11/01/2025
(সকলে জানুন দীক্ষাকে মনে প্রাণে রক্ষাকরুন।দীক্ষাই(গুরুগণ-উপরিস্থগণ) আপনাকে রক্ষা করবে এবং নির্বাণমুখী হতে সাহায্য করবে।
#গুরু_আসাং_চাক্রামাং কর্তৃক ইচ্ছাসয় মহিদ্ধীজে গইং প্রতিষ্ঠা
-ভদন্ত উ পঞ্ঞা জোত মহাথের (গুরুভান্তে)
______________________________________
ক্ষয়প্রাপ্ত বুদ্ধ শাসনের ভবিষ্যৎ দর্শনে তিনি বিচলিত হয়ে পড়েন| ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক অবক্ষয়ের প্রবল স্রোতে কলি যুগের অসহায় মানবজাতি ভেসে গেলে অধর্ম,অন্যায়,লোভ,দ্বেষ ও মোহের অতলতলে নিমজ্জিত হবে| এভাবে মানবজাতি দিনে দিনে ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে| তখন অধার্মিক নিম্নমার্গের বৈদ্য ও মানুষেরা এবং মিথ্যাদৃষ্টি সম্পন্ন অসৎ দেবতারা আরো শক্তিশালী হয়ে মানব জাতির মুক্তি ও শান্তির পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে ধ্বংসের পথকে করবে প্রশস্ত| এই সকল অনাগত ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দিব্যচক্ষুতে, জ্ঞান চক্ষুতে উপলদ্ধি করতে পেরে দুঃখী ও অসহায় এই মানবজাতির কলি যুগের একমাত্র মুক্তির সোপান নির্মাণের উদ্দেশ্যে করুণাময় আসাং চাক্রামাং তাঁর ৭১ (একাত্তর) বৎসর বয়সে ১৮৮৩ ইং সনে " ইচ্ছাসয় মহীদ্ধিজে গইং" এর জন্ম দেন|
বিভিন্ন জনপদ থেকে বিভিন্ন গোত্রের মুক্তি পাগল মানুষ তাঁর নিকট শিষ্যত্ব গ্রহন করতে ছুটে আসতে থাকে| অগণিত শিষ্য তাঁর কাছে সঠিক শিক্ষা গ্রহন করে অচিরেই নিজ নিজ পারমী ও প্রচেষ্টানুসারে বিভিন্ন স্তরের মার্গফলে প্রতিষ্ঠিত হতে লাগলেন| এভাবে মানব সেবা করতে করতে কর্ম ও আয়ুক্ষয়ে ১২৬৪ মগীসনে (১৯০২ ইং সনে) 'ক্যইকলাক ম্রো 'অন্তর্গত 'ক্যুং মাং' গ্রামে স্বাভাবিকভাবে সকল শিষ্য-শিষ্যাদেরকে চোখের জলে ভাসিয়ে নব্বই বৎসর বয়সে পরপাড়ে পাড়ি দেন| মৃত্যুর পূর্বে শিষ্যদের মধ্যে যোগ্যতম শিষ্য ছ্রা পিউ নামক বনচারী ঋষিকে গইং এর সমস্ত দায়িত্ব অর্পন করে যান|
#দ্বিতীয়_গুরু_বোদ_পিউ:
বোদ পিউ ছিলেন ব্রক্ষ্ণচারী সংসার ত্যাগী ঋষি| গুরুর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে 'বোদ পিউ' ও ১১৬৬ মগীসনে (১৯০৪ ইং) তাঁর শিষ্যদের মধ্যে অন্যতম ছ্রা পোয়াংকে গইং এর সমস্ত দায়িত্ব অর্পণ করে আয়ু ও কর্মক্ষয়ে 'পোককাইং ম্রো'র সন্নিকটে 'সইটং রোওয়া' নামক গ্রামে 'পঞ্চরুদ্ধ আশ্রমে' দেহ ত্যাগ করেন|
#তৃতীয়_গুরু_বোদ_পোয়াং:
