাল বড়–য়া।তাঁর বাড়ী পশ্চিম বিনাজুরী।ব্যবসা করতেন আকিয়াবে।মনে ভাবান্তর উদয় হওয়ার পর তিনি আকিয়াব থেকে দেশে ফিরে আসেন এবং গহিরা অবস্থানকালে ষষ্ঠ সংঘরাজ ধর্মানন্দ মহাস্থবিরের নিকট প্রব্রজিত হন।প্রব্রজিত হওয়ার পর বিনাজুরী শ্মশান বিহারের অধ্যক্ষ ভিক্ষু বসুমিত্রের সাহচর্যে অবস্থান করতে থাকেন।তিনি লোকনাথের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে গেছে দেখে ভগ্নিপতি প্রেমলালকে তাঁর পড়ালেখার ভার গ্রহণ করার প্রস্তাব দিলে প্রেমলাল বাবু অতি সানন্দে সেই প্রস্তাবকে স্বাগত জানালেন।লোকনাথ বড় মাতুলের আশ্রয়ে চলে গেলেন।শ্রামন সারানন্দ ভাগ্নে লোকনাথকে শ্মশান বিহারের নিকটবর্তী সোনাইরমুখ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি করে দিলেন এবং লোকনাথ মনোযোগ সহকারে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।তিনি সোনাইর মুখ প্রাথমিক বিদ্যালয় হতে পঞ্চম শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।গোঁড়া থেকেই বালক লোকনাথ পড়ালেখায় আগ্রহী ছিলেন এবং গণিতে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন যার কারণে সে সহপাঠীদের নিকট অতীব প্রিয় ছিলেন।ক্রমে বাল্রের চপলতা কাটতে শুরু করলে তাঁর দৈনন্দিন আচরণে গুরুগ¤ভীর রূপ পরিস্ফুটিত হতে থাকে।
এই সময়ে ধর্ম চর্চা ও জ্ঞান সাধনার জন্য তাঁর মনে গভীর আগ্রহ সৃষ্টি হতে শুরু করলো।সাধারণ শিক্ষার সাথে সাথে তিনি শুরু করলেন ধর্ম বিনয় শিক্ষা এবং তারই প্রভাবে ক্রমান্বয়ে সাধারণ শিক্ষার মোহ কাটিয়ে তাঁর ঝোক প্রবল হতে থাকে ধর্ম বিনয শিক্ষার প্রতি।এবার তাঁর মনে একজন উপযুক্ত শিক্ষাগুরুর সন্ধান লাভে ব্যাকুল হলে তিনি তাঁর আগ্রহের কথা মাতুল সারানন্দকে জানালেন।মাতুল ভাগ্নের মধ্যে বৈরাগ্যেও উতপত্তি হওয়ার লক্ষণ সমুহ বিচার করে দেখলেন এবং এই সময়ে তাঁর একজনউপযুক্ত গুরুর প্রয়োজন উপলব্ধি করলেন।তখন হাটহাজারী উপজেলর জোবরা গ্রামে সুগত বিহাওে অবস্থান করছিলেন সমাজসংস্কারক উপসংঘরাজ শ্রীমত গুণালংকার মহাস্থবির।তাঁরই সান্নিধ্যে এনে মাতুল সারানন্দ ভিক্ষু সমর্পণ করলেন আপন ভাগ্নে কিশোর লোকনাথকে ধর্ম শিক্ষা লাভ করার মানসে।মহান চরিত্রের বিকাশ লাভে দেখা যায় সমগোত্রীয় কারো না কারো দাক্ষিণ্যের প্রয়োজন।বড়ো বড়ো কবি সাহিত্যিকদের জীবনে প্রভাব পড়তে দেখা গেছে দেশি বিদেশী অনেক বড়ো বড়ো কবি সাহিত্যিকের,বিজ্ঞানীর কাছে প্রভাব পড়েছে বিজ্ঞানীর,পুত্রের কাছে পিতার।তেমনি কওে মাতুল সারানন্দের প্রভাব পড়েছে লোকনাথের জীবনে।পূজ্যস্পদ ভদন্ত জ্ঞানশ্রী কান্ডারী বিহীন তরী সদৃশ জীবনের হালধরা আর পাল তোলার কোনরুপ নির্দেশ যখন পাচ্ছিলেন না তখন সেই নির্দেশ নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন মাতুল সারানন্দ।কান্ডারী সারানন্দ শ্রামণ তাই আমাদের বন্দনার যোগ্য পাত্র।শাসন হিতে তাঁর অবদান ভদন্ত জ্ঞানশ্রী।
তখন ছিলো ইংরেজি সনের ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দ।জোবরা সুগত বিহারে অবস্থানকালে কিশোর লোকনাথের মানসিকতার পরিবর্তন গভীরভাবে লক্ষ্য করলেন আচার্য গুণালংকার এবং উপযুক্ত সময় বিবেচনা করে আয়োজন করলেন লোকনাথের প্রব্রজ্যা দানের এবং লোকনাথ প্রব্রজ্যিত হলেন সে সময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসন ধ্বজ গুরু আচার্য গুণালংকার মহাস্থবিরের উপাধ্যায়াত্বে। লোকনাথ নবজীবন লাভ করে সম্বুদ্ধ শাসনে প্রবেশ করলেন এবং তাঁর গুরুদেব নাম রাখলেন ‘‘জ্ঞানশ্রী’’ শ্রামণ যার অর্থ নিজের জ্ঞান শ্রীমন্ডিত বা চমৎকার জ্ঞানের সৌকর্য।আচার্য উপসংঘরাজ গুনালংকার মহাস্থবিরের গৌরবময় কর্মপরিসর যেই প্রতিভাগুণে একসময় ভীষণভাবে আলোচিত ছিলো যিনি উখিয়ার পাতাবাড়ি থেকে সুদূর কুমিল্লা তথা বরিশালের খেপূপাড়া পর্যন্ত নিজের কর্মের আধিপত্য বিস্তার করে বৌদ্ধ ধর্ম শাসন বিষয়ক নানারুপ জটিলতর সমস্যার মীমাংসায় পৌঁছুতে সক্ষম হয়েছিলেন।সেই প্রাত:স্মরণীয় আচার্য গুণালংকার মহাস্থবিরের সান্নিধ্যে থেকে শ্রামণ জ্ঞানশ্রীর শ্রামণ্য জীবনের শিক্ষালাভ শুরু হয়।আচার্য গুণালংকার মহাস্থবিরের প্রত্যক্ষ প্রভাব তাঁর জীবনে পরিলক্ষিত হয় সমাজ ও শাসনের বহু সংস্কার করার প্রয়াসের মানসিকতা তাঁর মধ্যে অংকুারত হওয়াতে।এরই মধ্যে শ্রামণ জ্ঞানশ্রীর আচার্য শিক্ষায় বিঘœ ঘটেছে।আচার্য গুণালংকার বিশেষ করে পর্যটক ভিক্ষু ছিলেন।সেই কারণে বিহারে অবস্থান তাঁর খুব স্বল্প সময়ের জন্য হতো।তাঁর অনুপস্থিতিতে ধর্ম বিনয় শিক্ষায় শ্রামণ জ্ঞানশ্রীর পিপাসা মিটতো না।তাঁর ব্যগ্রতা জানালেন তিনি মাতুল সারানন্দ ভিক্ষুকেকে।তিনি মনস্থির করলেন ভাগ্নেকে গুমানমর্দন বিহারে অবস্থানরত ভদন্ত শান্তরক্ষিত স্থবিরের সান্নিধ্যে রেখে ধর্ম বিনয় শিক্ষায় সুশিক্ষিত করে তুলতে।াঅচার্য গুণালংকারের নিকট উত্থাপন করলে তিনি তাতে সম্মতি জ্ঞাপন করেন।শ্রামণ জ্ঞানশ্রী ভদন্ত শান্তরক্ষিত স্থবিরের সান্নিধ্যে অন্তেবাসী শিক্ষার্থী হিসেবে গুমানমর্দন বিহারে অবস্থান করে ধর্ম বিনয় শিক্ষার মনস্থির করলেন বটে কিন্তু সে সুযোগ পান নি।কারণ সেই সময়ে মির্জাপুর শান্তিধাম বিহারে বর্ষাবাস যাপনের জন্য নির্বাচিত ভিক্ষু যোগানন্দ তাঁর পূর্ব প্রতিশ্রæতি অনুযায়ী শান্তিধাম বিহারে আসতে না পারায় আচায গুণালংকার মহাস্থবির মহোদয়ের কাছ থেকে প্রার্থনা করে মির্জাপুর শান্তিধাম বিহারের দায়কবৃন্দ শামণ জ্ঞানশ্রীকে বর্ষাবাস যাপনর জন্য তাদেও বিহারে নিয়ে যায়।সেইথেকে যে শ্রামণ জ্ঞানশ্রীর উপর বিহার পরিচালনার দায়িত্ব অর্পিত হলো তাতে তাঁর সমাজ ও শাসন সংস্কারমূলক কাজের সূচনা ও ভিক্ষু জীবনে তা মহীরূপে বিশাল ছায়া বিস্তার করে তাঁর মহত জীবনের সূত্রপাঠ ঘটিয়েছে।
