14/02/2026
করণীয় মেত্তা সূত্রের অলৌকিক রহস্য: অদৃশ্য শক্তির সম্মুখে অবিচল মন
আজ আমরা প্রায় ২৫০০ বছর পূর্বের অতীতে ফিরে যাচ্ছি—জম্বুদ্বীপের এক নির্জন অরণ্যে অবস্থানরত ভিক্ষুদের এক বিস্ময়কর ও ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সন্ধানে।
হিমালয়ের অদ্ভুত ছায়া (ঐতিহাসিক ঘটনা):-
বুদ্ধের সময়ে ৫০০ জন ভিক্ষু বর্ষাবাসের জন্য হিমালয়ের পাদদেশের এক মনোরম অরণ্যে গমন করেন। কিন্তু সেই অরণ্যে বসবাসকারী বৃক্ষদেবতারা ভিক্ষুদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে তাঁদের তাড়িয়ে দিতে রাতের বেলায় ভয়ংকর রূপ ধারণ করত, করুণ আর্তনাদধ্বনি তুলত এবং দুর্গন্ধ ছড়িয়ে দিত।
ভীতসন্ত্রস্ত ভিক্ষুগণ বুদ্ধের কাছে ফিরে গেলে তিনি বলেন—
“ভিক্ষুগণ, এই উপদ্রবের কারণ তোমাদের অন্তরের নিরাপত্তাহীনতা। আমি তোমাদের এমন এক উপায় দেব, যা হবে সুরক্ষা ও ভাবনার শক্তি। এটি নিয়ে আবার সেই অরণ্যেই ফিরে যাও।”
সেই আশ্চর্য রক্ষাকবচই হলো করণীয় মেত্তা সূত্র। মৈত্রী চর্চাকারীর মধ্যে থাকা প্রয়োজনীয় ১৬টি গুণ। বুদ্ধ উপদেশ দেন, মৈত্রী ভাবনা শুরু করার আগে নিজের চরিত্রকে এভাবে গড়ে তুলতে হবে—
১ প্রথম গাথা
“করণীয়মত্তকুসলেন, যন্তং সন্তং পদং অভিসমেচ্চ
সক্কো উজু চ সুউজু চ, সুবচো চস্স মুদু অনতিমানী।”
অর্থ: যে ব্যক্তি নির্বাণপদ লাভে ইচ্ছুক, সে যেন যোগ্য, সৎ, অত্যন্ত সৎ, অনুগত, কোমলস্বভাব এবং অহংকারহীন হয়।
২ দ্বিতীয় গাথা
“সন্তুস্সকো চ সুভরো চ, আপ্পকিচ্চো চ সাল্লহুকবুত্তি
সন্তিন্দ্রিয়ো চ নিপকো চ, আপ্পগব্ভো কুলেসু অননুগিদ্ধো।”
অর্থ: সন্তুষ্ট, সহজে লালনযোগ্য, স্বল্পকর্মব্যস্ত, সরল জীবনযাপনকারী, ইন্দ্রিয়সংযমী, প্রজ্ঞাবান এবং লোভহীন হওয়া উচিত।
👉 সার্বজনীন মৈত্রীর সীমাহীনতা
৩ তৃতীয় গাথা
“ন চ খুদ্দং সমাচরে কিন্চি, যেন বিঞ্ঞু পরে উপবদেয়্যুং
সুখিনো বা খেমিনো হন্তু, সব্বে সত্তা ভবন্তু সুখিতত্তা।”
অর্থ: জ্ঞানীরা নিন্দা করতে পারে এমন সামান্য অন্যায়ও করো না। সকল প্রাণী সুখী হোক, নিরাপদ থাকুক।
৪️ ও ৫️ চতুর্থ ও পঞ্চম গাথা
“য়ে কেচি পাণভূতত্তি, তসা বা থাবরা বা অনবশেষা
দীঘা বা যে মহন্তা বা, মাজ্ঝিমা রস্সকা অণুকথুলা।
দিট্ঠা বা যে চ অদিট্ঠা, যে চ দূরে বসন্তি অবিদূরে