"ইচ্ছাসয় মহীদ্বিজে গইং" এর সকল শিষ্য শিষ্যাদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করার এবং দুঃখী অসহায় মানুষের সেবা করে পারমী পূরণ করার দুরহ দায়িত্ব প্রাপ্ত হন বোদ পোয়াং মাত্র তেত্রিশ বৎসর বয়সে| তিনিও ছিলেন অতি পারমীবান মহাপুরুষ| জন্মের সময় তাঁর বাম হস্তে অঙ্কিত চিত্রটিকে কেহই বুঝে উঠতে পারেনি| পরে সকলে বুঝেছিলেন যে চিত্রটি ছিল জন্ম-জন্মান্তরের সঞ্চিত পুণ্যরাশির ফল 'দেবরাজ শক্রের চক্র' যার ফলে তিনি যেকোন বিষধর প্রাণীর যে কোন বিষ একপলকে নাশ করে বা বিষধর সর্পের দংশনে মুহ্যমান রোগীকেও বিষমুক্ত করে সুস্হ করে দিতে পারতেন| তাঁর এই ধরণের সর্প বিষ মুক্ত করা সম্পর্কে একটি সুন্দর ঘটনা নিম্নে উল্লেখ করছি|
#বোদ_পোয়াং_এর_বিষনাশক_অলৌকিক_ক্ষমতা:
কোন এক গ্রামে এক রাখাল বালক গরু চড়াচ্ছিল| সে একটি গাছের নীচে ছায়ায় বসে বাঁশী বাজিয়ে গরুদের গতিবিধি লক্ষ্য করছিল| অনতিদূরে ছিল চলাচলের পথ| পথের ধারে ছিল গভীর ঝোপ, ঝাড় ও বড় বড় বৃক্ষ| এক পথচারী ঐ বনপথ দিয়ে কোথায় যেন যাচ্ছিল, হঠাৎ এক বিষধর সাপের দংশনে লোকটি বেহুশ হয়ে মাটিতে পড়ে গেল| রাখাল বালক দূর থেকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইল| রাখালটি দেখল হঠাৎ কোত্থেকে সাদা পোষাকধারী একব্যক্তি এসে দংশিত লোকের নিকট দাড়িয়েছে এবং নিকটের একটি গাছের শাখা এক হাতে ভেঙ্গে নিয়ে তা মাটিতে মৃদু আঘাত করে "হে বিষ নাশ হোক" বলতেই লোকটি সুস্হ হয়ে দাড়িয়ে গেল| পরক্ষণে ঐ সাদা পোষাপধারী ব্যক্তিটিও অদৃশ্য হয়ে গেলেন| রাখাল বালকটির মনে হলো যে গাছের শাখাটিতে নিশ্চয় কোন দৈবশক্তি আছে যার সামান্য আঘাতে (মাটিতে) অর্ধমৃত লোকটির বিষমুক্ত হয়েছে| তাই সে দৌড়ে গিয়ে ঐ শাখাটিকে তুলে স্বযত্নে রেখে দিল এবং এ ধরণের সর্প দংশিত রোগীর সাক্ষাতে পরীক্ষা করে অভাবনীয় সুফলও পাওয়া গেল|
প্রকৃতপক্ষে ঐ শাখাটিতে কোন দৈবশক্তি নিহিত ছিলনা| ঐ শাখাটি বোদ পোয়াং এর হাতের স্পর্শ পাওয়ায় বিষনাশক দৈব দন্ডে পরিণত হয়েছিল| ঘটনার সেই সাদা পোষাকধারী ব্যক্তিটি হলেন আর্যবিদ্যাধর ত্রিবিদ্যার অধিকারী আমাদের তৃতীয় গুরু বোদ পোয়াং| সমগ্র বার্মায় তাঁর অগণিত শিষ্য-শিষ্যা এবং ভক্ত ছিল| তিনি সুদীর্ঘ বায়ান্ন বৎসর গইং এর গুরু দায়িত্ব মনেপ্রাণে পালন করে পঁচাশি বৎসর বয়সে উপনীত হলে শিষ্যদের মধ্যে নবীন হলেও পারমী ও জ্ঞান গুণে শ্রেষ্ঠ ছ্রা হাইংকে উপযুক্ত উত্তরসুরী নির্বাচন করে গইং এর সমস্ত দায়িত্ব অর্পণ করে দায় মুক্ত হবার পর ১৩১৮ মগীসনের আশ্বিনী পূর্ণিমায় পরবর্তী পঞ্চম দিবসে (২৪-১০-১৯৫৬ ইংরেজী) রেঙ্গুন শহরে ইহলোক ত্যাগ করেন|