মির্জাপুর শান্তিধাম বিহারে অবস্থানকালে শ্রামণ জ্ঞানশ্রীর শিক্ষা ও কর্মজীবনের সমন্বয় ঘটতে থাকে।একাধারে তিনি ধর্মীয় শিক্ষালাভ ,সাধারণ শিক্ষার ক্ষেত্রে ম্যাট্রিকুলেশন প্রস্তুতি,বিহার উন্নয়ন এবং দায়কদের মধ্যে ধর্মের প্রভাব বিস্তারের ব্রত গ্রহণ করলেও পার্থিব বিষয়ের প্রতি তাঁর অনীহা দিন দিন প্রবল হতে থাকে যে তাঁর কাছে ধর্ম বিনয় শিক্ষা ব্যতীত অন্য বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পেত না।ফলে কার্যত সাধারণ শিক্ষার পরিসর সমাপ্ত করার মানসে ১৯৫৩ ইংরেজি সনে মির্জাপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করলেও সাফল্যমন্ডিত হতে পারেন নি।দ্বিতীয়বার সে দিকে মনোযোগ দেয়ার আগ্রহ তাঁর মধ্যে একেবারেই অনুপস্থিত ছিলো।সাধারণ শিক্ষার গুরুভা মাথা থেকে নামিয়ে তিনি মনোযোগ দিলেন বিহার সংস্কারে।শান্তিধাম বিহারের দায়ক যারা ছিলেন বিশেষ করে দু‘এক পরিবার ছাড়া আর কারও আর্থিক স্বচ্ছলতা ছিলো না।আত্মবিশ্বাস এবং আত্মশক্তিতে নির্ভর শ্রামণ জ্ঞানশ্রী পরিলক্ষিত কর্মসূচী নিয়ে সারাজীবন যে ভাবে স্বনির্ভরতার আহবান জানিয়েছেন সমাজের কল্যাণে নিয়োজিত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পরিচালকদের তাঁর ইংগিত মির্জাপুর শান্তিধাম বিহারের সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য গৃহীত কর্মসূচী থেকে আমরা সুস্পষ্ট ভাবে দেখতে পাই।তিনি বিহার উন্নয়নের জন্য বিহারের দায়কদের কাছ থেকে মুষ্ঠি চাউল চাঁদা নির্ধারণ করলেন এবং পরিকল্পিত পথে ধীওে হলেও বিহারোপযোগী রূপদান করতে সক্ষম হয়েছিলেন।তাঁরই পরিকল্পনার পরিসরে পরবর্তীকালে মহামান্য সংঘরাজ শীলালংকার মহাস্থবির মহোদয়ের পূণ্যতেজে থাই প্রচেষ্টায় শান্তিধাম বিহার দর্শনীয় রূপ পরিগ্রহ করেছে।তাঁর পেছনে শ্রামণ জ্ঞানশ্রীর মেধা ইতিহাসের উপাদান হয়ে রয়েছে।
উপসম্পদা ও শ্রামন্য জীবনের অবসানঃ
প্রব্রজ্যিত হওয়ার পর শ্রামণ জ্ঞানশ্রী আচার্য গুণালংকার মহাস্থবিরের সান্নিধ্যে জোবরা সুগত বিহাওে অববস্থান করতে থাকেন এবং পরবর্তীতে বর্ষাবাস যাপন শুরু করেন মির্জাপুর শান্তিধাম বিহারে। এই সময়ে মির্জাপুর শান্তিধাম বিহারে অবস্থান করলেও গুরুদেবের প্রত্যক্ষ তত্ত¡াবধানে তিনি ধর্ম বিনয় ও পৌরহিত্যের কাজ সমাধা করতেন।১৯৪৯ খৃঃ শ্রামন জ্ঞানশ্রীর জীবনের এক পয়মন্ত সময়। এ সময় গুরু উপসংঘরাজ গুনালংকার মহাস্থবির শ্রামণ জ্ঞানশ্রীর ধর্মানুরাগ,প্রিয়শীল ধর্মীয় জীবনযাপনের নানা দিক অবলোকন করতঃ তাকে উপসম্পদায় অভিষিক্ত করার বিষয় বিবেচনা করেন।আচার্য গুনালংকার তাঁর প্রিয় শিষ্যকে ঐতিহাসিক বিহার সীমায় উপসম্পদা প্রদান করার উদ্দেশ্যে সীমা নির্বাচন করলেন চাকমা রাজমহিয়ষী কালিন্দী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত রাজানগর শাক্যমুনি বিহার সীমা এবং সেখানে শ্রামণ জ্ঞানশ্রী ভিক্ষু জ্ঞানশ্রী অভিধা নিয়ে নবজীবন লাভ করলেন।আচার্য গুণালংকারের উপাধ্যায়াত্বে এ উপসম্পদা অনুষ্ঠানে সীমা আচার্য ছিলেন --
৬ষ্ঠ সংঘরাজ ধর্মকথিক ধর্মানন্দ মহাস্থবির,
আচার্য ভদন্ত জ্ঞানীশ্বর মহাস্থবির,
বিনয়াচার্য ভদন্ত বংশদ্বীপ মহাস্থবির,
সত্যদর্শন প্রনেতা বিদর্শন গুরু বিশুদ্ধানন্দ মহাস্থবির,
ভদন্ত ধর্মানন্দ মহাস্থবির (রাংগুনিয়া)
ভদন্ত আনন্দমিত্র মহাস্থবির,
ভদন্ত প্রজ্ঞানন্দ মহাস্থবির প্রমুখ।
কর্মবাচা আচার্য ছিলেন রাজানগর শাক্যমুনি বিহারের অধ্যক্ষ রাজগুরু ভদন্ত ধর্মরতœ মহাস্থবির।
উপসম্পদা লাভ করার শুভ মুহূর্তেও দুর্লভক্ষণ গুলির স্মৃতি রোমন্থন করার জন্য ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মাঝে মাঝে সেই অপূর্ব দর্শনীয় রাজানগর শাক্যমুনি রাজ বিহার দর্শন মানসে সেখানে গমন করতেন।ভিক্ষু অভিধা লাভ করে তিনি প্রত্যাবর্তন করলেন মির্জাপুর শান্তিধাম বিহারে।তখন থেকে তাঁর পরিপূর্ণ কর্মজীবন শুরু হয়।নিজে তিনি সম্পূর্নরূপে নিমগ্ন করলেন পালি সাহিত্য ও বৌদ্ধ ধর্মেও সার চয়ন তথা জ্ঞান চর্চার বিস্তীর্ণ ক্ষেত্রে অনুপ্রবেশ করে।
সমতলের সোনালী অধ্যায়ঃ
উপসম্পদা লাভ করে মির্জাপুর শান্তিধাম বিহারে প্রত্যাবর্তনের পর তিনি সেখানে আরও পাঁচ বছর অতিবাহিত করেন।তিনি জ্ঞান চর্চায় এত বেশী মনোযোগী হয়ে পড়েছিলেন যে,ভিক্ষু জীবনের রক্তিম উষায় শুরু করলেন বিনয় আদ্যের পাঠ্যসূচীর অন্তর্গত জাতক সমূহের অনুবাদ।এ অনুবাদ কর্মের তাঁর সহায়ক ছিল পন্ডিত ঈষান চন্দ্র ঘোষের বাংলা জাতক।তখন তাঁর বয়স পঁচিশের কোঠা পেরিয়ে যৌবনের উদ্দামতায় উচ্ছসিত সমুদ্র তরঙ্গের ন্যায় কামনার কূলে কূলে আছড়ে পড়ছিলো।সাধকের সংযম তখন সাধনার জ্ঞান সাধনার পরাকাষ্ঠায় কামনার সাগর মথিত করে তুলে আনছিলো বৈরাগ্যের অমৃত স্বাদ।শ্রামণ ও ভিক্ষু জীবনের দশকের কোটা পার না হতেই মির্জাপুর শান্তিধাম বিহারের তদানীন্তন পরিবেশ তাঁর জ্ঞান সাধনার জন্য অত্যন্ত অপরিসর হয়ে উঠলো।তিনি বৃহত্তর জ্ঞান চর্চার ক্ষেত্র খুঁজতে লাগলেন।
বুদ্ধ বলেছেন "চরথ ভিকখবে চারিকং,বহুজন হিতায় বহুজন সুখায "
