05/02/2026
পর্ব–০৫ | রিয়াযুস সালিহীনের ব্যাখ্যা | অধ্যায়: ইখলাস | হাদীস: ‘যখন দুই মুসলিম তরবারি নিয়ে পরস্পরের মুখোমুখি হয়’, ‘জামাআতে পুরুষের সালাত আদায়’ এবং ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা নেকিগুলো লিখে দেন’ | ইবনু উসাইমীন (রহ.)
আবু বকর নুফাই ইবনে হারিস আস-সাকাফী (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী কারীম (সা.) বলেছেন: "যখন দুইজন মুসলিম তাদের তরবারি নিয়ে মুখোমুখি হয়, তখন হত্যাকারী এবং নিহত ব্যক্তি উভয়েই জাহান্নামী।" আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! হত্যাকারীর বিষয়টি তো স্পষ্ট (যে সে জাহান্নামী), কিন্তু নিহত ব্যক্তির কী অপরাধ? তিনি বললেন: "সেও তার সঙ্গীকে হত্যা করার জন্য উদগ্রীব ছিল।" [সহীহ বুখারী: ৩১]।
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। লেখক (রাহিমাহুল্লাহ) আবু কাতাদা নুফাই ইবনে হারিস (রা.) থেকে যা বর্ণনা করেছেন তাতে নবী (সা.) বলেছেন, যখন দুইজন মুসলিম তাদের তরবারি নিয়ে লিপ্ত হয় তখন তারা একে অপরকে হত্যা করতে চায় এবং তরবারি কোষমুক্ত করে। ঠিক একইভাবে যদি কেউ বন্দুক তাক করে, অথবা অন্য কোনো মরণাস্ত্র যেমন পাথর বা অন্য কিছু ব্যবহার করে তবে এখানে তরবারির কথা উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট কোনো অস্ত্র হিসেবে নয়। বরং দুইজন মুসলিম যখন যেকোনো উপায়ে একে অপরকে হত্যার উদ্দেশ্যে লিপ্ত হয় এবং একজন অন্যজনকে হত্যা করে, তবে হত্যাকারী ও নিহত ব্যক্তি উভয়েই জাহান্নামে যাবে (নাউযুবিল্লাহ)।
আবু কাতাদা (রা.) নবী (সা.)-কে বললেন, "হত্যাকারীর বিষয়টি তো স্পষ্ট।" অর্থাৎ, তার জাহান্নামী হওয়াটা বোধগম্য কারণ সে ইচ্ছাকৃতভাবে একজন মুমিনকে হত্যা করেছে। আর যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যায়ভাবে কোনো মুমিনকে হত্যা করে, তার পরিণাম জাহান্নাম। আল্লাহ তাআলা বলেন: "আর যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কোনো মুমিনকে হত্যা করবে, তার শাস্তি হলো জাহান্নাম; সেখানে সে স্থায়ী হবে এবং আল্লাহ তার প্রতি রুষ্ট হবেন, তাকে লানত করবেন এবং তার জন্য মহাশাস্তি প্রস্তুত করে রাখবেন।" [সূরা আন-নিসা: ৯৩]। আবু কাতাদা (রা.) নবী (সা.)-কে যা বলেছিলেন: তা হলো তর্কের খাতিরে কোনো বিষয় মেনে নেওয়া।
অর্থাৎ, আমরা মেনে নিলাম যে হত্যাকারী জাহান্নামী, কিন্তু নিহত ব্যক্তির কী হলো? সে কেন জাহান্নামে যাবে অথচ সে তো নিজেই মারা গেছে? নবী (সা.) উত্তরে বললেন: "কারণ সেও তার সঙ্গীকে হত্যা করতে অত্যন্ত আগ্রহী ছিল।" সে তার সঙ্গীকে মারার জন্যই অস্ত্র নিয়ে এসেছিল, কিন্তু অন্যজন তার ওপর জয়ী হয়ে তাকে মেরে ফেলেছে। ফলে হত্যার নিয়ত এবং সেই লক্ষ্যে পদক্ষেপ নেওয়ার কারণে সেও যেন হত্যাকারী হিসেবেই গণ্য হলো। এ কারণেই তিনি বলেছেন, "সে তার সঙ্গীকে হত্যার ব্যাপারে উদগ্রীব ছিল।" এই হাদিসটি প্রমাণ করে যে, আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। যেহেতু সে তার সঙ্গীকে হত্যার সংকল্প করেছিল, তাই সে যেন সেই কাজটিই করল।
