Maharshi Monomohan - মহর্ষি মনোমোহন

Maharshi Monomohan - মহর্ষি মনোমোহন "সর্ব্ব ধর্স্ম সমন্বয়ে জয় দয়াময়”
"জীবাত্মা ও পরমাত্মা মিলনের নাম যোগ"

আমি চাই কি? তুমি চাও কি? সে চায় কি? আমরা চাই কি? তোমরা চাও কি? এ অকুল ভব-সাগরে এ উত্তাল তরঙ্গ কেন? ঘাত প্রতিঘাতে এত কলরব...
27/02/2026

আমি চাই কি? তুমি চাও কি? সে চায় কি? আমরা চাই কি? তোমরা চাও কি?

এ অকুল ভব-সাগরে এ উত্তাল তরঙ্গ কেন? ঘাত প্রতিঘাতে এত কলরব কেন? এত মারামারি হুড়াহুড়ি কেন? একে আরে এত বাদবিসম্বাদ কেন? এত আলোচনা কেন? এই "কি এবং কেন" এই দুই কথার উত্তর কে দিতে পারে?

​বেদ-বাইবেল কোরান-পুরান, নিখিল শাস্ত্রগ্রন্থ, বিজ্ঞান, রসায়ন, আয়ুর্ব্বেদ গভীর গবেষণা, প্রকৃতির বিস্তৃত গ্রন্থ, অধ্যাপকের অধ্যাপনা, মনস্বীর মনন, যোগীর যোগ, তপস্বীর তপ, সন্ন্যাসীর সন্ন্যাস, গৃহীর গৃহবাস, মানবের জীবন-ভরা এত অধ্যাবসায় এতকাল এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হার মানিয়া চলিয়াছে।

কই সে উত্তর? কে দিবে উত্তর? কই পাওয়া যায় সে উত্তর? জানি অনন্ত বিশ্ব এই একটি কথার লাগি ঘোরতর তাণ্ডবে আত্মহারা হইয়া নাচিতেছে আবার বলি, কই সে উত্তর? কে দিবে উত্তর?

​সসাগরা ধরার সিংহাসনাসীন রাজাধিরাজ, শুনেছি-অনন্ত ঐশ্বর্য্যের তৃপ্তি ঠেলিয়া দিয়া ঐ সে উত্তরখানা চায়, দীন হীন কাঙ্গাল অনশনে তৃণশয্যায় কেবল ঐ উত্তরখানার দিকে তাকাইয়া থাকে। তোমরা যদি কেউ জান, বল আমি কান পাতিয়া রহিয়াছি, আর সকলে উপেক্ষা করুক, শ্রবণ ভ'রে আমি শুনিব।

​কই? চাঁদও বলে না, রবিও হেসে হেসে চলে যায়, তারাও মিটি মিটি চায় পাখীগুলিও উড়ে উড়ে চলে যায়, গাছের পাতাগুলি তা-না-না-না করিয়া নড়েচড়ে, ফুলটী সে কথা বলিতে যাইয়া আপনা আপনি ফুটিয়া উঠে, আর বলিতে পারে না; নদীর জল কেবল ঢেউ খেলে, পাহাড় কেবল উঁকি মারিয়া হাবার মত চেয়ে থাকে, শিশু সে কথার লাগি মায়ের আঁচল ছাড়ে না,

রমণী স্বামীসোহাগিনী হ'তে চায়, কেউবা ঘোন্টার আড়াল হ'তে চুপি চুপি উঁকি দিয়া একে-আরে খুঁজিয়া বেড়ায়, রোগী কেবল আর্তনাদ করে, ধনী কেবল অহঙ্কারের বড়াই মারে, মা কোলের শিশু কোল হইতে নামাইতে চায় না, ফিরে ফিরে নাকে মুখে চুমু খায়;

​কি বুঝে শিশু স্তনের বাট মুখে লইয়া কখন হাসে কখন কাঁদে, আবার ঘুমের ঘোরে লুটে পড়ে; ছেলেরা ধামাল খেলায়, যুবকেরা বাবুয়ানার বাহার মারে, প্রৌঢ় হাপে ধাপে মাত্ করিয়া আপনি আপন বড় হতে চায়, বৃদ্ধ জীবনটা ভুল করিয়া বলিয়া কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া গোরুক্ টানিয়া আপ্‌প্সাস মিটায়। সে কথা কি? কি চায়? এত কেন?