হে ভিক্ষুগন ধর্মের সুধা নিয়ে দিকে দিকে বিচরণ কর,আত্মহিত ও পরহিতার্থে ধর্মসুধা বিতরণ কর"
তাই এই মূলমন্ত্র ধারণ করে নব উপসম্পদা প্রাপ্ত ভিক্ষু জ্ঞানশ্রী ধর্মপ্রচারের ব্রত নিয়ে ১৯৪৯ সাল থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত ৬ বছর মির্জাপুর শান্তিধাম বিহারে অবস্থানের পর ১৯৫৫ সালে মির্জাপুর ত্যাগ করে চলে আসেন রাউজান বিমলানন্দ বিহারে।সেখানে অবস্থানকালীন তিনি প্রতি মঙ্গলবার ধর্মসুধা দান,ধর্মজ্ঞান সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে বিশেষ ভুমিকা পালন করে সবার সাধুবাদ অর্জন করেন।ধর্মদানের এই উত্তম পন্থায় তিনি এখানে জ্ঞানী গুনীদের সংস্পর্শে গঠন করেন 'জাতক পরিষদ' নামে এক ধার্মিক মন্ডলী।জাতক পরিষদের কর্মকান্ডে সক্রিয়ভাবে যাঁরা ভিক্ষু জ্ঞানশ্রীকে সহায়তাদান করেছিলেন তাদের মধ্যে রাউজান আর্য্যমৈত্রেয় উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত উপেন্দ্রলাল বড়–য়া,অধ্যাপক ললিত কুমার বড়ুয়া,লালেন্দ্রলাল বড়–য়া,দানবীর বীতশোক মহাজন ও বর্তমান খ্রাতিমান বিদর্শনাচার্য্য শ্রামণ বোধিপাল প্রমুখ সমসাময়িক আরও অনেকে।ততকালীন সাপ্তাহিক ছুটির অবকাশে নিয়মিত জ্ঞান চর্চা তাঁর জীবনে অংকুরিত হয়েছিল অতৃপ্ত অন্বেষা।জ্ঞান সমুদ্রের তীরে উত্তাল খন্ড খুঁজতে গিয়ে তিনি সংস্কারক মনটিকে মেরে ফেলতে পারেন নি।রাউজান শান্তিধাম বিহারেরর (মুলাইংয়ের ক্যাং) পরিচালনার দায়িত্বও নিয়ে তিনি দুটি বিহারের সংস্কার ও উন্নয়নে ততপর ছিলেন।মুষ্টি চাউল নিয়মিত আহরিত হলো,গড়ে উঠলো বিহার উন্নয়ন তহবিল।সে তহবিল নিয়ে প্রভূত উন্নতি সাধন করলেন বিহারগুলোর।রাউজান বিমলানন্দ বিহাওে অবস্থানকালীন যেই কয়জন বিদগ্ধজনের সান্নিধ্য তিি লাভ করেছিলেন পরবর্তী জীবনে ভদন্ত জ্ঞানশ্রী তাদের প্রতি গভীর সন্তোস প্রকাশ করতে দেখা গেছে।তাদের গুণগ্রাহীতার বিবরণ এই পরিসরে লিপিবদ্ধ করা সম্ভব না হলেওতা ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য জ্ঞাতব্য হয়ে থাকবে।প্রকৃতপক্ষে ভিক্ষু জ্ঞানশ্রীর সৌরভ মন্ডিত গুণাবলীর বিকাশ বিমলানন্দ বিহারে অবস্থান কালে শুরু হয়।সোনালী ঊষার ইংগিতবহ পূর্ব দিগন্তে তপন বলয় যেমন মধ্যাহ্নের তাপ বিকিরণ করার ইংগিতবহ তেমনি রাউজান বিমলান্দ বিহারের ভিক্ষু জ্ঞানশ্রীর জ্ঞান অন্বেষা আভাষিত করেছিল তাঁর ভবিষ্যত জীবনের দেদীপ্যমান গৌরবোজ্জ্বল কর্মকান্ড গুলোর।বিশ্লেষনমূলক অনুমান করা মোটেই অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে,রাউজান বিমলানন্দ বিহারে অবস্থানকালে ভিক্ষু জ্ঞানশ্রীর জীবন ধারার দুটি খাতের মধ্যে যেটি প্রবল ছিল তা- পান্ডিত্যের। কিন্তু ভিক্ষু সংঘের নির্দেশে সমতল ত্যাগ করে তিনি যখন পার্বত্য চট্টগ্রাম গমন করেন তাঁর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক ধ্যান ধারণা প্রবল হয়ে উঠে।আজকের বিকশিত জ্ঞানশ্রী অনেক বড়ো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যক্তিত্ব পন্ডিত জ্ঞানশ্রীর কর্মপরিসরে।রাউজান বিমলানন্দ বিমলানন্দ বিহারে ভিক্ষু জীবনের (১৯৫৫-১৯৫৭) দুই বছর অবস্থান করে ১৯৫৭ ইংরেজি সনে তিনি যখন পার্বত্য চট্টগ্রামের মহালছড়ি উপজেলার মুবাইছড়ি গমন করেন তখন তাঁর শ্রামন্য ও ভিক্ষু জীবনের এক যুগ তিন পর্বে সমাপ্ত হয়।
পাহাড়ী চট্টলায় ভিক্ষু জ্ঞানশ্রীঃ
১৯৫৭ ইংরেজি সাল।রাউজান বিমলানন্দ বিহারের জ্ঞানী গুণী জনের সংস্পর্শ ত্যাগ করে ভিক্ষু জ্ঞানশ্রী মহান ভিক্ষু সংঘের নির্দেশে এক অনাথ পিতা ও শিক্ষার আলোর দিশারী হয়ে পাড়ি জমান দুর্গম পার্বত্য জেলার মহালছড়ি উপজেলার মুবাইছড়িতে।তাঁর প্রতি ভিক্ষু সংঘের এ নির্দেশ দানের কারণ হলো,রাউজান বিমলানন্দ বিহার ও মির্জাপুর শান্তিধাম বিহারে অবস্থানকালে ভিক্ষু জ্ঞানশ্রীর সংস্কারধর্মী চরিত্রের বিকাশ ঘটে এবং তারই আলোকে ভিক্ষুসংঘ পার্বত্য চট্টলার বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় সচেতনতা জাগ্রত করাসহ বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার প্রসার উদ্দেশ্যে একমাত্র ভিক্ষু জ্ঞানশ্রীকে নিযুক্ত করা ছাড়া দ্বিতীয় কোন যোগ্য ভিক্ষু খুঁজে বের করতে সমর্থ হন নি।সমসাময়িক কালে খৃষ্টান মিশনারীরা পার্বত্য চট্টলার পেছনে পড়া উপজাতীয়দের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে ধর্মান্তরিত করার চেষ্টায় লিপ্ত থেকে বৌদ্ধ ধর্মের উপর প্রচন্ড আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছিল।ধর্মান্তরিত করার এই প্রয়াসকে প্রতিরোধ করার জন্য বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার প্রসার কল্পে যে যোগ্য নেতৃত্বের প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল তা একমাত্র ভিক্ষু জ্ঞানশ্রী ব্যতীত আর কারও পক্ষে সম্ভব ছিল না।ফলে তিনি সমতলের জ্ঞান সাধনা আর সংস্কার কর্মসূচিকে পেছনে ফেলে পাহাড়ী চট্টলার বৌদ্ধ ধর্মকে অবক্ষয়ের হাত থেকে বাঁচাতে নির্ধিধায় ভিক্ষুসংঘের নির্দেশ শিরোধার্য করে সমতল ত্যাগ করে মুবাইছড়ি অবস্থানের জন্য চলে গেলেন। সেখানে অবস্থানকালে তিনি ছাত্রছাত্রীদের ধর্মীয় ও সাধারণ শিক্ষা প্রদানের নিমিত্তে প্রতিষ্ঠা করেন 'জ্ঞানোদয় পালি টোল'।তিনি পালি টোল প্রতিষ্টার পর ধর্মীয় শিক্ষায় পারদর্শী শিক্ষার্থীদের মাঝে মেধার স্বীকৃতি স্বরূপ প্রদান করতেন মেধা সীল।