এখান থেকে আমরা এই হাদিস এবং নবী (সা.)-এর অন্য একটি হাদিসের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারি যেখানে তিনি বলেছেন: "যে ব্যক্তি নিজের রক্ত (জীবন) রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয় সে শহীদ, যে নিজের পরিবার রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয় সে শহীদ, যে নিজের সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয় সে শহীদ।" [সুনানে তিরমিজি: ১৪২১]। এবং সেই ব্যক্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে যে তোমার সম্পদ ছিনিয়ে নিতে আসে: "যদি তুমি তাকে হত্যা করো তবে সে জাহান্নামী, আর সে যদি তোমাকে হত্যা করে তবে তুমি শহীদ।" এর কারণ হলো, যে ব্যক্তি তার সম্পদ, পরিবার, জীবন ও সম্মান রক্ষা করছে, সে মূলত একজন অন্যায়কারী ও আক্রমণকারীকে প্রতিহত করছে যে হত্যা করা ছাড়া নিবৃত্ত হবে না। এক্ষেত্রে আক্রমণকারী নিহত হলে সে জাহান্নামী, আর আত্মরক্ষাকারী নিহত হলে সে জান্নাতের শহীদ। এটাই হলো দুই পরিস্থিতির মধ্যে পার্থক্য।
সুতরাং স্পষ্ট হলো যে, যে ব্যক্তি তার ভাইকে হত্যার উদ্দেশ্যে মারামারি করে সে জাহান্নামী, আর যে ব্যক্তি তার ভাইকে মারতে চেয়েও ব্যর্থ হয়ে নিজে মারা যায়, সেও জাহান্নামী। হত্যাকারী ও নিহত ব্যক্তি উভয়ই জাহান্নামে। এই হাদিসে হত্যার ভয়াবহতা প্রমাণিত হয় এবং এটি জাহান্নামে যাওয়ার অন্যতম কারণ। আরও বোঝা যায় যে, সাহাবীগণ (রা.) নবী (সা.)-এর কাছে অস্পষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন করতেন এবং তিনি সেগুলোর সমাধান দিতেন। এ কারণেই কুরআন ও সুন্নাহতে এমন কোনো প্রকৃত অস্পষ্টতা (শুবহা) নেই যার সমাধান কিতাব ও সুন্নাহতে সরাসরি নেই অথবা প্রশ্নের মাধ্যমে পরিষ্কার করা হয়নি।
এরই উদাহরণ হলো যখন নবী (সা.) দাজ্জাল সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছিলেন যে সে পৃথিবীতে ৪০ দিন অবস্থান করবে; যার প্রথম দিনটি হবে এক বছরের সমান, দ্বিতীয় দিনটি এক মাসের সমান, তৃতীয় দিনটি এক সপ্তাহের সমান এবং বাকি দিনগুলো সাধারণ দিনের মতো। তখন সাহাবীগণ প্রশ্ন করেছিলেন, "হে আল্লাহর রাসূল এই যে দিনটি এক বছরের সমান হবে, সেখানে কি আমাদের জন্য একদিনের সালাত (নামাজ) যথেষ্ট হবে? তিনি (সা.) বললেন: "না, বরং তোমরা সেই দিনের হিসাব করে সময় নির্ধারণ করে নিও।" [সহীহ মুসলিম: ২৯৩৭]।
এটি এর বড় প্রমাণ যে, আলহামদুলিল্লাহ, কুরআন ও সুন্নাহতে এমন কোনো অস্পষ্ট বিষয় নেই যার সমাধান নেই। বরং সমস্যাটি ঘটে মানুষের বোঝার সীমাবদ্ধতার কারণে যা সমাধান খুঁজে পেতে অক্ষম হয়, অথবা খোঁজাখুঁজিতে অবহেলার কারণে; মানুষ অলসতা করে, সে অন্বেষণ করে না, গভীরভাবে চিন্তা করে না বা যাচাই করে না, ফলে বিষয়টি তার কাছে অস্পষ্ট থেকে যায়। নতুবা বাস্তবে কুরআন ও সুন্নাহতে এমন কোনো অস্পষ্ট বিষয় নেই যার সমাধান কিতাব ও সুন্নাহতে শুরুতে অথবা সাহাবীদের করা প্রশ্নের উত্তরের মাধ্যমে দেওয়া হয়নি। আল্লাহ তৌফিকদাতা।
.