আসাং চাক্রামাং বা বোদ এ, বোদ পিউ এবং বোদ পোয়াং পর্যন্ত গইং এর নাম ছিল "ইচ্ছাসয় মহীদ্বিজে গইং"| বোদ হাইং এর সময় থেকে গইং এর নামের পূর্বে "শোয়ে য়াং গ্য" শব্দটি যুক্ত হয়ে "শোয়েয়াংগ্য ইচ্ছাসয় মহীদ্ধীজে গইং" নামে পরিচিতি লাভ করে তা সম্পর্কে পরে আলোচনা করছি|
#বোদ_হাইং_কিভাবে_দীক্ষা_লাভ_করেন:
বোদ হাইং দীক্ষা পাবার প্রবল বাসনা নিয়ে বোদ পোয়াং এর বাসভবনে সুদীর্ঘ তিন বৎসর অতিবাহিত করেছিলেন| তিনি বোদ পোয়াং এর গৃহের যাবতীয় কাজকর্ম করে দিতেন এরং এভাবে আজ, কাল দীক্ষা পাচ্ছেন এই আশায় জীবনের মূল্যবান তিনটি বৎসর কাটিয়ে দেন| তবুও বোদ পোয়াং তাঁকে কোন দীক্ষা না দেয়ায় তিনি ভগ্নহৃদয়ে নিজবাড়ী 'ধনুফু' গ্রামে প্রত্যাবর্তন করেন|
তখন বয়সে তিনি ছিলেন তরুন| তিনি ফেরী পাড়াপাড়ের নৌকার মাঝি হিসাবে কাজ করতে থাকেন| একদিন তাঁর জন্য এলো এক শুভদিন, তবে অন্যভাবে| একব্যক্তি নদী পার হতে চাইলেন| মং হাইং তাকে নদী পাড় করে দিলেন| বিনিময়ে লোকটি তাকে দিলেন " ইচ্ছাসয় মহীদ্ধিজে গইং" এর দীক্ষা এবং মং হাইং এর মস্তকে শুধুমাত্র পঞ্চবুদ্ধের আসন স্হাপন করে দিয়ে চলে গেলেন| দীক্ষার প্রতি মং হাইং এর ছিল প্রগাঢ় বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা| দীক্ষায় আছে নয়টি স্তর| কিন্তু মং হাইং কোন স্তর প্রাপ্ত হননি| তবুও তিনি তাতেই সন্তুষ্ট থেকে অতুলনীয় ও অমূল্য দীক্ষা প্রাপ্ত হয়েছেন বিশ্বাসে নিজেকে সাধনায় এবং দুঃখী মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন| অসাধু নিম্নমার্গের যাদু মন্ত্র বিদ্যাধারী এবং মিথ্রাদৃষ্টি সম্পন্ন অপদেবতা, ভুত, প্রেত ইত্যাদি অপপ্রয়োগের সৃষ্ট দুরারোগ্য ব্যাধি আক্রান্ত রোগীকে সহজেই মুক্ত করে দিতে পারায় 'ধনুফ্রু' ও তার আশে পাশে কালক্রমে 'ছ্রালে' বা 'ছোট গুরু' নামে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়তে থাকে|