​হায়! হায়! হায়! এ ছোটখাট কথা দু'টির উত্তর অভিধান ব্যাকরণে কি নাই? সাহিত্যের এত বড় কলেবরে কি নাই? বোধ করি নাই। তা' হ'লে বিদ্যাবাগীশের কঙ্কচি থামিয়া যাইত, বুদ্ধিমান বুদ্ধি হারাইত, তার্কিক স্তব্ধ হইত। কই? গোল থামে না! মূল পেলে কি আর গোল থাকে? মূল বুঝি মিলে না।

​কি মূল্যে সে মূল মিলে? জহরীর হিসাবে দাম কত টাকা? সংখ্যার বড় নয় লিখিয়া ডান দিকে অনন্তকাল কেবল শূন্য বসাইয়া দাও, এত টাকা মূল্যে কি সে মূল মিলে? যদি মিলিত, তবে আমি না পাই, তুমি না পাও, সে না পায়, মুকুটধারী পাইত। না, না, না, তার রাজকোষে কোথায় এত অর্থ, যে মূল্যে সে মূল বিকায়।

​পাগল কয়, ঐ নিশীথ কালের স্তব্ধ রাগিণীতে, ঐ দুপুর বেলার ধূ হাওয়াতে কয়, প্রভাতের ভৈরবী নিক্কণে সন্ধ্যার পূরবীতে তালে বেতালে স্পষ্ট করিয়া অস্পষ্ট স্বরে কয়, ঘুমের ঝোঁকে শিশুর চোখে কয়, যুবতীর তাম্বুলরঞ্জিত ঠোটে কয়, ঐ তার হাবভাব ভঙ্গিতে কয়, ঝিঁ ঝিঁ পোকার ক্ষীণকণ্ঠে কয়, ঐ পাগল তান্ ধরিয়া গেয়ে যায়, মানুষে তারে ভালবাসে না, ঘৃণা করে,

তাই সে ঐ দূরে গেয়ে যায়, মাঝি তরণীতে পাল খাটাইয়া অবসাদে আনন্দে ঐ রাগিনী চাপিয়া চাপিয়া ধরে, কখন বা ভাটীয়াল ভাটী গাঙ্গের উজান ঢেউয়ে চেঁচাইয়া কয়, ঐ বায়ু কোণে ঝাঁ, ঝাঁ করিয়া ঘর ভাঙ্গিয়া গাছ ভাঙ্গিয়া ত্রাহি রবে কয়ে যায়, ঐ শিশু বৎস হাম্বা রবে ডেকে কয়, গাভী বাছুরের গা চাটিতে চাটিতে হাই তুলিয়া কয়, ঐ দুর্ব্বল ক্লিন্ন শীর্ণ গলটা ঝিক্ চাড়া খুঁজিতে খুঁজিতে বকাবকি করিয়া কয়।

​আরে কি কয়? কে জানে, কি কয়? আমি কি জানি? যদি কেউ ঘাতে প্রতিঘাতে আত্মহারা হইয়া সে কথা শুনিতে আকুল মনে, আকুল নয়নে তাকাইয়া থাকে, তবে সে তারে এ তারে তারহীন টেলিগ্রামে টকাটক ঠকাঠক তারের তান বাজিয়া সে গানের সুর প্রাণে লাগাইয়া যায়। সে কি? কি চাও? কি চাই? এত কেন? এ শব্দাড়ম্বরের পরিসমাপ্তি কই? কি? উত্তর নাই; এত কথা বলিতে পার? এত বিদ্যা পেটের ভিতর, হাকে ডাকে গরম ক'রে, এ বাসরে সঙ্ সেজে, ভেঙ্গে গড়ে এত হইতেছ; কিন্তু একথাটী কি? উত্তর নাই।