মুবাছড়িতে ভান্তের প্রিয় দায়কদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন তৎকালীন চেয়ারম্যান বিন্দুকুমার খীসা আর পুরঞ্জয় মহাজন।তারা ভান্তেকে নিরক্ষর, দরিদ্র, অসহায় পার্বত্য সন্তানদের মানুষ করার ক্ষেত্রে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছিলেন।তাদেরই সহযোগিতায় শত প্রতিকুলতার মাঝেও শুধুমাত্র ভিক্ষা কে সম্বল করে শুরু করলেন শিশু শিক্ষা পাঠ এবং অনাথ আশ্রম। ভান্তের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায় তখনকার সময়ে পার্বত্য অঞ্চলের পথঘাট এতই দুর্গম ছিল যে না ছিল ভাল পথঘাট না ছিল যানবাহন।শুধু খাগড়াছড়ি পৌছতেই লেগে যেত সপ্তাহকাল!!ভান্তে সেখানে যেতেন কখনো পায়ে হেটে কখনোবা নদীপথের লঞ্চে করে,নিয়ে নিতেন সাথে করে যতটুকু সম্ভব খাবার।
১৯৬০ সালে কাপ্তাই বাঁধের ফলে সৃষ্ট বিপুল জলরাশির ভয়াবহতায় মুবাছড়িতে ৩ বছর অবস্থানের পর ভান্তে চলে আসেন খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা বোয়ালখালী চাকমা রাজবিহারে।সেখানে তিনি রাজগুরু পদে অধিষ্ঠিত হন।উল্লেখ্য ভান্তে আসার পর উক্ত বিহারের দায়ক দায়িকাদের একতা বৃদ্ধির জন্য বিহারের নাম দশবল রাজবিহার নাম দেন যার অর্থ দশ বা সামগ্রিক শক্তির সমাহারে এই বিহার।জ্ঞানপিপাসু সদ্ধর্মাদিত্য ভদন্ত জ্ঞানশ্রী সেখানে প্রতিষ্ঠা করেন ধর্মোদয় পালি টোল ও পার্বত্য চট্টল বৌদ্ধ অনাথ আশ্রম। আশ্রম,স্কুল,পালিটোল ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করে তিনি অবহেলিত পিছিয়ে পড়া আদিবাসী বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় জ্ঞানপ্রভা বৃদ্ধি উত্তরণে ও সার্বিক জীবনযাপনে স্বাচ্ছন্দ্য আনয়নের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।পার্বত্য চট্টল বৌদ্ধ অনাথ আশ্রম থেকেই ভদন্ত জ্ঞানশ্রী একে একে অনেক মেধাবী সন্তন কে নিজের আদর্শে গড়ে তুলেছেন।এখান থেকে গড়ে উঠেছেন পার্বত্য তিন দিকপাল শিষ্য ভদন্ত বিমলতিষ্য মহাথের(বোধিচারিয়া প্রতিষ্ঠাতা,ভারত),ভদন্ত প্রজ্ঞানন্দ মহাথের(ঢাকা বনফুল শিশু সদন ও আদিবাসী গ্রীনহার্ট কলেজের পরিচালক),ভদন্ত শ্রদ্ধালংকার মহাথের(মোনঘর,রাঙামাটি পরিচালক) এবং এখান থেকেই পার্বত্য শিক্ষার মশাল তিনি প্রজ্জ্বলিত করে সমগ্র পার্বত্য অঞ্চলে ছড়িয়ে দিয়েছেন।ভদন্ত জ্ঞানশ্রী এখান থেকেই শিক্ষার মশাল প্রজ্জ্বলিত করে পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসীদের হৃদয়ে চিরকালের জন্য আলোরদিশারী হয়ে রয়ে গেলেন।কথিত আছে তৎকালীন সময়ে পার্বত্য চট্টল অনাথ আশ্রমে প্রায় প্রতিনিয়ত ৬০০ জনের অধিক ছাত্র ধর্মীয় ও সাধারণ শিক্ষায় নিয়োজিত থাকতেন।বর্তমানে পার্বত্য চট্টল আশ্রমে দায়িত্বে আছেন ভদন্ত প্রজ্ঞাজ্যোতি মহাথের। তিনি বর্তমানে সরকারি ক্যাপিটেসন গ্র্যান্ট নিয়ে প্রায় ১০০ জন ছাত্র নিয়ে এই আশ্রম এখনো ধরে রেখেছেন।
বর্তমান সময়ের ভিক্ষুকূল গৌরব পূজনীয় সাধনানন্দ মহাথের'র(বনভান্তে) ভিক্ষু জীবনের প্রথম দিকের উল্লেখযোগ্য সময় জুড়ে রয়েছেন ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মহাথের।১৯৬১ সালে ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মহাথের'র উদ্যোগে তার ধর্মগুরু উপসংঘরাজ গুনালংকার ভান্তেসহ জিনবংশ মহাথের,রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথের,মায়ানীর অরিন্দম মহাথের,প্রিয়দর্শী,ধর্মদর্শী প্রমুখ সংঘকে দুর্গম দীঘিনালার বোয়ালখালি তে নিয়ে যান।তখনকার সময়ে যোগাযোগ প্রতিকূল পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐ অঞ্চলে পৌঁছাতে পদব্রজে কয়েকদিন সময় লেগেছিল।তাদেরকে সংগীতিকারক করে নিজে কর্মবাচা আচার্য হয়ে গুরুদেব গুনালংকার মহাথেরর উপাধ্যায়ত্বে মায়ানী নদীর উদক সীমায় বনভান্তেকে শুভ উপসম্পদা প্রদান করেন।
মোনঘরপ্রতিষ্ঠাঃ
অতঃপর বোয়ালখালী পার্বত্য চট্টল অনাথ আশ্রম থেকে নিজের হাতে গড়া শিষ্যদের দিয়ে তিনি ১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন পার্বত্য অঞ্চলের বর্তমান বাতিঘর রাঙামাটির মোনঘর অনাথ আশ্রম। ভান্তের স্মৃতিচারণ অনুসারে মোনঘরের মূল জায়গা খানি নিজে ক্রয় করে দিয়ে হাতে গড়া শিষ্যদের মধ্যে অন্যতম বিমলতিষ্য, প্রজ্ঞানন্দ, শ্রদ্ধালংকার সহ সবার অক্লান্ত পরিশ্রমে আজকের মোনঘর প্রতিষ্ঠা করেন যা সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামে শিক্ষার মশাল হয়ে জ্বলজ্বল করে বর্তমান দেদীপ্যমান।ভদন্ত জ্ঞানশ্রী পার্বত্য অঞ্চলে দীর্ঘ ১৮ বছর অবস্থান করে সেখান কার আদিবাসীদের মধ্যে শিক্ষার বীজ বপন করে দিয়েছেন।তিনি আদিবাসীদের নিকট প্রবাদপ্রতিম মহাপুরুষ, প্রবাদপ্রতিম মহাগুরু,আলোর দিশারী,তিনিই সদ্ধর্মাদিত্য।তিনি বিনা পার্বত্য শিক্ষার ইতিহাস অসম্পূর্ণ, তিনি বিনা আদিবাসী শিক্ষিত সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অসম্পূর্ণ।তৎকালীন পার্বত্য আদিবাসী সমাজ তারই শিক্ষা নির্দেশনায় এতটুকু আসতে পেরেছে।
ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মহাথের পার্বত্য অঞ্চলে একদিকে সাধারণ শিক্ষার আলো জ্বেলে দিয়েছেন আরেকদিকে বনভান্তেকে উপসম্পদা প্রদান করে আদিবাসী সমাজে পারমার্থিক মার্গের পথ সুগম করে দিয়েছেন।সর্বোপরি পার্বত্য আদিবাসী বৌদ্ধ সমাজ সর্বদিকে এই মহাপুরুষের নিকট চির ঋণী.