এভাবে তাঁর খ্যাতি বোদ পোয়াং এর কর্ণগোচর হলে বোদ পোয়াং ছোট গুরু মং হাইং কে চিনে ফেললেন| এবার তিনি নিজেই তাঁকে একসাথে নয়স্তর প্রদান করে প্রকৃত গুরু হিসাবে স্বীকৃতি দেন| এই মং হাইং পরে বোদ হাইং হিসাবে বিখ্যাত হন| মানুষের পারমী এমনিই বিচিত্রময় যা সহজে বোধগম্য নহে| আমাদের চতুর্থ গুরু বোদ হাইং এর পারমী ও তদ্রুপ বিচিত্র বটৈ| তিন বৎসর ধরে দীক্ষার আশায় নিজে ঘরবাড়ী ছেড়ে গুরুর বাড়ীতে গুরুর যাবতীয় কাজকর্ম ভৃত্যের মত সমাধা করেও যাকে বোদ পোয়াং দীক্ষা দেননি, তাকেই পরবর্তীতে নিজে ডেকে এনে একসাথে নয়স্তর দিয়ে ছিলেন এবং পরপাড়ে চলে যাবার পূর্বে তাকেই তিনি উপযুক্ত উত্তরসুরী হিসাবে যোগ্যতম শিষ্য বলে নির্বাচিত করে গইং এর যাবতীয় দায়দায়িত্ব অর্পন করেছিলেন|
বয়সে এবং দীক্ষায় প্রবীন বহু শিষ্যকে ডিঙ্গিয়ে বোদ পোয়াং, বোদ হাইংকেই এভাবে গইং এর সর্বোচ্চ গুরুর পদ প্রদান করেন| কিন্তু এতে কতেক স্পর্শকাতর প্রবীন শিষ্য অসন্তুষ্ট ও ক্ষুব্ধ হয়ে বোদ হাই্ংকে সর্বোচ্চ গুরু হিসাবে মান্য করতে নারাজী হয়ে নিজেরাই মিলে পৃথক গইং গঠন করেন| তারা যে যাই করুক না কেন গইং এর মূল চাবিকাঠি এবং যাবতীয় 'ছে-ড' বোদ হাইং এর হাতেই রয়ে গেছে বলে বোদ হাইং গইং এর নামের পূর্বে "শোয়েয়াংগ্য" কথাটি নতুনভাবে যুক্ত করেন| অন্যান্য নবীন, প্রবীণ সকল গুরু, শিষ্য বোদ হাইংকে সর্বোচ্চ গুরু হিসাবে মান্য করে বুদ্ধ শাসন রক্ষা ও প্রসার এবং মানব সেবায় নিজেদের আত্মোৎসর্গ করেন| বোদ হাইং এর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় "শোয়েয়াংগ্য' এর খ্যাতি দেশে বিদেশে ছড়িয়ে পড়তে থাকে|
#দীক্ষার_গুণ_প্রদর্শন:
একবার (যখন বোদ হাইং-র বয়স মাত্র চল্লিশ বছর ছিল) মৌলমিয়ান জেলার 'ফ্যালইক্ খ্যং' গ্রামে কোন এক অসহায় রোগীকে দেখতে যাবার সময়ে উক্ত অঞ্চলে একনামে পরিচিত "ক ওয়ে মাগ্রী ড সে ঞো"-এর সাথে বোদ হাইং এর সাক্ষাৎ হয়| মহিলাটি তার অপ্রতিদ্বন্দী নিম্নমার্গের বিদ্যার সাথে বোদ হাইং এর গুণের পরীক্ষার জন্য সেখানে এসেছিল, কারণ সে বোদ হাইং এর নাম বেশ কিছু পূর্বে থেকেই লোকের মুখে শুনে পরীক্ষা করে দেখার ভীষণ আগ্রহী ছিল| 'ড সে ঞো'-এর সাথে সাক্ষাৎ পাওয়া যে কোন গুরুই (বৈদ্য) অত্যন্ত দুঃখে পতিত হতেন এবং অবশেষে হয় তার কাছে ক্ষমা চেয়ে যেতে হতো না হয় একেবারেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করতে হতো|
ভূত-প্রেত বিদ্যায় সেরা উক্ত মহিলাটি বোদ হাইংকে তুচ্ছ ও ছোট প্রতিপন্ন করে সকলের সামনে 'লুলে' বা 'হে খোকা' সম্বোধন ক্রমে বলল যে "খোকাদের দীক্ষার গুণ খুব উচ্চমানের শুনে মা (নিজেকে 'মা' বলে দাবী করে অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ দাবী করে) তা কতটুকু শক্তিশালী দেখার জন্য খোকার কাছে এসেছি|
