27/02/2026
আমি চাই কি? তুমি চাও কি? সে চায় কি? আমরা চাই কি? তোমরা চাও কি?
এ অকুল ভব-সাগরে এ উত্তাল তরঙ্গ কেন? ঘাত প্রতিঘাতে এত কলরব কেন? এত মারামারি হুড়াহুড়ি কেন? একে আরে এত বাদবিসম্বাদ কেন? এত আলোচনা কেন? এই "কি এবং কেন" এই দুই কথার উত্তর কে দিতে পারে?
বেদ-বাইবেল কোরান-পুরান, নিখিল শাস্ত্রগ্রন্থ, বিজ্ঞান, রসায়ন, আয়ুর্ব্বেদ গভীর গবেষণা, প্রকৃতির বিস্তৃত গ্রন্থ, অধ্যাপকের অধ্যাপনা, মনস্বীর মনন, যোগীর যোগ, তপস্বীর তপ, সন্ন্যাসীর সন্ন্যাস, গৃহীর গৃহবাস, মানবের জীবন-ভরা এত অধ্যাবসায় এতকাল এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হার মানিয়া চলিয়াছে।
কই সে উত্তর? কে দিবে উত্তর? কই পাওয়া যায় সে উত্তর? জানি অনন্ত বিশ্ব এই একটি কথার লাগি ঘোরতর তাণ্ডবে আত্মহারা হইয়া নাচিতেছে আবার বলি, কই সে উত্তর? কে দিবে উত্তর?
সসাগরা ধরার সিংহাসনাসীন রাজাধিরাজ, শুনেছি-অনন্ত ঐশ্বর্য্যের তৃপ্তি ঠেলিয়া দিয়া ঐ সে উত্তরখানা চায়, দীন হীন কাঙ্গাল অনশনে তৃণশয্যায় কেবল ঐ উত্তরখানার দিকে তাকাইয়া থাকে। তোমরা যদি কেউ জান, বল আমি কান পাতিয়া রহিয়াছি, আর সকলে উপেক্ষা করুক, শ্রবণ ভ'রে আমি শুনিব।
কই? চাঁদও বলে না, রবিও হেসে হেসে চলে যায়, তারাও মিটি মিটি চায় পাখীগুলিও উড়ে উড়ে চলে যায়, গাছের পাতাগুলি তা-না-না-না করিয়া নড়েচড়ে, ফুলটী সে কথা বলিতে যাইয়া আপনা আপনি ফুটিয়া উঠে, আর বলিতে পারে না; নদীর জল কেবল ঢেউ খেলে, পাহাড় কেবল উঁকি মারিয়া হাবার মত চেয়ে থাকে, শিশু সে কথার লাগি মায়ের আঁচল ছাড়ে না,
রমণী স্বামীসোহাগিনী হ'তে চায়, কেউবা ঘোন্টার আড়াল হ'তে চুপি চুপি উঁকি দিয়া একে-আরে খুঁজিয়া বেড়ায়, রোগী কেবল আর্তনাদ করে, ধনী কেবল অহঙ্কারের বড়াই মারে, মা কোলের শিশু কোল হইতে নামাইতে চায় না, ফিরে ফিরে নাকে মুখে চুমু খায়;
কি বুঝে শিশু স্তনের বাট মুখে লইয়া কখন হাসে কখন কাঁদে, আবার ঘুমের ঘোরে লুটে পড়ে; ছেলেরা ধামাল খেলায়, যুবকেরা বাবুয়ানার বাহার মারে, প্রৌঢ় হাপে ধাপে মাত্ করিয়া আপনি আপন বড় হতে চায়, বৃদ্ধ জীবনটা ভুল করিয়া বলিয়া কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া গোরুক্ টানিয়া আপ্প্সাস মিটায়। সে কথা কি? কি চায়? এত কেন?