​ভাবিয়া দেখিলে না, শুনিয়া শুনিলে না, বুঝিয়া বুঝিলে না, কেবল ধামালে বে-সামাল বে-সামাল! বায়া ছিড়িয়া গেল, ডাহিনা বাজে না, তন্ত্রী সুর ছাড়িয়া দিল, তবু আমার ঐ কথার উত্তর হইল না। এ জগত প্রশ্নোত্তরের মাঝখানে একটি সঙ্-এর পুতুল—কেবল দোল খেলায়, আর ঘুরে মরে। হায়! হায়! হায়! কার কাছে যাব, কোথা তা'রে পাব।

এ গানের তানে যে প্রাণে প্রাণে আসমানে চড়িয়াছে, কই সে মানুষ! তোমরাত সবাই মানুষ : তোমরা এত মানুষ, তবু তালাস করতে হ'ল আমার মানুষ। তোমাদের ভারী বিরক্ত হইবার কথা। আরে! ফেলে রাখ ওসব ভ্রূকুটি, প্রাণের ভিতর যে ত্রুটি, মোটামুটি সেইটা তালাস করে দেখ দেখি! সকল খুটী নাটি হ'তে খালাস হয়ে যাবি। বেকসুর খালাস হ'তে না পারলেও পাশ কাটিয়া যেতে পারবি— যাক্ সে কথা। সে কি না জানে; কেউ কি কিছু করে? কারো প্রাণে কি প্রশ্ন না জাগে? কেউ কি তার উত্তর চায়, যে চায় সে পায়।

​শোন ঐ পাগল গায়,

পাইতে শুধু আনন্দ, জগত ভরে এত দ্বন্দ্ব,
দীনের কাছে সে ধন বন্ধ, পায় না তারে দালান কোঠায়;
মুনিমুক্তা যতই বল, শান্তি বিনা সব বিফল,
সব ছেড়ে দে হরি বল, শান্তি ফল পাবে তায়।
কুঁড়ে ঘর কি গাছের তলা, বাসা করে রও নিরালা,
একলা মনে নামের মালা জপ যেয়ে সর্ব্বদায়।
যে ধন পায়না জগত মূল্যে, সে ধন পাবে অবহেলে,
কয় মনোমোহন দীন কাঙ্গালে এমনি ভাবে দিন যেন যায়।

​উত্তর: একটি অফুরন্ত হাসি।

​_____________________________________________________________

​প্রবন্ধটি মানুষের চিরন্তন জিজ্ঞাসা "কি চাই?" এবং "কেন চাই?"
এই দুটি মৌলিক প্রশ্নের ওপর ভিত্তি করে রচিত। মহর্ষি মনোমোহন দেখিয়েছেন যে, জাগতিক সকল শাস্ত্র, বিজ্ঞান এবং সাধনা এই সহজ অথচ গভীর প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
​রাজা থেকে ভিক্ষুক, জ্ঞানী থেকে মূর্খ- সবাই এক অজানার পেছনে ছুটছে। মহর্ষি প্রকৃতির নানা উপাদানের (চাঁদ, সূর্য, নদী, পাহাড়) মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন যে, উত্তরটি প্রকৃতির পরতে পরতে থাকলেও সাধারণ মানুষ তা ধরতে পারছে না।
​মহর্ষি মনোমোহন দত্ত নিজেকে "পাগল" হিসেবে উপস্থাপন করে জাগতিক বুদ্ধিকে উপহাস করেছেন। তাঁর মতে, তথাকথিত শিক্ষিত ও বুদ্ধিমানরা পাণ্ডিত্যের অহংকারে মত্ত থাকলেও জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য বা "মূল" খুঁজে পায় না।
​প্রবন্ধের শেষে মহর্ষি মনোমোহন আধ্যাত্মিক সমাধানের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, জাগতিক ঐশ্বর্য বা মণি-মুক্তায় শান্তি নেই; শান্তি আছে নির্জনে দয়াময় হরি-নাম জপে এবং অহংকার ত্যাগে।
​প্রবন্ধের শেষে মহর্ষি মনোমোহন জীবনের সমস্ত জটিল জিজ্ঞাসার একটি মাত্র উত্তর দিয়েছেন "একটি অফুরন্ত হাসি"। এটি ইঙ্গিত করে যে, জীবনের সকল দ্বন্দ্ব ও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে উঠে পরমানন্দে নিমগ্ন হওয়াই হলো প্রকৃত প্রাপ্তি।