বোদ হাইং প্রত্যুত্তরে বললেন, "আমাদের জ্ঞান বা শক্তি অন্যদের নিকট ইচ্ছামত প্রদর্শন করা যায় না| তবে নিম্নমার্গের বিদ্যা দ্বারা যে কোন ব্যক্তি যাই করুক না কেন, আমি তার বিদ্যাকে ধ্বংস করে দিতে পারি"|
"তাহলে আমার বিদ্যাকেই আমি প্রথমে দেখাই, খোকা তুমি দেখো"-বলে মহিলাটি বিরাট একটি চামড়ার খন্ডকে তাঁর বিদ্যা দ্বারা এক পলকের মধ্যে একটি সোনালী রং এর বড় একটি মাছি (শোয়ে য়াং) তে রুপান্তরিত করে| সঙ্গে সঙ্গে ঐ মাছিটি বোদ হাইং-র বরাবরে তীব্রবেগে উড়ে আসলে ও তাঁর শরীরে স্পর্শ করতে পারলোনা এমন কি নাভির উর্ধ্বাংশ পর্যন্ত উচ্চতায় উড়তে ব্যর্থ হয়ে তার নিচ বরাবর বৃত্তাকারে উড়তে থাকে|
এভাবে উড়ে এসে কোন লোককে আঘাত করলে সঙ্গে সঙ্গে মাছিটি ঐ লোকটির শরীরে প্রবেশ করে যেতো এবং মাছিটি তাঁর পূর্বের রুপ চামড়ায় রুপান্তরিত হয়ে যেতো| এভাবে এক নিমিষেই আক্রান্ত লোকটির মৃত্যু ঘটতো| মৃত লোকটির লাশ আগুনে পর্যন্ত পোড়া যেতোনা| মহিলার এই বিদ্যাটি এতখানি অতীব লোমহর্ষক ও ভয়ংকর ছিল|
মাছিটি কোন ক্রমেই বোদ হাইংকে স্পর্শ করতে না পেরে নাভির তলদেশ সমান উচ্চতায় উড়তে থাকলে "খোকাদের বিদ্যা শরীরে সমস্ত দ্বার বন্ধ রাখতে সক্ষম| অত্যন্ত নিরাপদ বিদ্যা বটে| মা-র ক্ষমতা দেখেছ এবার খোকার ক্ষমতা একটু দেখাও" বলে মহিলা বোদ হাইং এর উদ্দেশ্যে বললেন|
তখন বোদ হাইং "আমাদের বিদ্যা ও গুণ দ্বারা মা-র করে রাখা মাছিকে পুনরায় পূর্বাবস্হায় ফিরিয়ে আনতেছি" বলে তর্জ্জনী আঙ্গুলি উত্তোলন করে " পূর্বাবস্হায় ফিরে যাক" বলার সাথে সাথে সোনালী মাছিটি ধপ্ করে মাটিতে পড়ে যায় এবং চোখের সামনেই এক পলকের মধ্যে আবার চামড়া খন্ডে রুপান্তরিত হয়| এই ঘটনার সাথে ইচ্ছাসয় মহীদ্ধিজে গইং নামের পূর্বে-"শোয়ে য়াং গ্য" নামটি যোগ হবার যোগসূত্র রয়েছে| "শোয়ে" অর্থ সোন, "য়াং" অর্থ(বার্মিজ ভাষায় ও উচ্চারণে) "মাছি" বা "বুক" দুইটাই বুঝায়।
#বোদ_হাইং_এর_অন্যান্য_গুণাবলী:
বোদ হাইং যেমনি ছিলেন জ্ঞানী তেমনি ছিলেন ধৈর্য্যশীল উদ্যেমী| তিনি হিংস্র ও জগণ্য চরিত্রের বহু মানুষকে দীক্ষা দিয়ে সত্য ও শান্তির পথে আনতে সমর্থ হয়েছিলেন| অন্ধজনকে তিনি দিয়েছিলেন মুক্তির জ্ঞানের আলো| নিজে বহু কষ্ট স্বীকার করেও তিনি গইং এর দায়িত্ব পালনে এবং শিষ্যদের প্রতি কোন কালে কোন রকমের অবহেলা করেননি| বোদ হাইং নিজেই বলে