24/08/2026
পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে এবং বাংলাদেশের বৌদ্ধ সমাজে এমন কিছু ব্যক্তিত্বের জন্ম হয়েছে, যাঁরা নিজেদের কর্ম ও ত্যাগের মাধ্যমে যুগ যুগ ধরে অমর হয়ে থাকেন। তাঁদেরই একজন পরম শ্রদ্ধেয় পরম পূজনীয় মহাপুণ্যবান 'গুরুভন্তে' (শ্রীমৎ উ পঞ্ঞা জোত মহাথের)।তাঁর পবিত্র জীবনী এবং আদর্শ আজীবন মানুষকে সৎ ও ধর্মের পথে চলার অনুপ্রেরণা যোগায়। আসুন, এই মহান মহানপুণ্যবান সত্ত্বার জীবনগাথা সংক্ষেপে জেনে নিই এবং নিজেদের জীবনকে ধন্য করি।
👑 রাজকীয় বংশ পরিচয় ও পারিবারিক ইতিহাস:
গুরুভন্তে ১৯৫৫ সালের ২২ ডিসেম্বর বান্দরবানের ঐতিহ্যবাহী মারমা জাতির রাজকীয় বোমাং পরিবারে (Bohmong Royal Family) জন্মগ্রহণ করেন। সন্ন্যাস ধর্ম গ্রহণের পূর্বে রাজপরিবারে তাঁর নাম ছিল উ চ হ্লা (U Cho Hla)। বোমাং রাজবংশ পার্বত্য অঞ্চলের অন্যতম সম্মানিত ও প্রাচীন রাজপরিবার। এমন এক রাজকীয় আভিজাত্য, ক্ষমতা আর বৈভবের মধ্যে তাঁর বড় হয়ে ওঠা, যেখানে সমস্ত পার্থিব সুখ তাঁর হাতের মুঠোয় ছিল।
👦 শৈশব ও মেধার স্ফুরণ:
ছোটবেলা থেকেই উ চ হ্লা ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, শান্ত এবং সংস্কৃতিমনা। রাজপরিবারের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বজায় রেখে তিনি মাত্র ২০ বছর বয়সে (১৯৭৫ সালে) মারমা জাতির বর্ষবরণ উৎসবের কালজয়ী গান ‘সাংগ্রাইমা’ (Shangraima) রচনা ও সুর করেন, যা আজও মারমা জাতির সংস্কৃতির প্রাণ। তরুণদের সংস্কৃতিমুখী করতে তিনি ‘দ্য রয়্যাল আর্টিস্টস গ্রুপ’ নামে একটি মিউজিক ব্যান্ডও গঠন করেছিলেন।
🎓 অনন্য শিক্ষাজীবন:
পাহাড়ের প্রাথমিক গণ্ডি পেরিয়ে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য রাজধানীতে আসেন। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর আইন বিভাগ থেকে তিনি অত্যন্ত সফলতার সাথে স্নাতক (LLB) এবং স্নাতকোত্তর (LLM) ডিগ্রি অর্জন করেন।
💼 গৌরবময় কর্মজীবন:
শিক্ষা জীবন শেষে তিনি বিসিএস (BCS) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং ১৯৮৩ সালে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকারের সহকারী বিচারক ও ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে বিচার বিভাগে যোগ দেন। চট্টগ্রামের হাটহাজারী আদালতসহ বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘ ৮ বছর অত্যন্ত সততা, নিষ্ঠা ও সুনামের সাথে তিনি বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন।
🌟 কেন তিনি রাজকীয় সুখ ও চাকরি ছেড়ে ধর্ম প্রচারে নামলেন?
বাইরে থেকে একজন সফল বিচারক এবং রাজপুত্র মনে হলেও, উ চ হ্লা-এর মনে ভেতরে চলছিল আত্মিক মুক্তির তীব্র আকুলতা। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, জাগতিক আইন দিয়ে মানুষের সাময়িক বিচার করা সম্ভব হলেও মানুষের ভেতরের দুঃখ, লোভ ও হিংসার চিরতরে অবসান সম্ভব নয়। মানুষের দুঃখ মুক্তি এবং বুদ্ধের অহিংস বাণীকে সমাজ ও বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার তীব্র বাসনা থেকে ১৯৯০ সালে তিনি সমস্ত বিলাসবহুল জীবন, রাজকীয় আভিজাত্য এবং সম্মানজনক ম্যাজিস্ট্রেট পদ থেকে একবারে ইস্তফা দেন।
একই বছর তিনি চিংম্রং বিহারে প্রব্রজ্যা ও উপসম্পদা (বৌদ্ধ ভিক্ষু দীক্ষা) গ্রহণ করেন। সন্ন্যাস জীবনে তাঁর নাম হয় ‘উ পঞ্ঞা জোত মহাথের’।
🏛️ তাঁর নির্মিত চোখধাঁধানো স্থাপনাসমূহ:
সন্ন্যাস জীবনে এসে তিনি পাহাড়ের বুকে বৌদ্ধ স্থাপত্যের এক অনন্য বিপ্লব ঘটান, যা আজ আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে জায়গা করে নিয়েছে-
বান্দরবানের বিশ্বখ্যাত বুদ্ধ ধাতু জাদি (Golden Temple) —
এটি বাংলাদেশে সর্বাপেক্ষা বড় একটি হীনযান বৌদ্ধ তীর্থস্থান। সুউচ্চ ও দৃষ্টিনন্দন রামা জাদি এবং কিয়কমলং জাদি।
বান্দরবান সদরের প্রধান সাধনা কেন্দ্র পঞ্ঞা পাসনারাম বৌদ্ধ বিহার। আন্তর্জাতিক সৌহার্দ্য বাড়াতে ১৯৯৭ সালে মিয়ানমারে প্রতিষ্ঠিত হয় 'বাংলাদেশ বৌদ্ধ বিহার'।
🏫 বৌদ্ধ সমাজ ও মানবসেবায় অনন্য অবদান:
তিনি বৌদ্ধ ধর্মের অন্ধবিশ্বাস দূর করে মানুষের কাছে বুদ্ধের বাণীর একটি বিজ্ঞানসম্মত, আধুনিক ও যৌক্তিক রূপ তুলে ধরতেন। ধর্ম ও জীবন দর্শনের ওপর তিনি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বই লিখেছেন । অবহেলিত, দরিদ্র ও অনাথ শিশুদের বিনামূল্যে আধুনিক শিক্ষা ও বাসস্থানের জন্য তিনি বান্দরবানে প্রতিষ্ঠা করেন 'Be Happy Learning Centre'।
মানবকল্যাণ ও বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় তিনি 'দ্য ওয়ার্ল্ড বৌদ্ধ শাসন সেবক সংঘ' গঠন করেন।
২০২০ সালের ১৩ এপ্রিল মাত্র ৬৪ বছর বয়সে এই মহান আধ্যাত্মিক সাধক এবং সমাজ সংস্কারক মহাপ্রয়াণ লাভ করেন। তিনি আজ আমাদের মাঝে সশরীরে নেই, কিন্তু তাঁর সুউচ্চ জাদিগুলোর চূড়া এবং লাখো মানুষের হৃদয়ে তাঁর ত্যাগ ও আদর্শ চিরকাল দীপ্তিমান থাকবে।
শ্রদ্ধেয় গুরুভন্তের পবিত্র স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও বন্দনা। 🌸🙏