02/11/2020
★রাসুল সঃ এর প্রতি ভালবাসার গুরুত্ব এবং
রাসুল (সা.) এর অবমাননার পরিণাম ও শাস্তিঃ
ভূমিকাঃ
★আল্লাহ তায়ালার বানিঃ
قُل إِن كُنتُم تُحِبّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعوني يُحبِبكُمُ اللَّهُ وَيَغفِر لَكُم ذُنوبَكُم وَاللَّهُ غَفورٌ رَحيمٌ
বল, ‘যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস, তাহলে আমার অনুসরণ কর, আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’।(সুরা আলে ইমরানঃ ৩১)
আমরা মুসলমান। আমাদের ধর্ম ইসলাম। আমাদের প্রভূ একমাত্র আল্লাহ। আমরা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.) এর উম্মাত। আমাদের কর্তব্য হলো রাসূল (সা.) এর আদেশ-নিষেধ মেনে চলা। তাঁর অনুসরণ-অনুকরণ করা। তাঁর সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা। তাঁকে জান-প্রাণ দিয়ে ভালোবাসা। আল্লাহ তা’লা কুরআনের একাধিক আয়াতে রাসূল (সা.) কে সৃষ্টিজগতের সবার চেয়ে বেশি ভালোবাসতে বলেছেন।
আল্লাহ তা’লা বলেন, ‘নবী মুমিনদের কাছে তাদের নিজেদের চেয়েও অধিক ঘনিষ্ঠ।’ (সূরা আল আহযাব: ৬)
আলোচ্য প্রবন্ধে কয়েকটি পর্বে রাসুল সঃ এর প্রতি ভালবাসা প্রকাশ করার গুরুত্ব এবং রাসুল (সা.) এর অবমাননার পরিণাম ও শাস্তি সম্পর্কে সবিস্তারে আলোচনা করার চেস্টা করব ইনশা আল্লাহ।
১ম পর্বঃ
★একে অপরের প্রতি ভালবাসার ধরনঃ
ওলামায়ে কেরামগণের প্রসিদ্ধ মতে ভালোবাসা দুই ধরনেরঃ
১.মুহাব্বতে তবাঈ তথা সৃস্টিগত বা স্বভাবগত।
২.মুহাব্বতে আকলি তথা বিবেচনা প্রসূত।
★তবঈ তথা সৃষ্টিগত বা অভ্যাসগত ভালবাসাঃ
যেমন_মানুষ সৃষ্টিগতভাবেই তার মা-বাবা, সন্তান-সন্ততি, ভাইবোন, স্ত্রী ও স্বজনদের ভালোবাসে। এ ভালোবাসাকে মানুষ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
★মহান আল্লাহ একাধিক স্ত্রীর প্রতি ইনসাফের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, 'আর যদি তোমাদের আশঙ্কা হয় যে একাধিক স্ত্রীর মধ্যে সমতা রক্ষা করতে পারবে না, তাহলে তোমাদের জন্য একটা স্ত্রী গ্রহণ করাই অনুমোদিত' (সুরা নিসা, আয়াত-৩)।
★মানুষ বাহ্যিক বিষয়ে সমতা বিধান করতে পারে, কিন্তু অন্তরের স্বভাবজাত ভালোবাসাকে নিয়ন্ত্রণ বা বণ্টনের ক্ষমতা মানুষের নেই। রাসুলে করিম (সা.)-এর হৃদয়ও হজরত আয়শা (রা.)-এর প্রতি বেশি অনুরক্ত ছিল। তাই তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন, 'হে আল্লাহ! আমি আমার সাধ্য অনুযায়ী স্ত্রীদের মধ্যে অধিকার বণ্টন করেছি; কিন্তু যে বিষয়টি আমার আয়ত্তে নয় (অন্তরের ভালোবাসা), যা তোমার কর্তৃত্বাধীন, সে বিষয়ে তুমি আমাকে পাকড়াও করো না' (তিরমিজি, আবু দাউদ, ইবনে মাজা, নাসাঈ)। যেহেতু স্বভাবজাত বা প্রকৃতিগত ভালোবাসা মানুষের নিয়ন্ত্রণাধীন নয়, সেহেতু ওলামায়ে কেরামের অভিমত হলো, এটি ইমানের জন্য শর্তায়িত নয়।
★ আকলি বা বিবেচনাপ্রসূত ভালবাসাঃ
মানুষ তার জ্ঞানের আলোকে নির্বাচিত উত্তম জিনিসকে ভালোবাসে। এটা মানুষের ইচ্ছাধীন। আর এ ধরনের ভালোবাসাই ইমানের জন্য শর্তায়িত। বিবেচনা ও জ্ঞান দ্বারা নির্বাচনের ক্ষেত্রে শুধু মা-বাবা, সন্তান-সন্ততি আর অপরাপর মানুষ থেকেই নয়, বরং নিজের জীবনের চেয়েও যদি রাসুল (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসাকে অগ্রাধিকার দেওয়া না যায়, তাহলে ইমানদার হওয়া যাবে না।
★ইমাম আহমাদ (রহ.) বলেন, জুহরা ইবনে মা'বাদ স্বীয় পিতামহ থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন
كُنّا مَعَ النّبِيِّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ وَهُوَ آخِذٌ بِيَدِ عُمَرَ بْنِ الخَطّابِ، فَقَالَ لَهُ عُمَرُ: يَا رَسُولَ اللهِ، لَأَنْتَ أَحَبّ إِلَيّ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ إِلّا مِنْ نَفْسِي، فَقَالَ النّبِيّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ: لاَ، وَالَذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، حَتّى أَكُونَ أَحَبّ إِلَيْكَ مِنْ نَفْسِكَ، فَقَالَ لَهُ عُمَرُ: فَإِنّهُ الآنَ، وَاللهِ، لَأَنْتَ أَحَبّ إِلَيّ مِنْ نَفْسِي، فَقَالَ النّبِيّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ: الآنَ يَا عُمَرُ!