হায়! হায়! হায়! এ ছোটখাট কথা দু'টির উত্তর অভিধান ব্যাকরণে কি নাই? সাহিত্যের এত বড় কলেবরে কি নাই? বোধ করি নাই। তা' হ'লে বিদ্যাবাগীশের কঙ্কচি থামিয়া যাইত, বুদ্ধিমান বুদ্ধি হারাইত, তার্কিক স্তব্ধ হইত। কই? গোল থামে না! মূল পেলে কি আর গোল থাকে? মূল বুঝি মিলে না।
কি মূল্যে সে মূল মিলে? জহরীর হিসাবে দাম কত টাকা? সংখ্যার বড় নয় লিখিয়া ডান দিকে অনন্তকাল কেবল শূন্য বসাইয়া দাও, এত টাকা মূল্যে কি সে মূল মিলে? যদি মিলিত, তবে আমি না পাই, তুমি না পাও, সে না পায়, মুকুটধারী পাইত। না, না, না, তার রাজকোষে কোথায় এত অর্থ, যে মূল্যে সে মূল বিকায়।
পাগল কয়, ঐ নিশীথ কালের স্তব্ধ রাগিণীতে, ঐ দুপুর বেলার ধূ হাওয়াতে কয়, প্রভাতের ভৈরবী নিক্কণে সন্ধ্যার পূরবীতে তালে বেতালে স্পষ্ট করিয়া অস্পষ্ট স্বরে কয়, ঘুমের ঝোঁকে শিশুর চোখে কয়, যুবতীর তাম্বুলরঞ্জিত ঠোটে কয়, ঐ তার হাবভাব ভঙ্গিতে কয়, ঝিঁ ঝিঁ পোকার ক্ষীণকণ্ঠে কয়, ঐ পাগল তান্ ধরিয়া গেয়ে যায়, মানুষে তারে ভালবাসে না, ঘৃণা করে,
তাই সে ঐ দূরে গেয়ে যায়, মাঝি তরণীতে পাল খাটাইয়া অবসাদে আনন্দে ঐ রাগিনী চাপিয়া চাপিয়া ধরে, কখন বা ভাটীয়াল ভাটী গাঙ্গের উজান ঢেউয়ে চেঁচাইয়া কয়, ঐ বায়ু কোণে ঝাঁ, ঝাঁ করিয়া ঘর ভাঙ্গিয়া গাছ ভাঙ্গিয়া ত্রাহি রবে কয়ে যায়, ঐ শিশু বৎস হাম্বা রবে ডেকে কয়, গাভী বাছুরের গা চাটিতে চাটিতে হাই তুলিয়া কয়, ঐ দুর্ব্বল ক্লিন্ন শীর্ণ গলটা ঝিক্ চাড়া খুঁজিতে খুঁজিতে বকাবকি করিয়া কয়।
আরে কি কয়? কে জানে, কি কয়? আমি কি জানি? যদি কেউ ঘাতে প্রতিঘাতে আত্মহারা হইয়া সে কথা শুনিতে আকুল মনে, আকুল নয়নে তাকাইয়া থাকে, তবে সে তারে এ তারে তারহীন টেলিগ্রামে টকাটক ঠকাঠক তারের তান বাজিয়া সে গানের সুর প্রাণে লাগাইয়া যায়। সে কি? কি চাও? কি চাই? এত কেন? এ শব্দাড়ম্বরের পরিসমাপ্তি কই? কি? উত্তর নাই; এত কথা বলিতে পার? এত বিদ্যা পেটের ভিতর, হাকে ডাকে গরম ক'রে, এ বাসরে সঙ্ সেজে, ভেঙ্গে গড়ে এত হইতেছ; কিন্তু একথাটী কি? উত্তর নাই।
ভাবিয়া দেখিলে না, শুনিয়া শুনিলে না, বুঝিয়া বুঝিলে না, কেবল ধামালে বে-সামাল বে-সামাল! বায়া ছিড়িয়া গেল, ডাহিনা বাজে না, তন্ত্রী সুর ছাড়িয়া দিল, তবু আমার ঐ কথার উত্তর হইল না। এ জগত প্রশ্নোত্তরের মাঝখানে একটি সঙ্-এর পুতুল—কেবল দোল খেলায়, আর ঘুরে মরে। হায়! হায়! হায়! কার কাছে যাব, কোথা তা'রে পাব।