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "ব্যক্তির জামাতে সালাত আদায় করা তার ঘরে বা বাজারে সালাত আদায় করার চেয়ে পঁচিশ গুণেরও বেশি সওয়াব রাখে। আর এটি এজন্য যে, তোমাদের কেউ যখন উত্তমরূপে ওজু করে মসজিদের দিকে রওনা হয় এবং সালাত ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্য তার থাকে না, তখন তার প্রতিটি পদক্ষেপের বিনিময়ে আল্লাহ তার একটি করে মর্যাদা বৃদ্ধি করেন এবং একটি করে গুনাহ মোচন করেন—যতক্ষণ না সে মসজিদে প্রবেশ করে। আর মসজিদে প্রবেশ করার পর যতক্ষণ সে সালাতের অপেক্ষায় থাকে, ততক্ষণ সে সালাতরত বলেই গণ্য হয়। আর ফেরেশতারা তোমাদের প্রত্যেকের জন্য দোয়া করতে থাকে যতক্ষণ সে তার সালাতের স্থানে বসে থাকে। তারা বলে: হে আল্লাহ! তাকে দয়া করুন, হে আল্লাহ! তাকে ক্ষমা করুন, হে আল্লাহ! তার তাওবা কবুল করুন। যতক্ষণ না সে কাউকে কষ্ট দেয় বা তার ওজু নষ্ট হয়।" [সহীহ বুখারী: ৪৪৫, সহীহ মুসলিম: ৬৪৯]। এটি মুসলিমের শব্দ বিন্যাস।
.
লেখক (রাহিমাহুল্লাহ) আবু হুরায়রা (রা.)-এর সূত্রে নবী (সা.) থেকে যা বর্ণনা করেছেন তা হলো: মানুষের জামাতে সালাত আদায় করা তার ঘরে বা বাজারে সালাত আদায়ের চেয়ে ২৭ গুণ বেশি শ্রেষ্ঠত্ব রাখে। অর্থাৎ, মানুষ যখন মসজিদে জামাতের সাথে সালাত আদায় করে, তখন সেই সালাত তার ঘরে বা বাজারে একা পড়ার চেয়ে ২৭ গুণ বেশি উত্তম। কারণ জামাতে সালাত আদায় করা হলো আল্লাহর ফরজকৃত একটি বিধান পালন করা। আলেমদের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, জামাতে সালাত আদায় করা 'ফরজে আইন' (প্রত্যেক সক্ষম ব্যক্তির জন্য আবশ্যক)। কুরআন ও সুন্নাহর বিভিন্ন দলিলের ভিত্তিতে মানুষের ওপর মসজিদে জামাতে সালাত আদায় করা ওয়াজিব। আল্লাহ তাআলা তাঁর কিতাবে এ দিকেই ইশারা করেছেন: "আর যখন আপনি তাদের মধ্যে থাকবেন, অতঃপর তাদের সাথে সালাত কায়েম করবেন, তখন যেন তাদের একদল আপনার সাথে দাঁড়ায়..." (সূরা আন-নিসা: ১০২)।
আল্লাহ তাআলা ভয়ের অবস্থায়ও জামাতকে ওয়াজিব করেছেন, সুতরাং নিরাপদ অবস্থায় এটি ওয়াজিব হওয়া আরও জোরালোভাবে প্রমাণিত। এরপর তিনি (সা.) এর কারণ উল্লেখ করেছেন যে, যখন কোনো ব্যক্তি তার ঘরে পূর্ণরূপে ওজু করে এবং বাড়ি থেকে মসজিদের দিকে বের হয় আর সালাত ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্য তার থাকে না, তখন তার প্রতিটি কদমে (পদক্ষেপে) আল্লাহ তার একটি করে মর্যাদা বৃদ্ধি করেন এবং একটি করে পাপ মুছে দেন। মসজিদের দূরত্ব কাছে হোক বা দূরে, প্রতিটি পদক্ষেপে এই দুটি লাভ অর্জিত হয়: প্রথমত, আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন এবং দ্বিতীয়ত, আল্লাহ তার গুনাহ ক্ষমা করেন। এটি এক বিশাল অনুগ্রহ। যতক্ষণ না সে মসজিদে প্রবেশ করে এই সওয়াব চলতে থাকে।