একদিন আমরা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ছিলাম। নবীজী ওমর রা.-এর হাত ধরা ছিলেন। ওমর রা. বলে উঠলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি আমার কাছে সবকিছু থেকে প্রিয়, তবে আমার জান ছাড়া। তখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না ওমর, এতে হবে না। যে সত্তার হাতে আমার জান তাঁর কসম! (ততক্ষণ পর্যন্ত তুমি পূর্ণাঙ্গ মুমিন হতে পারবে না,) যতক্ষণ না আমি তোমার কাছে তোমার জানের চেয়েও প্রিয় না হই। পরক্ষণেই ওমর রা. বললেন, হাঁ এখন তা হয়েছে; আল্লাহর কসম! (এখন থেকে) আপনি আমার কাছে আমার জানের চেয়েও প্রিয়। তখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হাঁ ওমর! এখন হয়েছে। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৬৩২).... চলবে……..
২য় পর্বঃ
★রাসুল সঃ এর প্রতি ভালবাসার গুরুত্বঃ
রাসুল সঃ এর প্রতি ভালবাসা প্রকাশের গুরুত্ব সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হলো।
১.রাসুল (সঃ) কে ভালবাসা ইমানের অঙ্গঃ
রাসুল (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা ইমানের অংশ
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ভালোবাসার কারণেই মহান আল্লাহ সমগ্র বিশ্বজগৎ সৃষ্টি করেছেন।যাঁর ভালোবাসায় মহান সৃষ্টি মুগ্ধ, যাঁর ভালোবাসা জগৎ সৃষ্টির উৎস, সেই মহামানবের প্রতি ভালোবাসা না থাকলে যে ইমান থাকে না, এটা অত্যন্ত স্বাভাবিক কথা।মানুষ একে অপরকে ভালোবাসে হৃদয়ে ও বিশ্বাসে। যার প্রতিচ্ছবি দেখা যায় তার আচার-আচরণ ও কাজ-কর্মে। নবী (সা.)-কে ভালোবাসলে আমাদের আচার-আচরণ ও সংস্কৃতিতে তাঁর প্রতিচ্ছবিই প্রস্ফুটিত হতে হবে। রাসূলের কল্পনা করলে অন্তর যেন খুশি হয়, তাঁর আলোচনা আত্মার জন্য খাদ্য হয়, জবান স্বাদ ও আনন্দ হাসিল করে এবং তাঁর মোবারক নাম দ্বারা অন্তর যেন প্রশান্তি লাভ করে।আর সে জন্যই হাফিজে হাদিস হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম বুখারি (রা.) সহিহ বুখারিতে একটি অধ্যায়ের শিরোনাম দিয়েছেন, 'হুব্বুর রাসুলি মিনাল ইমান' অর্থাৎ রাসুলের প্রতি ভালোবাসা ইমানের অংশ। আলোচ্য শিরোনামের অধীনে ইমাম বোখারি (রা.) যে হাদিসটি উল্লেখ করেছেন,-
قَالَ النّبِيّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ: لاَ يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ، حَتّى أَكُونَ أَحَبّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنّاسِ أَجْمَعِينَ.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি ও সমস্ত মানুষ থেকে প্রিয় হব। সহীহ বুখারী, হাদীস ১৫
★যেসব ইমানের দাবিদার রাসুল (সা.)-এর ভালোবাসাকে তাদের জীবনে সর্বোচ্চ পর্যায়ে অগ্রাধিকার দিতে ব্যর্থ, মহান আল্লাহ তাদের প্রতি ধমকের সুরে বলেছেন, হে নবী! আপনি তাদের বলে দিন, যদি তোমাদের পিতৃপুরুষরা, তোমাদের পুত্রসন্তানরা, তোমাদের ভাইরা, তোমাদের জ্ঞাতি-গোষ্ঠী, তোমাদের উপার্জিত সম্পদ এবং তোমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য, যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয়ে তোমরা শঙ্কিত আর তোমাদের বাসস্থানগুলো, যার সৌন্দর্য তোমাদের আকৃষ্ট করে_এগুলো তোমাদের কাছে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল অপেক্ষা এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের চেয়ে বেশি প্রিয় হয়, তাহলে তোমরা অপেক্ষা করো আল্লাহর নির্দেশ আসা পর্যন্ত। আর আল্লাহ ফাসিক লোকদের হেদায়েত দেন না'।( সুরা তওবা, আয়াত-২৪)
আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের চেয়ে পার্থিব কোনো কিছুকে যারা বেশি ভালোবাসে, তাদের ফাসিক বলা হয়েছে। আর এর পরিণতি যে অত্যন্ত ভয়াবহ সে বিষয়ে হুঁশিয়ার করে দেওয়া হয়েছে।
★মহান আল্লাহ আরো ইরশাদ করেছেন,
হে নবী, আপনি বলে দিন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবেসে থাকো, তাহলে আমাকে অনুসরণ করো। তাহলেই আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন'
( সুরা আলে ইমরান, আয়াত-৩১)
২.নবীজীর প্রতি ভালবাসা মুমিনের সম্বলঃ
মুমিনের সবচে বড় দৌলত ঈমান। এই মহা দৌলতের স্বাদ যার নসীব হয়, সমস্ত দুঃখ কষ্ট তার কাছে তুচ্ছ মনে হয়।আর এই স্বাদ সে-ই পায়, যার নিকট আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভালোবাসা সমস্ত কিছুর ঊর্ধ্বে থাকে।
★হযরত আনাস রা. হতে বর্ণিত এক হাদীসে এসেছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন
ثَلَاثٌ مَنْ كُنّ فِيهِ وَجَدَ بِهِنّ حَلَاوَةَ الْإِيمَانِ: مَنْ كَانَ اللهُ وَرَسُولُهُ أَحَبّ إِلَيْهِ مِمّا سِوَاهُمَا...