'আমার কথা''ময়না বা পাগলের প্রলাপ'-মহর্ষি মনোমোহন দত্ত​‘যেনাহং নামৃতা স্যাং কিমহং তেন কুৰ্য্যাম্’​আমি কি? আমি একজন মানুষ,...
26/02/2026

'আমার কথা'
'ময়না বা পাগলের প্রলাপ'
-মহর্ষি মনোমোহন দত্ত

​‘যেনাহং নামৃতা স্যাং কিমহং তেন কুৰ্য্যাম্’

​আমি কি? আমি একজন মানুষ, কিন্তু মনুষ্যত্ব আমাতে নাই। মনুষ্যত্ব লভিতে হইলে, বাহ্য শোভা চাই, ভণ্ডামি চাই, কার্য্যে ও কথায় বিভিন্ন চাই, আস্ফালন আন্দোলন চাই, অহঙ্কার চাই;

কিন্তু আমি তা পারি না, পারি না বলিয়াই মানুষ নই, মনুষ্যত্ব আমাতে নাই, আমি অপ্রকৃতিস্থ পাগল; -কিন্তু যাহারা মানুষ নামধেয়, তাহাদেরও ত প্রকৃতির স্থিতি দেখিতে পাই না,

-সংসারই অপ্রকৃতিস্থ; তাই বুঝি আপনা হইতে বিভিন্ন গুণাবলী বুঝিতে অক্ষম, এবং তাই বলিয়াই আমি পাগল।

​আমি জানি সংসার-ছায়াবাজী, জগত-মোহময় মায়া প্রহেলিকা; একা আসিয়াছি, একা যাইব, সঙ্গে কেহই যাইবে না।

আমি বুঝিয়াছি শত্রু মিত্র উভয়েরই আবশ্যকতা আছে, শুধু মিত্রের প্রয়োজনীয়তা নাই; তাই ব'লে আমি এবং আমার মত লোকগুলি মানুষ নহে, মানুষ নামধেয় জীবেরা আমায় মানুষ বলিতে ঘৃণা করে, কি করিব?

আমি বনফুল, বনে আমার জন্ম, বনেই আমি ফুটিয়াছি, বনেই অবস্থান করিতেছি; কেহ আমায় মানুষ না বলুক ক্ষতি নাই, কিন্তু আমার ঐকান্তিক কামনা, হৃদ্গত একমাত্র বাসনা, যেন বনেই আমার লয় হয়, শান্তিময়ী বনদেবীর কোলেই যেন শেষ শয্যা পতিত হয়, যেখানকার অণুপরমাণুতে আকৃতির গঠন সেখানেই যেন মিশিয়া যায়।

সংসারে এত লোক, এত ধনী, এত মানী, এত দরিদ্র, এত মূর্খ, এত জ্ঞানী, এত সুখী, এত দুঃখী, এত ছোট, এত বড়, তাহারা সকলই মানুষ, কিন্তু আমি তা নই। আমি কি? আমি অন্য কোন জীব নহি, তবে মানুষের মত মানুষ হইতে পারি নাই, তাই পাগল। কেন পাগল? না,-বুঝিয়াছি নীরব কার্য্য এখানে পণ্ডশ্রম মাত্র যে স্ফীতবক্ষে আপনার ক্ষমতা-মাহাত্ম্য প্রচার করিতে পারে সে-ই জগতে চলশক্তি সম্পন্ন, আর যে নীরব-সে মৃত।