মসজিদে প্রবেশ করে নির্ধারিত সালাত আদায়ের পর যখন সে সালাতের অপেক্ষায় বসে থাকে, ততক্ষণ সে সালাতের সওয়াব পেতে থাকে। এটিও একটি মহান নেয়ামত যে, সে কেবল সালাতের অপেক্ষায় বসে থেকেও সওয়াব পাচ্ছে। আপনি দীর্ঘ সময় ধরে বসে আছেন, তাহিয়্যাতুল মাসজিদ পড়ার পর আর কোনো সালাত পড়ছেন না, তবুও মাশাআল্লাহ আপনার জন্য সালাতের সওয়াব লেখা হচ্ছে। কারণ, "সালাতের অপেক্ষায় থাকা ব্যক্তি সালাতরত বলেই গণ্য হয়।" এর সাথে আরও একটি বিষয় যুক্ত যে, যতক্ষণ সে তার সালাতের স্থানে বসে থাকে ততক্ষণ ফেরেশতারা তার জন্য দোয়া করতে থাকে: "হে আল্লাহ! তার ওপর রহমত নাজিল করুন, হে আল্লাহ! তাকে ক্ষমা করুন, হে আল্লাহ! তাকে দয়া করুন, হে আল্লাহ! তার তাওবা কবুল করুন।"
এটি সেই ব্যক্তির জন্য এক বিশাল মর্যাদা যে এই নিয়ত ও আমল নিয়ে উপস্থিত হয়। এই হাদিসের মূল সাক্ষী হলো তাঁর (সা.) এই কথাটি: "অতঃপর সে তার ঘর থেকে মসজিদের উদ্দেশ্যে বের হলো এবং সালাত ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্য তার নেই।" এটি প্রমাণ করে যে, এই মহান সওয়াব পাওয়ার জন্য নিয়ত একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। কিন্তু যদি সে সালাতের উদ্দেশ্যে বের না হয়, তবে তার জন্য এই সওয়াব লেখা হবে না। যেমন: কেউ তার দোকান বা ব্যবসার উদ্দেশ্যে বের হলো, এরপর আযান হলে সে সালাত পড়তে গেল; সে এই (প্রতি কদমে সওয়াবের) বিশেষ প্রতিদান পাবে না। কারণ এই সওয়াব কেবল তার জন্য যে ঘর থেকে শুধু সালাতের উদ্দেশ্যেই বের হয়েছে। তবে হতে পারে তার জন্য সওয়াব তখন থেকে লেখা হবে যখন সে তার দোকান বা ব্যবসার স্থান থেকে মসজিদের দিকে রওনা হবে—যদি সে পবিত্র (ওজু) অবস্থায় থাকে। ওয়াল্লাহু আলাম।
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) তাঁর মহান রবের পক্ষ থেকে বর্ণনা করেন যে, আল্লাহ তাআলা বলেছেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ নেকি ও গুনাহসমূহ লিখে রেখেছেন, অতঃপর তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি কোনো নেক কাজের সংকল্প করল কিন্তু তা করতে পারল না, আল্লাহ তার জন্য নিজের কাছে একটি পূর্ণ নেকি লিখে নেন। আর যদি সে সংকল্প করার পর কাজটি করে, তবে আল্লাহ তার জন্য দশ নেকি থেকে শুরু করে সাতশ গুণ, এমনকি তার চেয়েও বহুগুণ নেকি লিখে দেন।" "আর যদি সে কোনো গুনাহের সংকল্প করে কিন্তু তা (আল্লাহর ভয়ে) না করে, তবে আল্লাহ তার জন্য একটি পূর্ণ নেকি লিখে নেন। আর যদি সে গুনাহের সংকল্প করার পর তা করে ফেলে, তবে আল্লাহ তার জন্য একটি মাত্র গুনাহ লেখেন।" [সহীহ বুখারী: ৬৪৯১, সহীহ মুসলিম: ১৩১]।