অর্থাৎ, তিনটি গুণের অধিকারী ব্যক্তি ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করবে। তন্মধ্যে প্রথম হল, যার কাছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সবচেয়ে প্রিয় হবে। সহীহ মুসলিম, হাদীস ৬৭
৩.রাসুল সঃ কে ভালবাসার মাধ্যমে পরকালে মহাসাফল্য পাওয়া যায়ঃ
নবীজীর প্রতি ভালবাসা যেমনিভাবে ঈমান ও আমলে উৎকর্ষ লাভের উপায়, তেমনি তা আখিরাতে মহাসাফল্য অর্জনের সম্বল। আর প্রত্যেক মুমিনের কাঙ্ক্ষিত সে সাফল্য হল আখিরাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গলাভ। স্বয়ং নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে গেছেন
المَرْءُ مَعَ مَنْ أَحَبّ
অর্থাৎ, ব্যক্তি যাকে ভালবাসে তার সাথেই তার হাশর হবে। (সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৬৪০)
★এ সম্পর্কে বড়ই শিক্ষণীয় ও চমৎকার একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন হযরত আনাস রা.। তিনি বলেছেন
جَاءَ رَجُلٌ إِلَى رَسُولِ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَمَ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللهِ مَتَى السّاعَةُ؟ قَالَ: وَمَا أَعْدَدْتَ لِلسّاعَةِ؟ قَالَ: حُبّ اللهِ وَرَسُولِهِ، قَالَ: فَإِنّكَ مَعَ مَنْ أَحْبَبْتَ.
قَالَ أَنَسٌ: فَمَا فَرِحْنَا، بَعْدَ الْإِسْلَامِ فَرَحًا أَشَدّ مِنْ قَوْلِ النّبِيِّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَمَ: فَإِنّكَ مَعَ مَنْ أَحْبَبْتَ.
قَالَ أَنَسٌ: فَأَنَا أُحِبّ اللهَ وَرَسُولَهُ، وَأَبَا بَكْرٍ وَعُمَرَ، فَأَرْجُو أَنْ أَكُونَ مَعَهُمْ، وَإِنْ لَمْ أَعْمَلْ بِأَعْمَالِهِمْ.
অর্থাৎ, এক ব্যক্তি রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করল : ইয়া রাসূলাল্লাহ! কিয়ামত কবে? তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন, কী প্রস্তুতি নিয়েছ কিয়ামতের? সে জবাব দিল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভালবাসা। তখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘নিশ্চয়ই যাকে তুমি ভালবাস, (কিয়ামতের দিন) তার সাথেই থাকবে।
হযরত আনাস রা. বলেন, ইসলাম গ্রহণের পর আমাদের কাছে সবচে’ খুশির বিষয় ছিল নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই কথাÑ ‘নিশ্চয়ই যাকে তুমি ভালবাস, (কিয়ামতের দিন) তার সাথেই থাকবে।’
আনাস রা. বলেন, আর আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসি। আবু বকর ও উমরকেও। তাই আশা রাখি, আখেরাতে আমি তাঁদের সাথেই থাকব, যদিও তাঁদের মতো আমল আমি করতে পারিনি। (সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৬৩৯)
৪.আনুগত্যই ভালবাসার দাবিঃ
ভালবাসার সারকথাই হচ্ছে, আমি যাকে ভালবাসি তাঁর চিন্তা-চেতনা, চাওয়া-পাওয়ার সাথে একাত্ম থাকা। রুওয়াইম ইবনে আহমাদ আল বাগদাদী রাহ. মহব্বতকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন,ভালোবাসা হল প্রেমাষ্পদের সাথে সর্বাবস্থায় একাত্ম থাকা।
৫.দরূদ পাঠ ভালবাসার প্রকাশ
স্বীকৃত বাস্তবতা হল
من أحب شيئا أكثر ذكره.
অর্থাৎ, যে যাকে ভালোবাসে সে তার কথা বেশি বলে। বারবার তার আলোচনা করতে থাকে।
সুতরাং নবীপ্রেমিকের কাজই হবে তাঁর আনুগত্য, আর শ্বাস-প্রশ্বাস হবে তাঁর প্রতি দরূদ পাঠ। সে যত বেশি তাঁর স্মরণ করবে ততই তার অন্তরে তাঁর প্রতি মহব্বতের প্লাবন হতে থাকবে। ইবনুল কায়্যিম রাহ. দরূদের সুফল বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন
أنها سبب لدوام محبته للرسول صلى الله عليه وسلم وزيادتها وتضاعفها
অর্থাৎ, দরূদপাঠ হল ইশকে রাসূলের স্থায়িত্ব ও প্রবৃদ্ধির কারণ।
তাছাড়া দরূদ পাঠ তো এমনিতেই অনেক সাওয়াব ও ফযিলতের বিষয়। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে মুমিনদেরকে দরূদ পাঠের আদেশ করে বলেছেন
إِنَّ اللهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا .
অর্থাৎ নিশ্চয়ই আল্লাহ ও ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি বিশেষ রহমত নাযিল করেন এবং তাঁর জন্য রহমতের দুআ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি অধিক পরিমাণে সালাত ও সালাম পেশ কর। (সূরা আহযাব ৩৩ : ৫৬) ……. চলবে…...