গেছেন, ছয়টি বছর তিনি বহু দুঃখ ও কষ্টের মধ্যে দিন কাটিয়েছিলেন| দু'বেলা আহারও অনেক সময় তাঁর জুটেনি| উপরিস্হ গুরুবৃন্দের এধরণের কঠিন পরীক্ষায় তিনি কৃতকার্য হয়েছিলেন| এভাবে একদিকে নিরলসভাবে গইং এর গুরু দায়িত্ব পালন করে অন্যদিকে বিদর্শন ভাবনায় তিনি পারমী অনুযায়ী উপযুক্ত প্রজ্ঞার অধিকারীও হয়েছিলেন| এভাবে তিনিও আর্যবিদ্যাধরের মধ্যে অন্যতম একজন বলে স্বীকৃত হয়েছিলেন|
#বোদ_হাইং_এর_বিদায়:
বোদ হাইং ৭০ (সত্তর) বৎসর বয়সের বৃদ্ধ| তিনি বুঝতে পারলেন এবারের মত তাঁর দায়িত্ব শেষ হয়ে এসেছে| চলে যাবার সময় উপস্হিত| উপরিস্হ গুরুবৃন্দ তাঁর জন্য অপেক্ষা করছেন| তিনি পরম সুখময় জীবনে চলে যাবেন| সেদিন ছিল বুধবার| রাত ঘনিয়ে আসলো| তিনি তাঁর পুত্র 'ছ্রাগ্রী উ চাইং সিং' কন্যা 'আমাগ্রী ড এ চি' এবং অত্যন্ত আদরের ও বিশ্বাসযোগ্য শিষ্য 'এফেগ্রী উ ম্যা খিং' কে কাছে ডাকলেন| চরম মুহূর্তের পূর্বক্ষণে তিনি গই্ং এর পরবর্তী দায়িত্ব 'এফেগ্রী উ ম্যা খিং' এর হস্তে অর্পণ করে স্বস্তি পেলেন| ছ্রাগ্রী উ ম্যা খিং ও তাঁর নিকট থেকে যাবতীয় দায়িত্ব গ্রহন করে সর্বোচ্চ গুরুর পদে আসীন হলেন| পিতাগুরু বোদ হাই্ং পুত্র শিষ্যকে গইং এর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা না করতে, প্রাণের বিনিময়ে হলেও গইং এর মর্যাদা রক্ষা করতে শেষবার আদেশ দিলেন এবং এই সংসার অনিত্য, দুঃখ ও অনাত্মার কুহকে সৃজিত, তাই কোন রকমের মোহ লোভ ও দ্বেষ না রেখে নীল, সমাধি ও প্রজ্ঞার সোপান দিয়ে পরমসুখ নির্বাণ সাক্ষাতের জন্য সাধনা করার শেষ উপদেশ দিয়ে রাত্রি দশ ঘটিকার সময়ে অমৃত রাজ্যে গুরুদের সাথে মিলিত হবার জন্যে অগনিত শিষ্য, শিষ্যা ও ভক্তদের ফেলে এই অসার মর্ত্য ত্যাগ করেন।
(চার বোদ -এর জীবনী সংক্ষিপ্তাকারে সমাপ্ত)
বোদ হাই পরপারে গমন করলে গইং এর দায়িত্ব পালন করেন তার প্রিয় শিষ্য ছারাগ্রী উ মিয়া খিং। ছারাগ্রী উ মিয়া খিং এর পর গইং এর দায়িত্ব পালন করেন বোদ হাইং এর পুত্র ছারাগ্রী উ চাইং সিং। তিনি গইং এর দায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করে কয়েক বৎসর পূর্বে পরলোক গমন করলে ছারাগ্রী উ মিন লুইন গইং এর যাবতীয় দায়িত্ব বোদ হাইং এর মেয়ে ও ছারাগ্রী উ মিয়া খিং এর ছেলেদের সাথে আলাপ-আলোচনাক্রমে পালন করছেন।
#ইচ্ছাসয়_মহিদ্ধীজে_গইং_থেকে 'শোয়েয়াংগ্য ইচ্ছাসয় মহিদ্ধীজে গইং' -এর #উৎপত্তির_ইতিহাস