লেখক (রাহিমাহুল্লাহ) নেওয়াস ইবনে সামআন (রা.) [এখানে মূলত ইবনে আব্বাসের হাদিসটিই আলোচিত হচ্ছে] থেকে নবী (সা.)-এর যে কথাটি উদ্ধৃত করেছেন তা হলো: আল্লাহ নেকি ও গুনাহসমূহ লিখে রেখেছেন এবং তা স্পষ্ট করেছেন। নেকি ও গুনাহ লেখার দুটি অর্থ আছে: প্রথমত, লওহে মাহফুজে লিখে রাখা। আল্লাহ তাআলা লওহে মাহফুজে মহাবিশ্বের সবকিছু লিখে রেখেছেন। যেমন তিনি বলেছেন: "নিশ্চয়ই আমি সবকিছু সৃষ্টি করেছি নির্ধারিত পরিমাপে (তাকদির অনুযায়ী)।" [সূরা আল-কামার: ৪৯]। এবং তিনি বলেন: "ছোট-বড় সবকিছুই তাতে লিপিবদ্ধ।" [সূরা আল-কামার: ৫৩]। সুতরাং আল্লাহ ভালো-মন্দ সবকিছু লওহে মাহফুজে লিখে রেখেছেন।
দ্বিতীয়ত, বান্দা যখন কাজটি করে তখন তা লেখা হয়। বান্দা যখন কাজ করে, আল্লাহ তাআলা তাঁর হিকমত, ন্যায়বিচার ও করুণা অনুযায়ী তা লিপিবদ্ধ করেন। সুতরাং এই দুটি লেখা: একটি পূর্বনির্ধারিত যা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না—আমাদের কেউ জানে না আল্লাহ আমাদের জন্য ভাগ্যে ভালো না মন্দ কী লিখে রেখেছেন যতক্ষণ না তা ঘটে। আর দ্বিতীয়টি হলো পরবর্তী লেখা, যা মানুষ কাজ করার পর তার হিকমত ও ইনসাফ অনুযায়ী আমলনামায় লেখা হয়। এরপর নবী (সা.) ব্যাখ্যা করলেন যে, কীভাবে তা লেখা হয়। তিনি জানালেন যে, মানুষ যদি কোনো ভালো কাজের সংকল্প (হাম্ম) করে কিন্তু তা করতে না পারে, আল্লাহ তার জন্য একটি পূর্ণ নেকি লেখেন।
উদাহরণস্বরূপ: এক ব্যক্তি ওজু করে কুরআন পড়ার সংকল্প করল, কিন্তু কোনো কারণে তা করতে পারল না এবং ফিরে এল। তার জন্য এর বিনিময়ে একটি পূর্ণ নেকি লেখা হবে। কেউ সদকা করার সংকল্প করল এবং নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকাও ঠিক করল, কিন্তু পরে আর সদকা করল না—তার জন্য একটি পূর্ণ নেকি লেখা হবে। কেউ দুই রাকাত সালাত পড়ার ইচ্ছা করল কিন্তু পরে আর পড়ল না—তার জন্যও একটি পূর্ণ নেকি লেখা হবে। এখন কেউ প্রশ্ন করতে পারে, সে তো কাজটি করেনি, তবে কেন নেকি পাবে? এর উত্তর হলো: আল্লাহর অনুগ্রহ অত্যন্ত প্রশস্ত। তার অন্তরে যে সংকল্প সৃষ্টি হয়েছিল সেটিই একটি নেক আমল হিসেবে গণ্য হয়।