​আমি বড় একটা হাসি না। কেন হাসি না? হাসিবার বিষয় কি আছে, যে হাসিব? কেহ হাসে কাহাকে বিরক্ত করিবার জন্য, কেহ হাসে স্বার্থপরতার দায়ে অন্যের মনস্তুষ্টির জন্য, এবম্বিধ হাসি আমি ভালবাসি না, ভাল লাগে না, তাই হাসি না। হাসি কি?

মনের কোন এক অতি উচ্চ অবস্থায় প্রকৃত হাস্যের উৎপত্তি। অর্থসংযুক্ত বদনের ভঙ্গীমাত্রই হাসি নয়; প্রকৃত হাসি আত্মার গভীরতম প্রদেশ হইতে উছলিয়া, হৃদয়-মন হাসাইয়া শিরায় শিরায় ধমনীতে ধমনীতে প্রবাহিত হয়, সে হাসি কৈ?

সে হাসির মর্ম্ম আমি বুঝি, কিন্তু হাসিতে পারি না বলিয়া নীরব থাকি, তাই আমি মানুষ-সমাজের বাহিরে-তাই আমি মানুষ নহি, মনুষ্যত্ব আমাতে নাই, আমি অপদার্থ, পাগল !!!

নিঃস্বার্থপরতাই এ সংসারে পাগলামী, তাই আমার মত লোকগুলা পাগল ও তাদের কাছে অপদার্থ। সকলেরই একটা না একটা উদ্দেশ্য আছে কিন্তু আমার তা নাই।

মানুষ স্বার্থপর, স্বার্থপরতার বীজ তাহাদের হৃদয়ের স্তরে স্তরে, প্রতি রোমকুপে, অণুপরমাণুতে অঙ্কিত, নিঃস্বার্থপরতা তাহাদের বুদ্ধির অতীত বিষয়, তাই আমি...!

আমি অপদার্থ !!
​হাঁ, তা বলেই কি, কি শিশু, কি বালক, কি যুবা, কি প্রৌঢ়, কি বৃদ্ধ-কেহ আমাকে দেখিতে পারে না আমাকে দেখিলেই তাহাদের ঈর্ষাবৃত্তিগুলি আপনাআপনিই উছলিয়া উঠে;

আমায় দেখিলে প্রকৃতির দয়িত-তনয় ক্ষুদ্র শিশুর অধর প্রান্তে একটু হাসির রেখা ফুটিয়া উঠে, সে হাত পা নাড়িয়া কত ব্যঙ্গই না করে; আমায় দেখিলে চঞ্চল বালক কত হাবভাবই না প্রকাশ করে, তাহার চঞ্চলতা শতগুণে বর্দ্ধিত হইয়া আমার পানে ধাইয়া আসে;

আমায় দেখিলে যুবার হৃদয়ে আশার উজান বয়ে যায়, সে যেন জগত-সংসার ভুলিয়া গিয়া চিন্তা রহিত চিত্তে আমোদের উচ্চ হাস্যের তরঙ্গবহুল স্রোতে ভাসিয়া যায়; আমায় দেখিলে প্রৌঢ়ের অন্তরে ঘৃণার সঞ্চার হয়;

সে প্রবঞ্চনা, প্রতারণা, কপটতা, কত কিছু গুরুতর অভিযোগ আমার চরিত্রের বিরুদ্ধে আনয়ন করিবার প্রয়াস পাইয়া থাকে।

আমায় দেখিলে বৃদ্ধের ঈর্ষা-বহ্নি প্রজ্জ্বলিত হইয়া উঠে, সে আমার নির্ভীকতা, মৃত্যুচিন্তারহিত প্রশস্ত হৃদয় দেখিয়া- "অসারের তর্জন গর্জন সার" এই বাক্যের সার্থকতা সম্পাদন করে।