৩য় পর্বঃ
★রাসুল সঃ এর প্রতি সাহাবায়ে কেরামের (রাঃ) ভালবাসার উদাহারনঃ
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভালবাসার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত ছিলেন সাহাবায়ে কেরাম রিযওয়ানুল্লাহি তাআলা আলাইহিম আজমাঈন। তাঁরা সত্যিকারের নবীপ্রেমের বেনজীর দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন।
★হযরত আবু সুফিয়ান রা. ইসলাম গ্রহণের আগেই এই স্বীকারোক্তি দিয়েছেন,
ما رأيت من الناس أحدا يحب أحدا كحب أصحاب محمد صلى الله عليه وسلم محمدا
অর্থাৎ, আমি কাউকে এতটা ভালবাসতে দেখিনি, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর সঙ্গীরা যতটা ভালবাসে। (সীরাতে ইবনে হিশাম ২/১৭২; আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া ৪/৬৫)
★এমনিভাবে হযরত উরওয়া ইবনে মাসঊদ রা. ইসলাম গ্রহণের আগে হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় মুশরিকদের পক্ষ হয়ে কথা বলতে এসেছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার পর তিনি নিজ কওমের নিকট এই অনুভূতি পেশ করেছিলেন
وَاللهِ لَقَدْ وَفَدْتُ عَلَى المُلُوكِ، وَوَفَدْتُ عَلَى قَيْصَرَ، وَكِسْرَى، وَالنّجَاشِيِّ، وَاللهِ إِنْ رَأَيْتُ مَلِكًا قَطّ يُعَظِّمُهُ أَصْحَابُهُ مَا يُعَظِّمُ أَصْحَابُ مُحَمّدٍ مُحَمّدًا، وَاللهِ إِنْ تَنَخّمَ نُخَامَةً إِلّا وَقَعَتْ فِي كَفِّ رَجُلٍ مِنْهُمْ، فَدَلَكَ بِهَا وَجْهَهُ وَجِلْدَهُ، وَإِذَا أَمَرَهُمْ ابْتَدَرُوا أَمْرَهُ، وَإِذَا تَوَضَأَ كَادُوا يَقْتَتِلُونَ عَلَى وَضُوئِهِ.
অর্থাৎ, আমি অনেক রাজা বাদশাহদের কাছে প্রতিনিধি হয়ে গিয়েছি। কায়সার কিসরা ও নাজাশীর কাছেও গিয়েছি। আল্লাহর কসম! মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে তার সঙ্গীরা যেভাবে ভক্তি করে সেভাবে আমি আর কাউকে দেখিনি তাদের বাদশাহকে ভক্তি করতে। আল্লাহর কসম! তিনি থুথু ফেললেই তাদের কেউ না কেউ তা হাতে নিয়ে নেয় এবং তা চেহারায় ও শরীরে মাখে। তিনি যখন তাদেরকে আদেশ করেন তখন তারা তাঁর আদেশ পালনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আর যখন তিনি অযু করেন তখন তাঁর ওযুতে ব্যবহৃত পানি পাওয়ার জন্য লড়াই করার উপক্রম হয়। (সহীহ বুখারী, হাদীস ২৫৮১)
★হযরত আনাস রা. বলেন,
لَقَدْ رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ وَالْحَلّاقُ يَحْلِقُهُ، وَأَطَافَ بِهِ أَصْحَابُهُ، فَمَا يُرِيدُونَ أَنْ تَقَعَ شَعْرَةٌ إِلّا فِي يَدِ رَجُلٍ
অর্থাৎ, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছি, তাঁর চুল মুবারক মুন্ডন করা হচ্ছে আর তাঁর সাহাবীরা তাঁকে ঘিরে আছে। তাঁরা চাইছিলেন তাঁর একটি চুলও যেন মাটিতে না পড়ে। বরং কারো না কারো হাতেই পড়ে। (সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৩২৫)
★হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. মৃত্যুশয্যায় আয়েশা সিদ্দীকা রাযিয়াল্লাহু আনহাকে জিজ্ঞাসা করলেন
فِي أَيِّ يَوْمٍ تُوُفِّيَ رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ؟ قَالَتْ: يَوْمَ الِاثْنَيْنِ، قَالَ: فَأَيّ يَوْمٍ هَذَا؟ قَالَتْ: يَوْمُ الِاثْنَيْنِ، قَالَ: أَرْجُو فِيمَا بَيْنِي وَبَيْنَ اللّيْلِ.
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন্ দিন ইন্তেকাল করেছেন? আয়েশা রা. জানালেন, সোমবার। তিনি বললেন, আজ কী বার? জবাব দিলেন, সোমবার। তখন তিনি বললেন, হায় যদি আমার মওত রাতের আগেই হতো! (সহীহ বুখারী, হাদীস ১৩৮৭)
★হযরত আম্র ইবনুল আস রা. মৃত্যু শয্যায় বলেছেন
وَمَا كَانَ أَحَدٌ أَحَبّ إِلَيّ مِنْ رَسُولِ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ، وَلَا أَجَلّ فِي عَيْنِي مِنْهُ، وَمَا كُنْتُ أُطِيقُ أَنْ أَمْلَأَ عَيْنَيّ مِنْهُ إِجْلَالًا لَهُ، وَلَوْ سُئِلْتُ أَنْ أَصِفَهُ مَا أَطَقْتُ؛ لِأَنِّي لَمْ أَكُنْ أَمْلَأُ عَيْنَيّ مِنْهُ.
এই পৃথিবীতে আমার কাছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই-এর চেয়ে অধিক প্রিয় ও মহান আর কেউ নেই। আমার হৃদয়ে তাঁর সম্মান ও মর্যাদার এ অবস্থা ছিল যে, আমি তাঁর দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারতাম না। আমাকে যদি তাঁর দেহাবয়বের বর্ণনা দিতে বলা হয়, আমি পারব না। কারণ, আমি দুচোখ ভরে তাঁকে দেখতে পারিনি। (সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৯২)
★হযরত জাবের রা. বলেন, উহুদ যুদ্ধের সময় রাতে আমার আব্বা আমাকে ডেকে বললেন
مَا أُرَانِي إِلّا مَقْتُولًا فِي أَوّلِ مَنْ يُقْتَلُ مِنْ أَصْحَابِ النّبِيِّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ، وَإِنِّي لاَ أَتْرُكُ بَعْدِي أَعَزّ عَلَيّ مِنْكَ، غَيْرَ نَفْسِ رَسُولِ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ.