কারণ মানুষের অন্তর হয় ভালো অথবা মন্দের সংকল্পকারী। যখন সে ভালো কাজের সংকল্প করে, সেটিই তার নেকি হিসেবে লেখা হয়। আর যদি সে কাজটি বাস্তবে করে ফেলে, তবে আল্লাহ ১০ থেকে ৭০০ গুণ বা তার চেয়েও বহুগুণ নেকি লিখে দেন। এই যে নেকির কম-বেশি (১০ থেকে ৭০০ গুণ), এটি দুটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে: 'ইখলাস' (একনিষ্ঠতা) এবং 'মুত্তাবায়াত' (রাসূলের অনুসরণ)। মানুষ তার ইবাদতে আল্লাহর প্রতি যত বেশি একনিষ্ঠ হবে, তার সওয়াব তত বাড়বে। আর মানুষ তার ইবাদতে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ যত নিখুঁতভাবে অনুসরণ করবে, তার ইবাদত তত পূর্ণাঙ্গ হবে এবং সওয়াব তত বেশি হবে।
সুতরাং এই পার্থক্য তৈরি হয় ইখলাস ও রাসূল (সা.)-এর অনুসরণের মাত্রার ওপর ভিত্তি করে। আর গুনাহের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে–কেউ যদি মন্দ কাজের সংকল্প করে কিন্তু তা না করে, তবে আল্লাহ একটি পূর্ণ নেকি লেখেন। যেমন কোনো ব্যক্তি চুরির সংকল্প করল, কিন্তু হঠাৎ আল্লাহর কথা মনে পড়ে যাওয়ায় ভয়ে সে চুরি করা ছেড়ে দিল তার জন্য একটি পূর্ণ নেকি লেখা হবে। পূর্ণ নেকি লেখা হবে কারণ সে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য গুনাহটি ত্যাগ করেছে। অন্য একটি বর্ণনায় এর ব্যাখ্যা এসেছে এভাবে: "কেননা সে আমার (আল্লাহর) ভয়েই তা ত্যাগ করেছে।"
কেউ গীবত করার মতো কোনো মন্দ কাজের সংকল্প করল কিন্তু আল্লাহর ভয়ে তা ছেড়ে দিল, তাকে একটি পূর্ণ নেকি দেওয়া হবে। আর যদি সে মন্দ কাজটি করে ফেলে, তবে কেবল একটিই গুনাহ লেখা হয়, এর বেশি নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন: "যে ব্যক্তি একটি নেক কাজ করবে, সে তার দশগুণ প্রতিদান পাবে। আর যে ব্যক্তি একটি মন্দ কাজ করবে, তাকে কেবল তার সমান শাস্তিই দেওয়া হবে এবং তাদের ওপর জুলুম করা হবে না।" [সূরা আল-আনআম: ১৬০]। এই হাদিসে নিয়তের গুরুত্ব প্রমাণিত হয়। নিয়ত মানুষকে কল্যাণের শিখরে পৌঁছে দেয়।
আর আমরা আগেই জেনেছি, যদি কেউ মন্দের সংকল্প করে এবং সেই লক্ষ্যে কাজও করে কিন্তু অক্ষমতার কারণে করতে না পারে, তবে সে গুনাহের ভাগী হবে। যেমন: দুইজন মুসলিম তরবারি নিয়ে লিপ্ত হওয়া প্রসঙ্গে আগে আলোচিত হয়েছে, যদি দুইজন মুসলিম অস্ত্র নিয়ে একে অপরের মুখোমুখি হয় তবে হত্যাকারী ও নিহত ব্যক্তি উভয়ই জাহান্নামী। সাহাবীগণ প্রশ্ন করেছিলেন, "হে আল্লাহর রাসূল! হত্যাকারী তো বুঝলাম, কিন্তু নিহত ব্যক্তি কেন?" তিনি বলেছিলেন: "কারণ সেও তার সঙ্গীকে হত্যা করার জন্য উদগ্রীব ছিল।"[৫]
শাইখ ইবনে উসাইমীন (রহ.)-এর এই চমৎকার ব্যাখ্যাটি এখানে শেষ হয়েছে।
[৫] দারস লিংকঃ https://youtu.be/1LvQUW6bFtM
(চলবে ইন শা আল্লাহ....)