ভূতা বা সম্ভাবেসী বা, সব্বে সত্তা ভবন্তু সুখিতত্তা।”
অর্থ: যে সকল প্রাণী আছে—স্থাবর বা জঙ্গম, ক্ষুদ্র বা বৃহৎ, দীর্ঘ বা সংক্ষিপ্ত, স্থূল বা সূক্ষ্ম, দৃশ্যমান বা অদৃশ্য, নিকটবর্তী বা দূরবর্তী, জন্মগ্রহণ করেছে বা জন্মগ্রহণের অপেক্ষায়—সকলেই সুখী হোক।
👉 সামাজিক ও মানসিক শুদ্ধতা
৬ ষষ্ঠ গাথা
“ন পরো পরং নিকুব্বেথ, নাতিমঞ্ঞেথ কত্তচি নং কিন্চি
ব্যারোসনা পতিঘসঞ্ঞা, নাঞ্ঞমঞ্ঞস্স দুক্খমিচ্ছেয়্য।”
অর্থ: একে অপরকে প্রতারণা করো না। কাউকে অবজ্ঞা করো না। ক্রোধ বা বিদ্বেষবশত অন্যের দুঃখ কামনা করো না। 🚫😡
👉 মাতৃস্নেহের উপমা
৭ সপ্তম গাথা
“মাতা যথা নিয়ং পুত্তং, আয়ুসা একপুত্তমনুরক্ষে
এবম্পি সব্বভূতেসু, মানসাং ভাবয়ে অপরিমাণং।”
অর্থ: যেমন মা নিজের একমাত্র সন্তানকে প্রাণ দিয়ে রক্ষা করে, তেমনি সমগ্র জগতের প্রতি সীমাহীন মৈত্রী বিকাশ করো।
👉 নির্বাণের পথ ও সর্বোত্তম অবস্থান
৮ ও ৯ অষ্টম ও নবম গাথা
“মেত্তঞ্চ সব্বলোকস্মিং, মানসাং ভাবয়ে অপরিমাণং
উদ্ধং অধো চ তিরিয়ঞ্চ, অসম্বাধং অবেরং অসপত্তং।
তিট্ঠং চরং নিসিন্নো বা, সয়ানো বা যাবতস্স বিগতমিদ্ধো
এতং সতিং অধিট্ঠেয়্য, ব্রহ্মমেতং বিহারং ইধমাহু।”
অর্থ: উপর, নিচ, চারদিকে—সমগ্র জগতে বৈরহীন, বিদ্বেষহীন মৈত্রী ছড়িয়ে দাও। দাঁড়িয়ে, চলতে, বসে বা শয়নে—যতক্ষণ জাগ্রত আছো, ততক্ষণ এই মৈত্রীভাব স্মরণে রাখো। এটিকেই “ব্রহ্মবিহার” বা সর্বোত্তম অবস্থান বলা হয়।
১০ দশম গাথা (সমাপ্তি)
“দিট্ঠিং চ অনুপগম্ম সীলবা, দস্সনেন সম্পন্নো
কামেসু বিনেয়্য গেধং, ন হি জাতু গব্ভসেয়্যং পুনরেতীতি।”
অর্থ: ভ্রান্ত দর্শন ত্যাগ করে, শীলসম্পন্ন ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন হয়ে, কামতৃষ্ণা দমনকারী ব্যক্তি আর কখনও মাতৃগর্ভে প্রত্যাবর্তন করেন না—অর্থাৎ তিনি নির্বাণ লাভ করেন।
উপসংহার:-
যখন সেই ভীত ভিক্ষুগণ এই মৈত্রীভাব চর্চা করতে লাগলেন, তখন অরণ্যের দেবতাগণ শান্ত হয়ে তাঁদের সেবা করতে শুরু করেন। বিদ্বেষ দ্বারা বিদ্বেষ কখনও নিবৃত্ত হয় না; মৈত্রীর মাধ্যমেই তা নিবৃত্ত হয়—এই চিরন্তন সত্য করণীয় মেত্তা সূত্র আমাদের বাস্তব জীবনে শিক্ষা দেয়।
আপনার জীবনেও এই মহৎ মৈত্রীর শক্তি ধারণ করুন। সকল প্রাণী সুখী হোক।
ls
© Bablu