অসুস্থ গুরুদেব গুনালংকারের পাশে ভিক্ষু জ্ঞানশ্রীঃ
আবার সমতলে ভিক্ষু জ্ঞানশ্রীঃ
ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মহাথের পার্বত্য অঞ্চলে পিছিয়ে পড়া আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে ১৮ বছর ধরে আলোর পথ দেখিয়ে আবার সমতলের বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর জীবন ধর্মীয় চেতনা উন্মেষে কাজ করতে মনস্থ হন।সে লক্ষ্যে তিনি ১৯৭৫ খৃষ্টাব্দে পার্বত্য অঞ্চলে তার প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, অনাথ আশ্রম সমূহ ইত্যাদির দায়িত্বভার শিষ্য প্রশিষ্যদের বিশেষ করে বিমলতিষ্য ও প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষুকে বুঝিয়ে দিয়ে আবার সমতলে ফিরে আসেন এবং রাউজান থানার কদলপুর সুধর্মানন্দ বিহারে অধ্যক্ষ পদে অধিষ্ঠিত হন।
অতঃপর ১৯৭৭ খৃঃ কদলপুরে গৌরচন্দ্র যতীন্দ্র দুঃস্থ অনাথ আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। বিহারের উন্নয়ন ও কর্মকাÐ বিস্তারের লক্ষ্যে কদলপুরে মুষ্টি চাউল উত্তোলন প্রথা পুনরায় চালু করেন।
তার কর্মউদ্যোগের স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৭৬ সালে ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মহাথের বিপুল ভোটের ব্যবধানে ভদন্ত শাক্যবোধি মহাথেরকে হারিয়ে বাংলাদেশ সংঘরাজ ভিক্ষু মহামন্ডলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাবান সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন।বাংলাদেশ সংঘরাজ ভিক্ষু মহামন্ডলের সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হওয়ার পর ঐ সময় মহামন্ডলের কাজকর্ম সুষ্ঠু ভাবে পরিচালনার জন্য ১৫ লক্ষ টাকা সংগ্রহ করে একটি তহবিল গঠন করে দেন যেখানে তিনি নিজেই ৬ লক্ষ টাকা অনুদান প্রদান করেন।
১৯৭৭ সালে বৌদ্ধ সন্তানদের ধর্মীয় শিক্ষা ও ধর্মীয় চেতনা সংস্কারের উন্নতি কল্পে 'সংঘরাজ ভিক্ষু মহামন্ডল ধর্মীয় শিক্ষা পরিষদ' গঠন করে বৌদ্ধ ধর্মীয় শিক্ষার জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেন।উক্ত শিক্ষা পরিষদেরও ৬ লক্ষ টাকার একটি তহবিল গঠন করে দেন যেখানে তিনি নিজেই ১ লক্ষ টাকা অনুদান প্রদান করেন।এ সময়ে তিনি নিজস্ব আর্থিক ফান্ডে মহামন্ডল শিক্ষা পরিষদের শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক প্রকাশনা ত্রৈমাসিক "ধর্মায়তন" প্রতিষ্ঠা করেন।
কদলপুরে দীর্ঘ ১১ বর্ষা অবস্থানকালীন এখানে একে একে গড়ে তুলেছেন অনাথ আশ্রম, ভিক্ষু ট্রেনিং সেন্টার, স্কুল ইত্যাদি।
কদলপুরে তার প্রতিষ্ঠিত অনাথ আশ্রম ও ভিক্ষু ট্রেনিং সেন্টার তার জীবনের এক অনন্য সৃষ্টি। এখান থেকে বহু ছাত্র উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সমাজ ও জাতির সেবা করে যাচ্ছে আর বহু ভিক্ষু প্রশিক্ষিত হয়ে সংঘ সমাজে নন্দিত হয়ে দিকে দিকে বুদ্ধের অমৃতবাণী প্রচারে রত রয়েছেন।তিনি তাদের সকলের শিক্ষক ও গুরু হিসেবে ভিক্ষু গৃহী উভয় সমাজের নিকট সম্মানের রাজমুকুট অর্জন করে চিরকালের জন্য হয়ে খ্যাত হয়ে গেলেন মহাগুরু,মহা আচার্য হিসেবে।সে সময়ে তার নিকট তম সহযোগী ছিলেন ভদন্ত প্রজ্ঞাবংশ মহাথের ও ভিক্ষু এইচ সুগতপ্রিয়।যতদিন কদলপুর ভিক্ষু ট্রেনিং সেন্টার থাকবে ততদিন এই তিন মহামনীষী অমর হয়ে থাকবেন।১৯৯২ খ্রিস্টাব্দের ২২ শে মার্চ কদলপুর সুধর্মানন্দ বিহারে এই মহামনীষীর ৬৭ তম হীরক জন্মজয়ন্তী মহাসমারোহে উদযাপিত হয়।
১৯৮৬ সালে ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মহাথেরো কদলপুর থেকে চলে আসলেন গুরুর জন্মজনপদ জোবরা গ্রামে। জোবরা সুগত বিহারের অধ্যক্ষ পদে দায়িত্ব নিয়ে ১৯৮৭ সালে গুরুর নামে প্রতিষ্ঠা করলেন গুনালংকার বৌদ্ধ অনাথ আশ্রম।উক্ত অনাথ আশ্রমে তিনি নিজ অর্থে প্রায় ১২ গন্ডা জমি ক্রয় করে দেন।উক্ত আশ্রমে বহুসংখ্যক বৌদ্ধ অনাথ ছাত্র লেখাপড়ায় উচ্চশিক্ষিত হয়ে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।ভিক্ষুজীবনের মূল্যবান ৩ টি বর্ষা তিনি জোবরা সুগত বিহারে অবস্থান করে ১৯৮৯ সালে মির্জাপুর গৌতমাশ্রম বিহারে অধ্যক্ষ হলেন।বিহারের দায়িত্ব নিয়ে তিনি শুরু করে দিলেন বিহার উন্নয়নের।তখনকার সময় তিনি বিস্কুটের ১ টি করে টিন ও নারিকেলের মালা(মুষ্টি চাউল নেওয়ার) পাড়ার ছেলেদের তোলার দায়িত্ব দিতেন।সে মুষ্টি চাউল সংগ্রহ করে তারা ভান্তের কাছে জমা দিতো। মুষ্টি চাউলের বিক্রয় লব্ধ অর্থ দিয়ে মির্জাপুর গৌতমাশ্রমে ভিক্ষু নিবাস ও সিংহ শয্যা বুদ্ধমূর্তির কক্ষ নির্মাণ করতে সক্ষম হলেন ঊনারই শিষ্য শাসনানন্দ ভিক্ষুকে দিয়ে।গৌতমাশ্রম বিহারে দায়ক দায়িকাদের মধ্যে চালু করেন প্রাতঃ ও সন্ধ্যা বন্দনা।