জগত-প্রকৃতির বিপরীতে আমার গতি, কাজেই আমি... অপদার্থ- "পাগল”।

​আমি পাগল! বেশ আছি। হেয় জগত প্রপঞ্চ, আমি চাহি না, ওসব বাজে কথার, অঙ্গভঙ্গী কি ভ্রূভঙ্গিতে আমি ভুলি না, সেই সকল চতুরতাকে আমি ঘৃণা করি, তাই তাহারা আমায় উপেক্ষা করে, ঠেলিয়া ফেলিয়া দিতে চায়, এবং নাসিকা কুঞ্চিত করিয়া অর্দ্ধস্ফুট স্বরে-“অপদার্থ", "পাগল” আর কত কি অভিধান ছাড়া উপাধিতে অলঙ্কৃত করিয়া দূরে সরিয়া যায়।

যাক্ ক্ষতি নাই... লোকে আমায় পাগল বলুক, আর যাই কেন না বলুক-বেশ কথা! আমিও মনকে বুঝাইয়াছি, রে মন! ভাল হওয়া বড় শক্ত কথা লোক-চক্ষুর ভালবাসা তুমি আকাঙ্ক্ষা করিও না, যত পার মন্দ হইয়া যাও-হ'তে পারলে দায় সারলে; যেহেতু জমিদার পতিত জমির খাজানা নেয় না। এই রকম বুঝিতে চাই বলিয়াই আমি... অপদার্থ, অপ্রকৃতিস্থ পাগল !!!

​পাগল! পাগল !! পাগল !!! মনেরে কথা খু'লে বলতে গেলে সংসারে সকলেই পাগল; মাতোয়ারা হইবার ত পাগলামী। তবে দেখ, -দিগন্তব্যাপী এক দৃষ্টি করিয়া ভাবিয়া দেখ, আমি যে পাগল; ভাল কে?

সবাই পাগল-কেউ রূপে পাগল, কেউ ভাবে, কেহ বা ধনে পাগল, কেহ বা মানে পাগল, কেহ বা যশের জন্য ভবের হাটের মাঝখানে উলঙ্গ নাচিয়া বেড়ায়; -সে কি পাগল নয়?

তবে তাদের পাগলামীর অর্থ আছে, উদ্দেশ্য আছে, অভিধান আছে, ব্যাকরণ আছে, আমার তো তা' নাই; আমি কতকটা অস্বভাবের পাগল বনিয়াছি, তাই সকলেই ভাল, আমি এবং আমার মত দু-দশটা লোক সংসারে সমাজে উপেক্ষণীয়, ঘৃণাস্পদ অপ্রকৃতিস্থ; অপদার্থ-পাগল !!

​এই পাগলামীই আমার সর্ব্বাংশে প্রার্থনীয় !!! অবধূত বলে, এইরূপ পাগলামী যথার্থই মঙ্গল; দয়াময়ের অপার করুণাবলে জগত পাগলে পূর্ণ হউক। -সংসারে অনুকূল প্রবাহ প্রতিকূলে ফিরিয়া গিয়া শান্তির দ্বার উদ্‌ঘাটিত হউক।