'শোয়েয়াংগ্য ইচ্ছাসয় মহিদ্ধীজে গইং' সম্পূর্ণভাবে যিনি প্রতিষ্ঠা করেন, তিনি হলেন রাজপুত্র উ অং| তারপর বুদ্ধ শাসনকে মলিন, ক্ষণস্হায়ী, ধ্বংস করার জন্য যে সকল মনুষ্য, অপদেবতা লিপ্ত ছিল, তাদেরকে নির্মূল করার জন্য বুদ্ধশাসনকে দীর্ঘস্হায়ী প্রসার ও উজ্জ্বলতর করার মহান লক্ষে "ইচ্ছাসয় মহিদ্ধীজে গইং" প্রতিষ্ঠা করেন বোদ-এ বা আসাং চাক্রামাং|
পূর্বে আলোচনা মতে আপনারা জেনেছেন যে আসাং চাক্রামাং মৃত্যুর পূর্বে "গইং" এর দায়িত্ব দিয়ে যান বোদ পিউকে| বোদ পিউ মৃত্যুর পূর্বে উক্ত দায়িত্ব দিয়ে যান বোদ পোয়াংকে| "ইচ্ছাসয় মহিদ্ধীজে গইং" এর পরিসমাপ্তি ঘটে বোদ পোয়াং এর মৃত্যুর পরই|
আজ আমরা "শোয়েয়াংগ্য গইং" বা শোয়েয়াংগ্য দীক্ষা যেটিকে বলছি তা সারা বিশ্বে প্রসার লাভ করেছে| তার উৎপত্তি হয় বোদ হাইং এর আমলে| বোদ হাইং তাঁর গুরু বোদ পোয়াং এর সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য,ঘনিষ্ট, আপন, এবং শীল-সমাধি-প্রজ্ঞা অনুশীলন ও চর্চাকারী ছিলেন| সেই কারণে বোদ হাইংকে, তাঁর গুরু বোদ পোয়াং খুবই স্নেহ করতেন. বিশ্বাস করতেন,তাকে দিয়ে বিভিন্ন কাজ করতেন,বিভিন্ন দায়িত্ব দিতেন| সত্যি বলতে কি বোদ হাইং ছিলেন অন্যান্যদের তুলনায় দীক্ষায় নবীন| তাই বোদ হাইং তার চেয়ে প্রবীণ শিষ্যগণের নিকট চোখের বালি হয়ে দেখা দিলেন|
হিংসুক শিষ্যরা বোদ পোয়াং ও বোদ হাইং এর মধ্যে অবিশ্বাস সৃষ্টি করার জন্য বিভিন্ন ষড়যন্ত্র করতে লাগলেন| মিথ্যা বিভিন্ন অভিযোগ ও দোষারোপ করতে লাগলেন| কর্মের অমোঘ বিধান, ষড়যন্ত্রকারীদের হীন প্রচেষ্টা সফল হয়|
বোদ পোয়াং বোদ হাই্ংকে অবিশ্বাস ও ঘৃণা করতে শুরু করলেন| একদিন তিনি বোদ হাইংকে তাড়িয়ে দিলেন| অশ্রসজল চোখে কাকেও দোষারোপ না করে বিনা প্রতিবাদে গুরুর প্রতি অকৃত্রিম ভক্তি, শ্রদ্ধায়, বোদ হাইং নিরবে গুরুর আদেশ শিরোধার্য্য এই পবিত্র জ্ঞানে গুরুর সান্নিধ্য ত্যাগ করে চলে যান| বোদ হাইং গুরু সান্নিধ্য ছেড়ে তিন বৎসর অতিক্রম করতে বাধ্য হলেও কোনদিন গুরু বোদ পোয়াংকে ভুলেন নাই| তার আদেশ-উপদেশ ভুলেন নাই| তিনি তাই গুরুর আদেশ-উপদেশ মতে শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞার অনুশীলন করতে থাকেন এবং প্রার্থনা করতে থাকেন যে, গুরুর দর্শন যেন অতিসত্বর লাভ করেন|
তাঁর প্রার্থনা পূর্ণ হতে চললো| কারণ পারমীবানদের সত্য ও কল্যাণকর কামনা কোনদিন অপূর্ণ থাকেনা|