এই কালজয়ী মহাপুরুষ সংঘের নির্দেশে মির্জাপুর গৌতমাশ্রম বিহারে ২ বর্ষা অবস্থান করেন।অতঃপর ঢাকায় অবস্থানরত ভদন্ত শান্তপদ ভান্তের প্রয়ান হলে মির্জাপুর গৌতমাশ্রমে ২ বর্ষা অবস্থান করে চলে যান ঢাকা মেরুল বাড্ডা বৌদ্ধ বিহারে।তৎকালীন মহাসভার মহাসচিব ভদন্ত শান্তপদ মহাথের পূর্বে এই বিহারের অধ্যক্ষ ছিলেন।সংঘের নির্দেশে ডোমখালি থেকে প্রিয় শিষ্য শাসনানন্দ ভিক্ষুকে রেখে গেলেন মির্জাপুর গৌতমাশ্রম বিহারের দায়িত্বে। শান্তপদ ভান্তে ঢাকায় অবস্থানহেতু ঊনার মৃত্যুতে ১৯৯১ সালে ঢাকা মেরুল বাড্ডা বিহারের হাল ধরেন ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মহাথের। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৪ পর্যন্ত দীর্ঘ ৪ বর্ষাবাস তিনি ঢাকা বাড্ডা আন্তর্জাতিক বিহারে অবস্থান করেন।সেখানেও তিনি তার কর্মপ্রচেষ্টা দ্বারা দাতা প্রতি একহাত/১ ফুট করে টাকা নিয়ে উক্ত বিহারের অবকাঠামো বৃদ্ধি করেন যা এখনো লোকে মুখে শুনা যায় তার সদিচ্ছার কথা।
১৯৯১ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৪ বর্ষাবাস ঢাকায় অবস্থান শেষে ১৯৯৫ সালে সংঘের নির্দেশে ঢাকা থেকে চলে এলেন চট্টগ্রামে বিশ্বশান্তি প্যাগোডার হাল ধরার জন্য।বিশ্বশান্তি প্যাগোডার ভার নিয়ে সেখানে প্যাগোডা নির্মাণের জন্য ব্রতী হলেন।কিন্তু উন্নয়নে পারিপার্শ্বিক হাজারো সমস্যার কারণে মাত্র ২ বর্ষাবাস যাপন শেষে বিনাজুরী বাসীদের একান্ত আগ্রহে ১৯৯৭ সালে পুনরায় চলে আসতে হলো তার অনেক স্মৃতি ধন্য বিনাজুরী শ্মশান বিহারে।
মহান আচার্য জ্ঞানশ্রী মহাথের ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বিশ্বশান্তি প্যাগোডায় অবস্থানের পর ১৯৯৭ সালে চলে আসেন তার স্মৃতি ধন্য স্থান পশ্চিম বিনাজুরী শ্মশান বিহারে যেখানে দায়ক দায়িকারা তাকে আজীবন অধ্যক্ষের আসনে পূজা করেন।
বিনাজুরী এসেই বিনাজুরী শ্মশান বিহারকে নবরুপে সংস্কার করেন।এখানে ও একে একে প্রতিষ্ঠা করেছেন বিনাজুরী ধর্মকথিক অনাথ আশ্রম,পশ্চিম বিনাজুরী উচ্চ বিদ্যালয়,বিনাজুরী জ্ঞানশ্রী আন্তর্জাতিক ভাবনা কেন্দ্র ও বৃদ্ধাশ্রম।
শীলগুনে বিভূষিত,বিনয়ালঙ্কৃত এই মহান কর্মযোগী মহাপুরুষটি অনাথ ছেলেদের অনাদরে অবহেলায় পড়ে থাকতে যেন সহ্য করতে পারেন না।
তাই তো তার কর্মবহুল জীবনে যেখানেই অবস্থান করেছেন সেখানেই অনাথ ছেলেদের জন্য রেখে দিয়েছেন আশ্রয় আর তাদের জন্য হৃদয়ে রেখে দিয়েছেন অপার স্নেহ ও মৈত্রী।
তাই ১৯৯৪ সালে পশ্চিম বিনাজুরীতে প্রতিষ্ঠা করেন ধর্মকথিক অনাথ আশ্রম যেখান থেকে হাজার হাজার অনাথ ছেলে ও অন্যান্য ছাত্র শিক্ষা লাভ করে জীবনে উন্নতি লাভ করেছে এবং ভান্তের সব সময় তারা ভান্তের খোঁজ খবর নেন ও কৃতজ্ঞ পূজা নিবেদন করতে আসেন।বিনাজুরী আশ্রমে প্রশিক্ষনার্থী ভিক্ষু শ্রমন দের দৈনন্দিন ব্রতকর্ম,বিনয়শীল জীবন আচরণ, নিয়মিত পিন্ডাচরন চালু করেছেন।এই বিনাজুরী ধর্মকথিক অনাথ আশ্রম ও ভিক্ষু প্রশিক্ষণ কেন্দ্র যেন দ্বিতীয় কদলপুর ভিক্ষু ট্রেনিং সেন্টার।বর্তমানে এই আশ্রমের পরিচালকের দায়িত্বে আছেন তারই প্রিয় শিষ্য ভদন্ত শাসনানন্দ মহাথের।তিনিও আদিবাসী ছেলেদের সন্তানের মতই লালন পালন করেন। এখান থেকেই ভান্তের আদর্শে দীক্ষিত ও শিক্ষালাভ করে হাজার হাজার ভিক্ষু শ্রমন হয়ে দিকে দিকে ধর্মপ্রচারে রত আছেন।ভান্তের আর্থিক বদান্যতায় প্রতিষ্ঠা হয়েছে পশ্চিম বিনাজুরী উচ্চ বিদ্যালয় যেখানে ভান্তে প্রতিষ্ঠা কালীন সময়েও এককালীন ১ লাখ টাকারও অধিক দান দিয়ে স্কুলের প্রতিষ্ঠা তহবিল কে শক্তিশালী করে দিয়েছেন।বর্তমানে পশ্চিম বিনাজুরী উচ্চ বিদ্যালয় বিনাজুরী অঞ্চলে অন্যতম একটি শিক্ষা বিদ্যাপীঠ। এখান থেকেই প্রতি বছর বিনাজুরী আশ্রমের ছাত্র সহ এলাকার হাজার হাজার ছাত্র ছাত্রী পড়াশোনা শেষে জীবনে উন্নতি করেছে।প্রতিষ্ঠা করেছেন জ্ঞানশ্রী আন্তর্জাতিক ভাবনা কেন্দ্র যা বর্তমান সময়ে কাজ চলমান।২০১১ সালে বিনাজুরী শ্মশান বিহারে অনুষ্ঠিত হয় শ্রদ্ধেয় ভান্তের আন্তর্জাতিক মানের হীরক জয়ন্তী অনুষ্ঠান এবং তার জীবনের সমস্ত দান দক্ষিণার সঞ্চয় দিয়ে বুদ্ধ শাসনের কল্যাণের জন্য বিনাজুরী তে ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ বুদ্ধ শাসন কল্যাণ ট্রাস্ট।
সমাজ উন্নয়ন ও ভদন্ত জ্ঞানশ্রীঃ
ত্রিপিটক প্রচারে ভদন্ত জ্ঞানশ্রীঃ