আমার প্রবল ধারণা, আমি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গীদের মধ্যে আগেভাগেই শহীদ হবো। আর আমি তোমাকেই সবচেয়ে প্রিয় হিসেবে রেখে যাচ্ছি, তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাড়া (কারণ, তিনিই আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয়)। (সহীহ বুখারী, হাদীস ১৩৫১)
★এই উহুদ যুদ্ধেরই ভয়াবহ মুহূর্তে আরেক সাহাবী হযরত আবু তালহা রা. নিজে ঢাল হয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর আক্রমণ প্রতিহত করছিলেন। একপর্যায়ে যখন নবীজী উঁকি দিয়ে দেখতে উদ্যত হলেন তখন আবু তালহা রা. বলে উঠলেন
يَا نَبِيّ اللهِ، بِأَبِي أَنْتَ وَأُمِّي، لاَ تُشْرِفْ يُصِيبُكَ سَهْمٌ مِنْ سِهَامِ القَوْمِ، نَحْرِي دُونَ نَحْرِكَ.
ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমার মা-বাবা আপনার জন্য কুরবান হোক! আপনি উঁকি দেবেন না; পাছে আপনার গায়ে কোনো তীর এসে লাগে। আমার বুক আপনার জন্য উৎসর্গিত। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৩৮১১)
★এ বিষয়ে হিজরতের সফরে গারে সওরের ঘটনা বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। মক্কা থেকে পাঁচ মাইল পথ অতিক্রম করে রাতের আঁধারে মহানবী (সা.) ও তাঁর বিশ্বস্ত সঙ্গী আবু বকর সিদ্দিক (রা.) সওর পাহাড়ে পৌছলেন। পাহাড়ের জঞ্জালপূর্ণ গুহার মুখে আল্লাহর রাসুল (সা.)-কে অপেক্ষা করার মিনতি জানিয়ে আবু বকর গুহাভ্যন্তরে প্রবেশ করলেন। ভেতরকার সব জঞ্জাল পরিষ্কার করলেন। গুহার মধ্যে কিছু ছিদ্র দেখে সাপ-বিচ্ছুর গর্ত মনে করে নিজের সঙ্গে থাকা অতিরিক্ত কাপড় টুকরো করে সেগুলোর মুখ বন্ধ করলেন। কিন্তু দুটি ছিদ্র বাকি থাকতেই কাপড় শেষ হয়ে যাওয়ায় ছিদ্র দুটি নিজের গোড়ালিচাপা দিয়ে রাসুল (সা.)-কে ভেতরে আহ্বান করলেন। আল্লাহর রাসুল (সা.) ক্লান্ত শরীরে হজরত আবু বকরের বিছিয়ে দেওয়া ঊরুতে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লেন। ওদিকে গর্তের ভেতর থেকে বিষাক্ত বিচ্ছু আবু বকরের পায়ে বারবার দংশন করে চলেছে। বিষক্রিয়ায় তাঁর চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেছে। জীবন যাওয়ার উপক্রম। কিন্তু রাসুলের প্রতি গভীর ভালোবাসা, নড়াচড়া করলে প্রিয় রাসুলের ঘুম ভেঙে যাবে ভয়ে অসহ্য যন্ত্রণাসহ আবু বকর স্থির ছিলেন। কিন্তু বিষক্রিয়ার প্রাবল্যে তাঁর অজ্ঞাতে এক ফোঁটা অশ্রু রাসুলের মুখে ঝরে পড়ায় আল্লাহর হাবিবের ঘুম ভেঙে যায়। তিনি জিজ্ঞাসা করেন, 'আবু বকর, আপনি কাঁদছেন? আবু বকর জবাব দিলেন, 'ইয়া রাসুলাল্লাহ, আপনার প্রতি আমার মাতা-পিতা উৎসর্গিত হোক! আমাকে বিচ্ছু দংশন করেছে।' রাসুল (সা.) ক্ষতস্থানে থুতু লাগিয়ে দিতেই আবু বকর বিষযন্ত্রণা থেকে আরোগ্য লাভ করেন। আর আল্লাহর রাসুল তাঁর জন্য দোয়া করেন, 'আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন, মানুষ যখন আমাকে অবিশ্বাস করেছে, তখন আপনি আমাকে বিশ্বাস করেছেন; মানুষ যখন আমাকে অপদস্থ করেছে, তখন আপনি আমাকে সাহায্যে করেছেন; আপনি আমার ওপর ইমান এনেছেন, যখন মানুষ আমাকে অস্বীকার করেছে আর উদ্বিগ্ন অবস্থায় আপনি আমাকে সাহচর্য দান করেছেন' (বুখারি)।
★রাসুলের প্রতি ভালোবাসার চূড়ান্ত পরীক্ষা দিয়েছিলেন সাহাবায়ে কেরাম উহুদের যুদ্ধের সময়। মুসলমানরা যখন খালিদ ইবনে ওয়ালিদের আকস্মিক আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পড়লেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন নিরাপত্তাহীন অবস্থায়, তখন হজরত আবু দুজানা (রা.) নিজেকে ঢাল বানিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে রক্ষা করতে লাগলেন। কাফিরদের অবিরাম নিক্ষিপ্ত তীরগুলো তাঁর পিঠে বিদ্ধ হচ্ছিল, আর তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে আড়াল করে ঝুঁকে দাঁড়িয়েছিলেন। হজরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) আল্লাহর রাসুলের ওপর কাফিরদের আক্রমণ প্রতিরোধের চেষ্টা করছিলেন। হজরত সাদ বলেন, 'আবু দুজানা একটার পর একটা তীর আমাকে দিয়ে চলেছেন আর বলছেন, তুমি তীর নিক্ষেপ করতে থাকো' (সিরাতে ইবনে হিশাম)।
ঘটনার ধারাবিবরণী থেকে মনে হয়, আবু দুজানা নিজের শরীরে বিদ্ধ তীরগুলো খুলে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসকে সরবরাহ করছিলেন। রাসুলের প্রতি নিজ জীবনের চেয়ে বেশি ভালোবাসার প্রমাণ আর কী থাকতে পারে!