________________________________________________________________

মহর্ষি মনোমোহন দত্ত ​এক চমৎকার সত্য উন্মোচন করেছেন-
এই প্রবন্ধে তিনি পাগল' শব্দটিকে নেতিবাচক অর্থ থেকে বের করে একটি আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক উচ্চতায় স্থাপন করেছেন। তার মতে, যারা জাগতিক লোভ, লালসা, ভণ্ডামি এবং স্বার্থপরতার উর্ধ্বে, সমাজ তাদেরই 'পাগল' আখ্যা দেয়। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, সমাজের চোখে 'মনুষ্যত্ব' মানেই হলো কথা ও কাজের অমিল এবং অহংকার প্রদর্শন। যেহেতু তিনি এই কৃত্রিমতা পালনে অক্ষম, তাই তিনি সানন্দে 'পাগল' উপাধি গ্রহণ করেছেন।
প্রবন্ধে জগতকে 'ছায়াবাজী' এবং 'মায়া প্রহেলিকা' হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। লেখক মনে করেন, মানুষ একা আসে এবং একা চলে যায়। এই ধ্রুব সত্য উপলব্ধি করার কারণেই তিনি পার্থিব মান-মর্যাদার প্রতি নির্লিপ্ত। তার মতে, সাধারণ মানুষ স্বার্থপরতার বশবর্তী, আর তিনি নিঃস্বার্থ বলেই সমাজের কাছে 'অপদার্থ'।
​.
লেখক দেখিয়েছেন যে, একজন আধ্যাত্মিক বা সত্যনিষ্ঠ মানুষকে সমাজ কীভাবে গ্রহণ করে। শিশু থেকে বৃদ্ধ, প্রত্যেকের দৃষ্টিভঙ্গিতেই লেখকের প্রতি এক ধরনের অবজ্ঞা বা বিস্ময় রয়েছে। প্রৌঢ়রা তাকে প্রতারক মনে করে, আর বৃদ্ধরা তার নির্ভীকতা দেখে ঈর্ষান্বিত হয়। এটি মূলত সমাজের সংকীর্ণ মানসিকতারই প্রতিফলন।
​.
হাসি নিয়ে লেখকের বিশ্লেষণ অত্যন্ত গভীর। তিনি মনে করেন, লৌকিক বা লোকদেখানো ভঙ্গিই হাসি নয়। প্রকৃত হাসি আসে আত্মার গভীর থেকে, যা আধ্যাত্মিক আনন্দের বহিঃপ্রকাশ। যেহেতু জাগতিক স্বার্থে হাসার প্রয়োজন তার নেই, তাই তিনি নীরব থাকেন, যা সমাজকে আরও বেশি ক্ষুব্ধ করে।

এই জগতের সবাই কোনো না কোনো কিছুর পেছনে পাগল (রূপ, ধন বা মান)। পার্থক্য শুধু এই যে, অন্যদের পাগলামির একটা জাগতিক 'ব্যাকরণ' বা উদ্দেশ্য আছে, কিন্তু লেখকের পাগলামি উদ্দেশ্যহীন এবং কেবল ঈশ্বর বা সত্যের অভিমুখে। তিনি প্রার্থনা করেছেন যেন পুরো জগত এই পবিত্র পাগলামিতে পূর্ণ হয়, তবেই জগতে শান্তি আসবে।
"আমার কথা" প্রবন্ধটি মূলত মহর্ষি মনোমোহন দত্ত আত্মপরিচয় প্রদানের একটি মাধ্যম, যেখানে তিনি প্রচলিত সমাজব্যবস্থার মুখোশ খুলে দিয়েছেন এবং নিঃস্বার্থ আধ্যাত্মিক জীবনকেই শ্রেষ্ঠ হিসেবে তুলে ধরেছেন।

26/02/2026
16/01/2026

বিটিভি-তে মহর্ষি মনোমোহন দত্তের দর্শন নিয়ে বিশেষ আয়োজন: ‘জ্যোতির্ময়’
​বাংলার মরমী সাধনার আকাশে অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র মহর্ষি মনোমোহন দত্ত। তাঁর আধ্যাত্মিক চেতনা এবং সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) প্রচারিত হলো বিশেষ অনুষ্ঠান ‘জ্যোতির্ময়’।

​প্রখ্যাত লালন গবেষক ড. সাইমন জাকারিয়ার চমৎকার উপস্থাপনায় অনুষ্ঠানটিতে মনোমোহন দত্তের জীবনদর্শন ও গানের গূঢ় অর্থ নিয়ে জ্ঞানমূলক আলোচনা করেছেন বিশিষ্ট গবেষক নূরুন নবী শান্ত।