কর্মযোগী ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মহাথের ১৯৬৪ খৃঃ সাহিত্যরতœ অষ্টম সংঘরাজ শীলালংকার মহাথেরোর সাথে যৌথ ভাবে গঠন করেন ত্রিপিটক প্রচার বোর্ড যা তার এক অনন্য কীর্তি। অধুনালুপ্ত ত্রিপিটক প্রচার বোর্ড থেকে অষ্টম সংঘরাজ ও ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মহাথের'র লিখিত কালজয়ী বৌদ্ধ মনীষীদের জীবনীগ্রন্থ -বিশাখা, জীবক,আনন্দ,বৌদ্ধ নীতিমঞ্জরী আজও বৌদ্ধ সমাজে অতিমাত্রায় পঠিত ও সমাদৃত হয়ে আসছে।
শাসন পথিকৃৎ ভদন্ত জ্ঞানশ্রীঃ
বিশ্ব চলমান।তাই সৃষ্টি হচ্ছে উত্তরাধিকার। স্বাভাবিকভাবেই জগত উত্তরাধিকার সৃষ্টির প্রতিযোগিতায় এগিয়ে চলেছে। ভদন্ত জ্ঞানশ্রী সেই দৃষ্টিকোন থেকে উপযুক্ত
উত্তরবঙ্গে ধর্মাভিযানঃ
ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মহাথের ১৯৯১-১৯৯৪ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত ঢাকা মেরুল বাড্ডাস্থ আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহারে অধ্যক্ষ হিসেবে অবস্থান করেন। ঐ সময় হতে উত্তরবঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মের অতীত ঐতিহ্য,সভ্যতা,সংস্কৃতির হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে তৎপর হন।ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মহাথেরোর জীবনের অন্যতম মহান কীর্তি সুদূর উত্তরবঙ্গের রংপুর,দিনাজপুর,রাজশাহী,বগুড়া,জয়পুরহাট,ঠাকুরগাঁও,সিরাজগঞ্জ,নওগাঁর প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবলুপ্তপ্রায় বৌদ্ধজনগোষ্ঠীকে অতীত ঐতিহ্যের বৌদ্ধধর্মের সুশীতল ছায়াতলে পুনরায় আনয়নকরত উত্তরবঙ্গের হারানো বৌদ্ধ কৃষ্টি ঐতিহ্যকে আবার বিশ্বসমক্ষে উপস্থাপন করা।ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় এক সময় বরেন্দ্রভূমি খ্যাত এ অঞ্চলসমূহে বৌদ্ধ ধর্মের বিজয় পতাকা সগৌরবে উড্ডীন ছিলো। কিন্তু রাষ্ট্রবিপ্লব এবং হতদরিদ্্র অবস্থার প্রেক্ষিতে সেই গর্বিত বৌদ্ধ সমাজের সোনালী দিনগুলো এক সময় অপসৃত হয়ে পড়ে।তাদের উত্তর পুরুষেরাও কালের এ করালগ্রাসের ঘৃন্য থাবা হতে নিজেদের রক্ষা করতে পারেনি নানা সামাজিক অর্থনৈতিক বৈষয়িক কারনে। কালক্রমে তারা বিভিন্ন আদিবাসীদের সংস্কারের সাথে অসহায়ভাবে যুক্ত হয়ে নিজেদের ধর্ম-কৃষ্টি সভ্যতাকে পর্যন্ত হারিয়ে ফেলতে বসেছিল।ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মহাথের এতদঞ্চলের অবহেলিত হারিয়ে যেতে থাকা বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীকে তাদের শিক্ষাদীক্ষা ও আর্থসামাজিক সমস্যা গভীরভাবে অবলোকন পর্যবেক্ষন করে এক সময় দৃঢ়চিত্তে প্রগাঢ় মনোবল নিয়ে হতশ্রী অসহায় বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন।তাদের প্রতি সাহায্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেন ।স্বীয় বার্ধক্য,শারীরকি অসুস্থতাকে গুরুত্ব না দিয়ে তিনি সীমাহীন ধৈর্য্য ধারণ করে উত্তরবঙ্গের পিছিয়ে পড়া বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর পুনর্জাগরণে মঙ্গল কামনায় বৌদ্ধ ধর্মের মূল¯্রােতে তাদের আবার ফিরে আসার অদম্য ইচ্ছাকে বাস্তবে রুপ দিতে নিররসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।তিনি উল্লেখিত জেলাসমূহে পরিভ্রমণ করে অত্র অঞ্চলের আদিবাসীদের যারা একান্তভাবে বৌদ্ধধর্মের সেই সুশীতল ছায়াতলে জীবনযাপন করতে ইচ্ছুক তাদের আর্থসামাজিক উন্নয়নের হিতার্থে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহন করেছেন ।তিনি প্রতি বছর নিয়মিত শীতকালে অবহেলিত দরিদ্র জনগনের মাঝে শতি বস্ত্র বিতরন করেন ।শ্রদ্ধেয় ভান্তে উত্তরবঙ্গে নি¤œলিখিত কার্যক্রম সমূহ সম্পাদন করেছেন:
১/জয়পুরহাট পাঁচবিবি উপজেলার উচাই সূর্যাপুর গ্রামে উপসঙ্ঘরাজ ড: জ্ঞানশ্রী বৌদ্ধ বিহার কমপ্লেক্্র প্রতিষ্ঠা
২/জয়পুরহাট নুরপুরে উপসঙ্ঘরাজ ড: জ্ঞানশ্রী বৌদ্ধ বিহার প্রতিষ্ঠা ও প্রভাতী ধর্মীয় শিক্ষার প্রবর্তন ।
৩/রংপুর মিঠাপুকুর বেনুবন বিহার সংলগ্ন অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য অনাথালয় শিশুসদন প্রতিষ্ঠার্থে সাড়ে একত্রিশ শতক জমি পাঁচ লক্ষ টাকায় কিনে দান করেন ।
৪/বদরগঞ্জ নবশালবন বিহারের অবকাঠামোগত উন্নয়নে জমি ক্রয় করে দেন ।
৫/ঠাকুরগাঁও তক্ষশীলা বিহারের অবকাঠামোগত উন্নয়নে জমি ক্রয় করে দেন ।
৬/উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন বিহার প্রতিষ্ঠান সমূহ রক্ষার্থে সর্বপ্রথম মুষ্ঠি চাউল উত্তোলন প্রথা প্রবর্তন করেন ।
৭/খুলনার বাগেরহাট একটি বিহার ও বরিশালের আখৈলঝরায় একটি বিহার প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার কাজ চলমান...