★উহুদের যুদ্ধ সমাপ্তির পর কাফিররা রণাঙ্গন ছেড়ে চলে যাওয়ার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) শহীদ ও আহতদের খবর নিতে লাগলেন। হজরত জায়েদ ইবনে সাবেত (রা.) বলেন, "রাসুলে করিম (সা.) আমাকে সাদ ইবনে রবির খোঁজ নিতে পাঠালেন। রাসুল (সা.) আমাকে বলে দিলেন, 'যদি সাদকে পাওয়া যায়, তাহলে তাকে আমার সালাম দেবে এবং জিজ্ঞাসা করবে, সে এখন কেমন বোধ করছে।' আমি শহীদদের লাশের মধ্যে তাকে খুঁজে পেলাম। দেখলাম তিনি মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। তাঁর শরীরে তীর, বর্শা ও তলোয়ারের সত্তরটি আঘাত লেগেছিল। আমি তাঁর কাছে গিয়ে বললাম, 'হে সাদ, আল্লাহর রাসুল আপনাকে সালাম দিয়েছেন এবং জানতে চেয়েছেন, আপনি এখন কেমন অনুভব করছেন।' হজরত সাদ ইবনে রবি (রা.) বললেন, 'আল্লাহর রাসুলকে আমার সালাম জানাবে, রাসুলকে জানাবে আমি জান্নাতের খুশবু পাচ্ছি। আমার আনসার ভাইদের বলবে, যদি তোমাদের একটি চোখের স্পন্দন বাকি থাকা অবস্থায় শত্রুরা আল্লাহর রাসুলের কাছে পৌঁছতে পারে, তাহলে আল্লাহপাকের দরবারে তোমাদের কোনো ওজর-আপত্তি কাজে আসবে না।' এ কথা বলার পরই তিনি ইন্তেকাল করেন'" (আর রাহিকুল মাখতুম)।
★মহিলা সাহাবিগণ ও রাসুলের প্রতি ভালোবাসার চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছিলেন উহুদের দিনে। ইবনে হিশাম লিখেছেন,
এক নারী সাহাবীর ঘটনা তো খবই বিস্ময়কর। উহুদ যুদ্ধেরই ঘটনা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনূ দীনারের এক নারীর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, যার স্বামী ও ভাই উহুদ যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। লোকেরা যখন তাকে সমবেদনা জানাতে গেল তখন তিনি জানতে চাইলেন, নবীজী কেমন আছেন?। তারা বলল, ভালো আছেন আলহামদু লিল্লাহ। (তাতেও তাঁর মন শান্ত হল না। বললেন,
أَرُونِيهِ حَتّى أَنْظُرَ إِلَيْهِ.
তবুও আমি নিজে দেখতে চাই; আমাকে দেখাও। অতপর যখন তাকে দেখানো হল তিনি বললেন
كُلّ مُصِيبَةٍ بَعْدَكَ جَلَلٌ.
(আল্লাহর রাসুল, আপনি নিরাপদ আছেন!) আপনার (নিরাপত্তার) পরে সমস্ত বিপদ তুচ্ছ। (দালাইলুন নুবুওয়াহ, বায়হাকী ৩/৩০২; সীরাতে ইবনে হিশাম ২/৯৯)
এভাবেই সাহাবায়ে কেরাম নিজেদের জীবনের চেয়েও আল্লাহর রাসুলকে ভালোবেসে তাঁদের ইমান পূর্ণাঙ্গ করেছিলেন।…..চলবে…….
৪র্থ পর্বঃ
★★রাসুল (সা.) কে অবমাননার পরিণাম ও তার শাস্তিঃ
রাসুল (সা.) এর অবমাননা এবং তাকে বিদ্রূপ করার অধিকার কারো নেই। যে রাসুলকে অবমাননা এবং তাকে বিদ্রূপ করবে তার পরিণাম হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। আর এ অপরাধের জন্য তাকে শাস্তিও পেতে হবে। নিম্নে রাসূলের অবমাননার পরিণাম সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো-
১. কাফের ও মুরতাদ বা ধর্মত্যাগি হয়ে যাবেঃ যে রাসূলের অবমাননা করবে সে মুরতাদ বা ধর্মত্যাগি এবং কাফির হিসেবে বিবেচিত হবে। এ বিষয়ে কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে, ‘মুনাফিকরা ভয় করে যে, তাদের বিষয়ে এমন একটি সুরা অবতীর্ণ হবে, যা তাদের অন্তরের বিষয়গুলি জানিয়ে দেবে। বল, তোমরা উপহাস করতে থাক। নিশ্চয় আল্লাহ বের করবেন, তোমরা যা ভয় করছ। আর যদি তুমি তাদেরকে প্রশ্ন কর, অবশ্যই তারা বলবে, আমরা আলাপচারিতা ও খেল-তামাশা করছিলাম। বল, আল্লাহ, তার আয়াতসমূহ ও তার রাসূলের সঙ্গে তোমরা বিদ্রূপ করছিলে? তোমরা ওযর পেশ করো না। তোমরা তোমাদের ঈমানের পর অবশ্যই কুফরি করেছ। যদি আমি তোমাদের থেকে একটি দলকে ক্ষমা করে দেই, তবে অপর দলকে আযাব দেব। কারণ, তারা হচ্ছে অপরাধী।’ (সুরা আত-তাওবাহ, আয়াত : ৬৫-৬৬)
২. দুনিয়াতে আল্লাহর লানতপ্রাপ্ত ও আখিরাতে কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হবেঃ যে রাসূলের অবমাননা করবে সে দুনিয়াতে আল্লাহর লানতপ্রাপ্ত ও আখিরাতে কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হবে। এ বিষয়ে কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয় যারা আল্লাহ্ ও তার রাসুলকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ্ তাদের প্রতি দুনিয়া ও আখিরাতে অভিসম্পাত করেন এবং তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন অবমাননাকর শাস্তি।’ (সুরা আল-আহযাব, আয়াত : ৫৭)