​বাংলার লোকায়ত ধর্ম, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং মলয়া সংগীতের এই মহান সাধককে নিয়ে এমন তথ্যসমৃদ্ধ আলোচনা আমাদের শেকড়কে চিনতে সাহায্য করে। সংস্কৃতির এই ধারা ছড়িয়ে পড়ুক সবার মাঝে।

​ #বিটিভি #মহর্ষিমনোমোহনদত্ত #মলয়াসঙ্গীত #জ্যোতির্ময়

🙏 জয় দয়াময় 🙏সুধী,আগামী ১০ই মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ (২৪ জানুয়ারি ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ) রোজ শনিবার সর্ব্বধর্ম্ম অবতার শ্রীশ্রীমৎ আচা...
09/01/2026

🙏 জয় দয়াময় 🙏

সুধী,
আগামী ১০ই মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ (২৪ জানুয়ারি ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ) রোজ শনিবার সর্ব্বধর্ম্ম অবতার শ্রীশ্রীমৎ আচার্য্য আনন্দ স্বামীজীর-একনিষ্ঠ শিষ্য মহর্ষি মনোমোহন-এঁর ১৪৮তম শুভ আবির্ভাব উৎসব ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর থানার সাতমোড়া গ্রামের আনন্দ আশ্রমে উদ্‌যাপিত হবে।

উক্ত অনুষ্ঠানে জাতি ধৰ্ম্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলে আমন্ত্রিত।

কোথাও যাইনি আমি তোদেরে ছেড়ে,আমি হারা হয়ে কভু তোরা আমায় ভুলিসনারে।দূরে নহি কাছে কাছে, আছি সদা পাছে পাছে,সমাধি লয়েছি আমি ত...
07/10/2025

কোথাও যাইনি আমি তোদেরে ছেড়ে,
আমি হারা হয়ে কভু তোরা আমায় ভুলিসনারে।

দূরে নহি কাছে কাছে, আছি সদা পাছে পাছে,
সমাধি লয়েছি আমি তোমাদেরই হৃদমাঝারে।

✍️ মহর্ষি মনোমোহন

Address

Brahmanbaria

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Maharshi Monomohan - মহর্ষি মনোমোহন posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Place Of Worship

Send a message to Maharshi Monomohan - মহর্ষি মনোমোহন:

Share

“সকল জাতির ঐক্যে, সকল ধর্মের মহা মিলনের নাম যোগ”

হে দয়াময় করুণাসিন্ধু ! তোমার এই জগৎ রাজ্যের সমুদয় অমঙ্গল দূর করিবার নিমিত্ত যে সকল আয়োজন করিয়াছ, তাহাতে জগৎবাসীদিগের মনের আনন্দ উদগ্‌ম কর। তোমার শান্তি-রসাস্পদ ক্রোড়ে ইহলোক ও পরলোকবাসী বিরাজ করিতেছে, তাহাদের মধ্যে যাঁহারা অগ্রে তোমার মঙ্গল কার্য্যের ভার গ্রহন করিবে, তাহাদিগকে একত্রে মিলিত কর এবং অন্য কোন প্রতিকারের প্রতি মনের ভাব না রাখিয়া সকল প্রতিকারই তোমার নামের মধ্যে প্রবেশ করে, ইহার বিশেষ উপায় বিধান কর। প্রভো! তুমি যে অদ্বৈত কারণ এবং কার্য্য উভয়ই, ইহা বিশেষভাবে আমাদিগকে বুঝিতে দাও। তোমাকে না জানিয়া তোমার সহিত যোগ অসম্ভব। দয়াময়! তোমার ইচ্ছা সম্পন্ন হউক, তুমি ধন্য। দয়াময় ! তোমার ইচ্ছা সম্পন্ন হউক, তুমি ধন্য। দয়াময়! তোমার ইচ্ছা সম্পন্ন হউক, তুমি ধন্য। ওঁ শান্তি ! শান্তি !! শান্তি !!!

- মহারাজ আনন্দস্বামী