চট্টগ্রাম বৌদ্ধ বিহারে অধ্যক্ষ পদ গ্রহণঃ
১৯৯৭ থেকে ২০০১ পর্যন্ত দীর্ঘ ৫ বর্ষা পশ্চিম বিনাজুরী শ্মশান বিহারে অবস্থানের পর চট্টগ্রাম বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ সুবোধিরতœ মহাস্থবির প্রয়ান হলে ২০০২ সালে বাংলাদেশ বৌদ্ধ সমিতির প্রবল ইচ্ছার কারণে চট্টগ্রাম নন্দনকানন বৌদ্ধ বিহারে অধ্যক্ষ পদে সমাসীন হলেন।শুরু হলো নাগরিক জীবনের চাকচিক্যময় অধ্যায়।চট্টগ্রাম বৌদ্ধ বিহারে এসেই তিনি শুরু করেন বিবিধ উন্নয়নমূলক কাজ আরম্ভ করেন।দু:খমুক্তির অন্যতম উপায় বিদর্শন সাধনা। ।এই বিহারে এসে তিনি মুক্তিকামী উপাসক উপাসিকাদের নিয়ে আরম্ভ করেন প্রতিদিন সন্ধ্যাকালীন বিদর্শন ধ্যান অনুশীলন। বাংলাদেশ বৌদ্ধ সমিতির চেয়ারম্যান দানবীর রাখাল চন্দ্র বড়–য়ার পৃষ্ঠপোষকতায় শুরু করেন চট্টগ্রাম বৌদ্ধ বিহার ভিক্ষু ট্রেনিং সেন্টার ও অনাথ আশ্রমের কার্যক্রম। ভান্তের কার্যক্রমে সন্তুষ্ট হয়ে উপাসক উপাসিকারা দ্বিগুন উৎসাহে হয়ে উঠেন বিহারমুখী।শ্রদ্ধেয় ভান্তের অত্র বিহারে অবস্থানকালে বিহারের উন্নয়নমুখী বিবিধ কাজ শুরু হয়।২০০৮ সালে আরম্ভ হয় বিহারের পুনঃনির্মান কাজ ।
মাননীয় উপসংঘরাজ পদে অভিষেকঃ
২০০৩ সালে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সাংঘিক পূন্যপুরুষ মহামান্য একাদশ সংঘরাজ পন্ডিত শাসনশ্রী মহাস্থবির মহাপ্রয়ান করলে ২৯ শে জানুয়ারী ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দে তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানের পূর্বরাত্রে বাংলাদেশ সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভার ৫৭ তম অধিবেশনে মহান সংঘের সর্বসম্মতিক্রমে উপসংঘরাজ ধর্মসেন মহাস্থবির মহামান্য দ্বাদশ সংঘরাজ পদে অভিষিক্ত হন।তিনি সংঘরাজ পদে অভিষিক্ত হলে উক্ত অধিবেশনে মহাসভার উপসংঘরাজ পদ শূন্য হয়ে গেলে সে শূন্যপদে শাসনশোভন ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মহাস্থবির মহোদয় মাননীয় উপসংঘরাজ পদে অভিষিক্ত হন।
বিদেশ ভ্রমণঃ
শাসন পথিকৃৎ ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মহাথেরো দেশে বিদেশে বিভিন্ন ধর্মীয় সভা সমে¥লন অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হয়ে যোগদান করে মানুষের মনুষ্যত্ব বিকাশে আলোকিত সমাজ গঠনে মহাকারুনিক বুদ্ধের সদ্ধর্মের অমোঘ বাণী প্রচার করে যাচ্ছেন। সম্মানিত অতিথি হয়ে ভ্রমণ করেছেন বহু দেশ।
তার মধ্যে ২০০৭ খৃস্টাব্দে মায়ানমার সরকারের আমন্ত্রনে মায়ানমার সফর করেন।
২০০৭ খৃস্টাব্দে সম্মানসূচক ডক্টর ডিগ্রী গ্রহনের জন্য থাই সরকারের আমন্ত্রনে থাইল্যান্ড সফর করেন।
২০০৮ খৃস্টাব্দে জাপানের রয়েল গ্র্যান্ড হল অব বুড্ডিজম এ অনুষ্ঠিত পঞ্চম বুড্ডিস্ট সামিট - ওয়ার্ল্ড বুড্ডিস্ট সুপ্রিম কনফারেন্সে যোগদান করেন
২০১১ খৃস্টাব্দে শ্রীলংকান সরকারের বিশেষ আমন্ত্রনে শ্রীলঙ্কা সফর করেন।
২০১৯ খৃস্টাব্দে ধুতাঙ্গ সাধক ভদন্ত শীলানন্দ থের ভিয়েতনাম উপাসক উপাসিকাদের আমন্ত্রনে তারই পরম গুরু হিসেবে ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মহাথের মহোদয়কে ভিয়েতনাম সফরে নিয়ে যান। এছাড়াও শ্রদ্ধেয় ভান্তে বহুবার বিভিন্ন সংস্থার আমন্ত্রনে ভারত ও থাইল্যান্ড ভ্রমন করেন।
বিভিন্ন সম্মাননা ও অভিধায় অভিষিক্তঃ
পার্বত্য চট্টগ্রামের বুদ্ধশাসন সদ্ধর্মে বনভান্তেকে উপসম্পদা দান তথা সেখানকার সমগ্র পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মাঝে শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে দিয়ে তিনি সমগ্র পার্বত্য অঞ্চলে সদ্ধর্মাদিত্য সম্মানে ভূষিত হয়ে সেখানকার জনমানসের হৃদয় মন্দিরে মহামানব হিসেবে সর্বদা পূজিত হন।
বৌদ্ধ ধর্ম সমাজ সংস্কৃতিকে বলীয়ান বেগবান করার ক্ষেত্রে নিরলসভাবে নিষ্ঠার মাধ্যমে লালন পালন করে চলেছেন প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মহাথের ।তাই ধর্মের প্রভূত শ্রীবৃদ্ধি-উন্নতিতে অবদান রাখার জন্য থাইল্যান্ডের ফরা ধর্মাধিরাজ মহামুনির উপস্থিতিতে তার কৃতিত্বের জন্য থাইল্যান্ড সরকার কর্তৃক ১৯৮১ খৃস্টাব্দে শাসন শোভন জ্ঞানভানক উপাধিতে ভূষিত হন ।
শাসন শোভন জ্ঞানভানক ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মহাথের মহোদয় সদ্ধর্ম সমাজে আত্মত্যাগ ও বিনয়ের প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভা কর্তৃক ২০০১ খৃস্টাব্দে মহামান্য প্রথম সংঘরাজ সারমেধ মহাস্থবিরের দ্বিশত তম জন্মবার্ষিকীতে বুদ্ধশাসনের দুর্লভ উপাধি বিনয়াচার্য অভিধায় অভিষিক্ত হন।
বৌদ্ধদর্শন প্রচার প্রসারে নিরবচিছন্ন প্রচেষ্টায় অবদান রাখার জন্য মায়ানমার সরকার কর্তৃক তিনি ২০০৭ খৃস্টাব্দে মহাসদ্ধর্মজ্যোতিকাধ্বজ উপাধিতে ভূষিত হন।
এছাড়াও ২০০৭ খৃস্টাব্দে থাইল্যান্ডের মহাচুলারংকর্নরাজা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রী(অনারারি পি.এইচ.ডি.) প্রদান করে সম্মানিত করা হয়।
সদ্ধর্মের প্রচার ও ভিক্ষুসংঘের একতায় অসামান্য অবদান রাখার জন্য বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘ কর্তৃক বিশুদ্ধানন্দ স্বর্ণ পদকে ভূষিত হন।
বুদ্ধ দর্শন সম্পর্কে অপরিমেয় পান্ডিত্যের স্বীকৃতিস্বরুপ ২০১২ খৃস্টাব্দে তিনি বাংলাদেশ সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভা কর্তৃক ধর্ম ভান্ডাগারিক উপাধিতে সম্মানিত হন।
বুদ্ধশাসন রক্ষায় অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরুপ তিনি বাংলাদেশ বৌদ্ধ সমিতি কর্তৃক সংঘরাজ সারমেধ শান্তি স্বর্ণ পদকে সম্মানিত হন।
মহামান্য ত্রয়োদশ সংঘরাজ পদে অভিষেকঃ
২০২০ সালের ২১ শে মার্চ মহামান্য দ্বাদশ সংঘরাজ ভদন্ত ধর্মসেন মহাস্থবির মহাপ্রয়ান করার পর সংঘরাজের পদ শূন্য হয়ে গেলে ২০ শে মে ২০২০ খৃস্টাব্দে,রোজ বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভার কারকসভার সর্বসম্মতিক্রমে শাসন শোভন ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মহাস্থবির মহোদয়কে মহামান্য ত্রয়োদশ সংঘরাজ পদে মনোনীত করা হয়। এরপর ২০২১ সালের ২৫ শে মার্চ,রোজ বৃহস্পতিবার মহামান্য দ্বাদশ সংঘরাজ ভদন্ত ধর্মসেন মহাস্থবিরের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পূর্বরাত্রে বাংলাদেশ সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভার ৭৩তম বার্ষিক সাধারন অধিবেশনে মহান সংঘের সর্বসম্মতিক্রমে উপসংঘরাজ জ্ঞানশ্রী মহাথের মহোদয়কে মহামান্য ত্রয়োদশ সংঘরাজ পদে অভিষিক্ত করা হয়।