আর রাসুলকে অবমাননা এবং তাকে বিদ্রূপ করার মাধ্যমে তাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেওয়া হয়। এ বিষয়ে হাদীসে এসেছে, হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘এক ব্যক্তি নাসারা (খ্রিস্টান) ছিল সে ইসলাম গ্রহণ করল এবং সুরা আল-বাকারা ও আল ইমরান শিখল। সে নবী (সা.) এর নিকট কেরানীর কাজ করত। সে পুনরায় নাসারা হয়ে গেল এবং বলতে লাগল মোহাম্মদ আমি যা লিখি তাই বলে, এর বাহিরে সে আর কিছুই জানে না। এরপর সে মারা গেল, তখন তার সঙ্গীরা তাকে দাফন করল, সকালে উঠে দেখল তার লাশ বাইরে পড়ে আছে, তখন নাসারারা বলতে লাগল, মোহাম্মদের সঙ্গীরা এই কাজ করেছে; কেননা সে তাদের ধর্ম ত্যাগ করেছিল। তখন তারা আরো গভীর করে কবর খনন করে তাকে আবার দাফন করল, আবার সকালে উঠে দেখল তার লাশ বাইরে পড়ে আছে। তখন তারা বলল, এটা মোহাম্মদ এবং তার সঙ্গীদের কাজ, কেননা সে তাদের ধর্ম ত্যাগ করে এসেছিল। তখন তারা আবার আরো গভীর করে কবর খনন করল এবং তাকে দাফন করল, আবার সকালে উঠে দেখল তার লাশ আবার বাইরে পড়ে আছে, তখন তারা বুঝল, এটা কোনো মানুষের কাজ নয়, তখন তারা তার লাশ বাইরেই পড়ে থাকতে দিল।’ (বুখারী ও মুসলিম)
৩. মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হবেঃ যদি কোনো ব্যক্তি বিচারের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, সে রাসূলের অবমাননা করেছে, তবে তাকে মুরতাদ হিসেবে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে। এ বিষয়ে উম্মাতের সকল আলেম একমত হয়েছেন। কারণ, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার দ্বীন (ইসলামকে) পরিবর্তন করলো তাকে তোমরা হত্যা কর।’ (বুখারী, তিরমিযী, ১৪৫৮, আবু দাউদ: ও নাসাঈ)
★রাসুল (সা.)কে নিয়ে কটাক্ষ ও বিদ্রূপ করার কারণে একজন সাহাবী তার নিজ দাসীকেও হত্যা করেছে এবং রাসুল (সা.) জেনে খুশি হয়েছেন। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে এভাবে, হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘একজন অন্ধ ব্যক্তির একটি উম্মে ওয়ালাদ (যে দাসীর গর্ভে মালিকের সন্তান জন্মগ্রহণ করেছে) দাসী ছিল। ঐ দাসী রাসুল (সা.)কে অযথা কটূক্তি করতো। অন্ধ ব্যক্তি তাকে বিরত থাকার নির্দেশ দিতেন ও নিবৃত করার চেষ্টা করতেন। কিন্তু দাসী কিছুতেই বিরত হতো না। এক রাতে দাসী রাসুল (সা.)কে নিয়ে কটূক্তি ও গালি-গালাজ করতে লাগলো। তখন লোকটি একটি কোদাল দিয়ে তার পেটে আঘাত করলো এবং তাকে হত্যা করলো। এ অবস্থায় তার একটি সন্তান তার দু’পায়ের মাঝখানে পড়ে গেল এবং রক্তে ভিজে গেল। সকাল বেলা রাসুল (সা.) এর কাছে বিষয়টি জানানো হলে রাসুল (সা.) লোকদের জড়ো করলেন এবং ঘোষণা দিলেন, আল্লাহর কসম! যে ব্যক্তি আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ করেছে সে যেন অবশ্যই দাঁড়ায়। তার প্রতি আমারও একটি হক রয়েছে। তখন অন্ধ লোকটি কাঁপতে কাঁপতে মানুষের কাঁতার ভেদ করে রাসুল (সা.) এর কাছে গিয়ে বসে পড়লো। অতঃপর লোকটি বললো, ইয়া রাসুলাল্লাহ! ঐ ঘটনার ব্যক্তিটি আমি। আমার দাসীটি আপনাকে গালি-গালাজ করতো এবং অযথা তর্কে লিপ্ত হতো। আমি তাকে বারণ করলেও সে বারণ হতো না। তার থেকে আমার মুক্তোর মতো দু’টি ছেলে রয়েছে। তার সঙ্গে আমার দীর্ঘ দিনের সুসম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু গতরাতে সে যখন আপনাকে গালমন্দ করতে লাগলো আমি তখন তাকে একটি কোদাল নিয়ে তার পেটে আঘাত করি এবং তাকে হত্যা করি। রাসুল (সা.) উপস্থিত লোকদের বললেন, তোমরা সাক্ষি থাক! তার রক্ত মূল্যহীন ঘোষণা করা হলো (তাকে হত্যা করার জন্য হত্যাকারী অন্যায়কারী হিসেবে বিবেচিত হবে না)।’ (আবু দাউদ ৪৩৬৩, ত্বাবারানী ১১৯৮৪, বুলুগুল মারাম ১২০৪, দারাকুতনী ৮৯)
৪. শাস্তি না দিলে গোটা জাতি আল্লাহর গযবে পতিত হবেঃ রাসুলের অবমাননা করার পর যদি সামর্থ থাকার পরও শাস্তি না দেওয়া হয় তবে গোটা জাতি আল্লাহর গযবে পতিত হবে। আল-কুরআনের সুরা আন-নূরের ৬৩ নং আয়াতে এসেছে, ‘অতএব যারা তার নির্দেশের বিরুদ্ধাচরণ করে তারা যেন তাদের ওপর বিপর্যয় নেমে আসা অথবা যন্ত্রণাদায়ক আযাব পৌঁছার ভয় করে।’
৫. তার সমস্ত আমল বরবাদ হয়ে যাবেঃ যারা রাসুলের অবমাননার কাজে জড়িত থাকবে তাদের সমস্ত আমল বরবাদ হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যে তোমাদের মধ্য থেকে তার দ্বীন থেকে ফিরে যাবে, অতঃপর কাফির অবস্থায় মৃত্যু বরণ করবে, বস্তুত এদের আমলসমূহ দুনিয়া ও আখিরাতে বিনষ্ট হয়ে যাবে এবং তারাই আগুনের অধিবাসী।’ (সুরা আল-বাকারাহ, আয়াত : ২১৭)....চলবে…...