এ গানের তানে যে প্রাণে প্রাণে আসমানে চড়িয়াছে, কই সে মানুষ! তোমরাত সবাই মানুষ : তোমরা এত মানুষ, তবু তালাস করতে হ'ল আমার মানুষ। তোমাদের ভারী বিরক্ত হইবার কথা। আরে! ফেলে রাখ ওসব ভ্রূকুটি, প্রাণের ভিতর যে ত্রুটি, মোটামুটি সেইটা তালাস করে দেখ দেখি! সকল খুটী নাটি হ'তে খালাস হয়ে যাবি। বেকসুর খালাস হ'তে না পারলেও পাশ কাটিয়া যেতে পারবি— যাক্ সে কথা। সে কি না জানে; কেউ কি কিছু করে? কারো প্রাণে কি প্রশ্ন না জাগে? কেউ কি তার উত্তর চায়, যে চায় সে পায়।
শোন ঐ পাগল গায়,
পাইতে শুধু আনন্দ, জগত ভরে এত দ্বন্দ্ব,
দীনের কাছে সে ধন বন্ধ, পায় না তারে দালান কোঠায়;
মুনিমুক্তা যতই বল, শান্তি বিনা সব বিফল,
সব ছেড়ে দে হরি বল, শান্তি ফল পাবে তায়।
কুঁড়ে ঘর কি গাছের তলা, বাসা করে রও নিরালা,
একলা মনে নামের মালা জপ যেয়ে সর্ব্বদায়।
যে ধন পায়না জগত মূল্যে, সে ধন পাবে অবহেলে,
কয় মনোমোহন দীন কাঙ্গালে এমনি ভাবে দিন যেন যায়।
উত্তর: একটি অফুরন্ত হাসি।
_____________________________________________________________
প্রবন্ধটি মানুষের চিরন্তন জিজ্ঞাসা "কি চাই?" এবং "কেন চাই?"
এই দুটি মৌলিক প্রশ্নের ওপর ভিত্তি করে রচিত। মহর্ষি মনোমোহন দেখিয়েছেন যে, জাগতিক সকল শাস্ত্র, বিজ্ঞান এবং সাধনা এই সহজ অথচ গভীর প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
রাজা থেকে ভিক্ষুক, জ্ঞানী থেকে মূর্খ- সবাই এক অজানার পেছনে ছুটছে। মহর্ষি প্রকৃতির নানা উপাদানের (চাঁদ, সূর্য, নদী, পাহাড়) মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন যে, উত্তরটি প্রকৃতির পরতে পরতে থাকলেও সাধারণ মানুষ তা ধরতে পারছে না।
মহর্ষি মনোমোহন দত্ত নিজেকে "পাগল" হিসেবে উপস্থাপন করে জাগতিক বুদ্ধিকে উপহাস করেছেন। তাঁর মতে, তথাকথিত শিক্ষিত ও বুদ্ধিমানরা পাণ্ডিত্যের অহংকারে মত্ত থাকলেও জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য বা "মূল" খুঁজে পায় না।
প্রবন্ধের শেষে মহর্ষি মনোমোহন আধ্যাত্মিক সমাধানের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, জাগতিক ঐশ্বর্য বা মণি-মুক্তায় শান্তি নেই; শান্তি আছে নির্জনে দয়াময় হরি-নাম জপে এবং অহংকার ত্যাগে।
প্রবন্ধের শেষে মহর্ষি মনোমোহন জীবনের সমস্ত জটিল জিজ্ঞাসার একটি মাত্র উত্তর দিয়েছেন "একটি অফুরন্ত হাসি"। এটি ইঙ্গিত করে যে, জীবনের সকল দ্বন্দ্ব ও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে উঠে পরমানন্দে নিমগ্ন হওয়াই হলো প্রকৃত প্রাপ্তি।