16/12/2025
জগন্মাতা মহিষাসুর বধের প্রাক্কালে মধুপান করলেন কেন?
শ্রীশ্রীদুর্গাসপ্তশতী গ্রন্থে বলা হয়েছে, দেবীকে ধনাধিপতি কুবের সর্বদা পরিপূর্ণ একটি সুরাধার পানপাত্র উপহার দিয়েছিলেন। "দদাবশূন্যং সুরয়া পানপাত্রং ধনাধিপঃ।" (২/২৯) মহিষাসুরের সাথে যুদ্ধের চূড়ান্ত সময়ে অসুররাজ বিশালকায় মহিষরূপে ভয়ানক তাণ্ডব আরম্ভ করলে, দেবী ক্রুদ্ধা হয়ে সেই পানপাত্র থেকে মধুপানপূর্বক মহিষকে তিরস্কার ও বিনাশ করেন। দেবীর এই মধুপানের ব্যাখ্যা বিষয়ে নানা মুনির নানা মত।
শ্রীশ্রীচণ্ডীর নাগোজীভট্টী টীকায় (৩/৩৩) বলা হয়েছে, মহিষাসুর যেহেতু শিবাবতার, তাই তার প্রতি দয়া আদি কোমলভাব মন থেকে সরিয়ে দেবার জন্য দেবী মধুপান করেছেন। দেবীভাগবতের নীলকণ্ঠকৃত টীকাতেও (৫/১৮/৫৪) দেবীর মধুপানের এই ব্যাখ্যাই করা হয়েছে। নীলকণ্ঠ বলেছেন, "মহিষাসুরস্য কালিকাপুরাণোক্তরীত্যা শিবাংশত্বাত্তস্য তস্য চ বুদ্ধিপুরঃসরং হননাযোগ্যত্বাদেবং মদিরাং পীত্বা তদ্বধার্থং দেব্যা মদান্ধকত্বং স্বীকৃতমিতি।" অর্থাৎ, কালিকাপুরাণ প্রমাণে মহিষাসুর যেহেতু শিবাংশ, তাই দেবীর পক্ষে পূর্ণসচেতন অবস্থায় তাকে বধ করা সম্ভব ছিল না। তাই মদিরা পান করে মদান্ধ অবস্থায় দেবী তাকে বধ করেছেন, এই হলো স্বীকৃত মত। কেমন এই মদিরাপান? দেবীভাগবতের বর্ণনা অনুসারে, স্বর্ণময় চষক থেকে সুমিষ্ট দ্রাক্ষাসব সেবন করেছিলেন দেবী। তারপর তীক্ষ্ণ ত্রিশূল হাতে নিয়ে তিনি ধেয়ে গিয়েছিলেন দানবের দিকে।
মহিষের শিবাবতারত্বের প্রমাণ মূলত কালিকাপুরাণ এবং মহাকালসংহিতা। কোনও মহাপুরাণে এ জাতীয় বর্ণনা নেই। শ্রীশ্রীচণ্ডীর নাগোজীভট্টী টীকাতেই কেবল এর উল্লেখ আছে। শান্তনবী টীকায় "বীরানাং কর্তব্যং মদ্যপানং" ইত্যাদি বলে দেবীর মধুপানকে "বীরপান" আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
দুর্গাসপ্তশতীর প্রসিদ্ধতম টীকাকার ভাস্কররায় তৎকৃত গুপ্তবতী টীকায় একবারও মহিষকে শিবাবতার বলে উল্লেখ করেননি। দেবীর মধুপানের ভাস্কর-কৃত ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এবং অভিনব।
শ্রীশ্রীচণ্ডীর ৩/৩৩ শ্লোকের টীকায় জগন্মাতার মধুপানের ব্যাখ্যা হিসাবে ভাস্কর লিখেছেন, "তুরীয়াপি চণ্ডিকা প্রধানহননরূপং কৃত্বাপি রজোগুণাবির্ভাবাধিক্যেন স্বস্যাং মহালক্ষ্মীত্বমাপাদিতবতীতি ধ্বননায় মধ্যে পানমাহ।" অর্থাৎ, জগন্মাতা চণ্ডিকা স্বভাবত তুরীয়া বা ত্রিগুণের অতীত। তথাপি মহিষহননের প্রাক্কালে রজোগুণের আবির্ভাবের আধিক্যবশত নিজ মহালক্ষ্মীস্বরূপ প্রকাশার্থে তিনি মধুপান করলেন। ৩/৩৫ শ্লোকের টীকায় তিনি বলেছেন, "লক্ষ্ম্যাঃ সুরায়াশ্চ মাদকত্বেন সাম্যাচ্চ।" অর্থাৎ, লক্ষ্মী এবং সুরা এই দুয়ের মধ্যে 'মাদকত্ব' বৈশিষ্ট্যটির অবস্থানবশত সাম্য লক্ষিত হয়। এই কারণে, মধুপানের পর তুরীয়া চণ্ডিকা পরমেশ্বরীর মধ্যে লক্ষ্মীর আবেশ ঘটে, এবং তাঁর দিব্য দেহে অরুণ লোচন, অট্টহাস্য, আরক্তিম মুখমণ্ডল, মদাকুল অস্পষ্ট উচ্চারণ প্রভৃতি ভাব পরিলক্ষিত হয়।
ক্রুদ্ধা জগন্মাতা তখন মহিষাসুরকে তিরস্কার করে বলে উঠলেন—
গর্জ গর্জ ক্ষণং মূঢ় মধু যাবৎ পিবাম্যহম্।
ময়া ত্বয়ি হতে'ত্রৈব গর্জিষ্যন্ত্যাশু দেবতাঃ॥
এই শ্লোকের (৩/৩৬) গুপ্তবতী টীকায় বলা হচ্ছে, "মধু যাবৎ পিবামি লক্ষ্ম্যাবেশবিশিষ্টা যাবৎ ভবামি। ময়া লক্ষ্ম্যা। ইন্দিরা লোকমাতা মা ইতি কোশাৎ।"
অর্থাৎ, দেবী বলছেন, যতক্ষণ আমি মধুপান করি, অর্থাৎ লক্ষ্মীর দ্বারা আবিষ্ট অবস্থায় থাকি, ততক্ষণ তুই গর্জন করে নে। তারপর 'ময়া' অর্থাৎ লক্ষ্মীর দ্বারা তুই নিহত হবি। 'ময়া' শব্দটির অর্থ ভাস্করের মতে "আমার দ্বারা" নয়, "লক্ষ্মীর দ্বারা"। শব্দকোষে লক্ষ্মীর প্রতিশব্দ ইন্দিরা, লোকমাতা, মা প্রভৃতি শব্দের কথা তিনি উল্লেখ করেছেন। 'মা' অর্থাৎ লক্ষ্মী, সেই শব্দের তৃতীয়া বিভক্তির একবচন 'ময়া' অর্থাৎ লক্ষ্মীর দ্বারা।
৩/৩৯ শ্লোকের টীকায় "তয়া দেব্যা মধুপানেন পরিণতা রাজসীলক্ষ্মীস্তয়া নিপাতিত ইত্যর্থঃ।" উক্তির মাধ্যমে ভাস্কর আবারও স্পষ্ট করেছেন, তুরীয়া চণ্ডিকা পরমেশ্বরীতে মধুপানবশত আবিষ্ট রাজসীমূর্তি লক্ষ্মীর দ্বারাই মহিষাসুর নিহত হয়েছে।