৫ম ও শেষ পর্বঃ
★★রাসুল সঃ এর অবমাননায় আমাদের করণীয়ঃ
রাসুল (সা.) কে নিয়ে কটাক্ষ ও বিদ্রূপ করার মত জঘন্য অপরাধ সংগঠিত হওয়ার পর নিশ্চুপ থাকার কোনো সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে একজন ঈমানদার বান্দাহ হিসেবে প্রত্যেকরই যোগ্যতা অনুযায়ী ভূমিকা রাখতে হবে। যেসব করণীয় রয়েছে সেগুলো হলো :
১. প্রতিবাদ করাঃআমাদের প্রধান করণীয় হলো:- যারা রাসুলের অবমাননা করে তাদের বিরুদ্ধে সামর্থ অনুযায়ী প্রতিবাদ করা। একজন মুসলিম কখনও এমন হতে পারে না যে, সে মহানবীর অবমাননা হওয়ার কথা জানার পরও নিশ্চুপ বসে থাকবে। কেননা এটি একটি মহা অন্যায় কাজ। আর ঈমানের লক্ষণ হলো অন্যায়ের প্রতিবাদ করা।
*মহান আল্লাহ আল কুরআনে ইরশাদ করছেন, ‘আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা একে অপরের বন্ধু, তারা ভাল কাজের আদেশ দেয় আর অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করে।’ (সুরা আত-তাওবাহ, আয়াত : ৭১)
*হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘আমি রাসুল (সা.)কে বলতে শুনেছি, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কোনো অন্যায় কাজ হতে দেখে, তবে সে যেন তা নিজের হাত দ্বারা পরিবর্তন করে দেয়। আর যদি সে সক্ষম না হয়, তাহলে সে যেন মুখ দ্বারা প্রতিহত করে। আর যদি সে এতেও সক্ষম না হয়, তাহলে সে যেন অন্তর দিয়ে তা প্রতিহত করার চেষ্টা করে। আর এটা সবচেয়ে দুর্বল ঈমানের পরিচয়।’ (মুসলিম: ১৮২)
২. শাস্তির ব্যবস্থা করাঃ মহানবীর সঃ অবমাননাকারীদের বিচারের মাধ্যমে শাস্তির ব্যবস্থা করা ঈমানের দাবি। এক শ্রেণীর নামধারী মুসলিম তারা বলে এ বিচার আল্লাহ করবেন, অতএব আমাদের কিছুই করার দরকার নেই। ঈমানদার হিসেবে এ ধরণের কথা বলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা রাসুল নিজেই তাকে অবমাননা করার শাস্তি কার্যকর করেছেন এবং সাহাবায়ে কিরামও তা বাস্তবায়ন করেছেন। তাই যে মহানবীর অবমাননা করে তাকে দুনিয়াতেই শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
*ইবনে খাতাল রাসূলের প্রতি কটূক্তি করেছিল, সেজন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে হত্যা করার নির্দেশ দিলেন। এ বিষয়ে হাদীসে এসেছে, হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) মক্কা বিজয়ের দিন মক্কায় প্রবেশ করে মাত্র মাথায় যে হেলমেট পরা ছিল তা খুললেন, এমতাবস্থায় এক ব্যক্তি এসে বললো, ইবনে খাতাল (বাঁচার জন্য) কাবার গিলাফ ধরে ঝুলে আছে। রাসুল (সা.) বললেন, (ঐ অবস্থায়ই) তাকে হত্যা করো।’ (বুখারী ১৮৪৬, মুসলিম ৩৩৭৪)
৩. জাতিকে সতর্ক করাঃ মহানবীর অবমাননা করার ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে জাতিকে সতর্ক করা সময়ের দাবী। কেননা জেনে-না জেনে, বুঝে-না বুঝে নানানভাবে মহানবীর অবমাননা করা হচ্ছে। এর কারণে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসবে। সেজন্য আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত জাতিকে সতর্ক করা। আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে বলেন, ‘আর তোমার পূর্বেও অনেক রাসুলকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা হয়েছিল, পরিণামে তারা যা নিয়ে ঠাট্টা করত তাই বিদ্রূপকারীদেরকে ঘিরে ফেলেছিল।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত : ৪১)
‘বরং আমি মিথ্যার উপর সত্য নিক্ষেপ করি, ফলে তা মিথ্যাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয় এবং নিমিষেই তা বিলুপ্ত হয়। আর তোমাদের জন্য রয়েছে দুর্ভোগ তোমরা যা বলছ তার জন্য।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত : ১৮)
৪. ঐক্যবদ্ধ হওয়াঃ রাসুলের অবমাননা বন্ধে ঈমানদার ব্যক্তিদের মধ্যে কোনো বিরোধ থাকতে পারবে না। তাই সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। নিজেদের মধ্যে কর্মপন্থা নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। কিন্তু রাসূলের অবমাননার মত ভয়াবহ পরিস্থিতিতে ঐক্যবদ্ধভাবে কর্মসূচি পালনে কোনো ধরণের সংশয় রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না। কারণ এ বিষয়ে কুরআন মাজীদে ঘোষণা এসেছে এভাবে, ‘আর তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা বিভক্ত হয়েছে এবং মতবিরোধ করেছে তাদের নিকট স্পষ্ট নিদর্শনসমূহ আসার পর। আর তাদের জন্যই রয়েছে কঠোর আযাব।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১০৫)
৫. আল্লাহর নিকট বেশি বেশি ক্ষমা চাওয়াঃ রাসুলের অবমাননা করার কারণে যে কোনো স