১৩১৮ মগীসনের প্রবারণা পূর্ণিমার পরবর্তী পঞ্চম দিবস| বোদ পোয়াং এর বিদায় নেয়ার সময় হয়ে গেছে তিনি বিছানায় শুয়ে কারো জন্যে যেন অপেক্ষা করছেন| সে আর অন্য কেউ নয়| তারই অতি প্রিয় ভাজন পরম বিশ্বাসী, যে কোনদিন গুরুর প্রতি অসম্মান, অসদাচরণ করেননি, গুরুর কোন আদেশ অমান্য করেননি, গুরুকে সর্বদা শান্তিতে রাখার চেষ্টা করেছেন, তিনি হলেন শিষ্য বোদ হাইং|
এই মুহূর্তে বোদ হাইং গুরুর গৃহের দোর গোড়ায় হাজির হলেন| সহজে তাকে প্রবেশ করতে দেয়া হলো না| পরিশেষে বহু অনুনয়-বিনয় করার পরে অনুমতি পেলেন গুরু ভাইদের নিকট থেকে| বোদ হাইং , বিছানায় শায়িত গুরু বোদ পোয়াং এর নিকটে উপস্হিত হলেন|
বোদ পোয়াং প্রিয় শিষ্যকে দেখতে পেয়ে বললেন আমার মং বোদ হাইং নাকি? আজ্ঞা গুরু আমি এসছি| ঐ সময়ে গুরু বোদ পোয়াং তার কোমড় থেকে ছেড ও তার তৈরি নিয়মাবলীর গুপ্ত শিক্ষা বের করে-"নাও আমার খোকা মং বোদ হাইং , আমার গইং এর দিন শেষ| শোয়েয়াংগ্যে এসে গইংকে রক্ষা ও শাসন কর|" এই বলে গুরু বোদ পোয়াং গইং এর যাবতীয় 'ছেড ও সমস্ত মূল্যবান উপকরণাদি বোদ হাইং এর হাতে অর্পন করে বললেন-এক্ষুনি এ স্হান ত্যাগ কর| গুরুর আদেশ অমান্য করার সাহস তার ছিলনা| তাই বোদ পোয়াং এর শেষ-নিঃশ্বাস ত্যাগের মুহূর্তটুকু দেখার ইচ্ছা থাকলে ও গুরুর আদেশমতেই দ্রুত প্রস্হান করেন|
বোদ হাইং তার বাড়ী ধনুপ্রু পৌছার একটু আগেই গুরু বোদ পোয়াং ইহলোক ত্যাগ করেন| গুরু বোদ পোয়াং এর মৃত্যুর পর অনেকে গইং এর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে বিভিন্ন নামে নিজেদেরকে গুরু দাবী করে গইংকে টুকরা টুকরা করে ফেললেন| গুরুবৃন্দের গইং বা দীক্ষা এভাবে মলিন হয়ে ধ্বংস প্রাপ্ত হতে থাকে|
গইং এর এমন ক্রান্তিকালে বোদ হাইং জেগে উঠলেন, তিনি সিংহের ন্যায় গর্জন করে বললেন-তোমরা এই পবিত্র দীক্ষাকে যাই করো না কেন, মূল দীক্ষা কোনদিন বিলুপ্ত হয়ে যাবেনা| আমার কাছে সোনার চেয়ে অধিক মূল্যবান গইং এর 'ছেড ও তার পরিপূর্ণ তৈরী পদ্ধতি শিক্ষা' আমার হাতে রয়েছে যা গুরু পরম্পরায় সর্বশেষে বোদ পোয়াং আমাকে হস্তান্তর করে গেছেন| তিনি গুরু বোদ পোয়াং এর নির্দেশমতে গঠন করলেন "শোয়েয়াংগ্য ইচ্ছাসয় মহিদ্ধীজে গইংদগ্রী|"
#বিদ্যা_ও_বিদ্যাধর
আমাদের এই শোয়েয়াংগ্য ইচ্ছাসয় মহিদ্বীজে গইং কোন ধরনের বিদ্যা তা নিচে আলোচনা করছি।
দসবত্থু, সম্মাদিটটি বা সম্যক দৃষ্টির দশবস্তুতে বলা হয়েছে যে- "লোকে সম্মগ্গতা সম্মাপটিপন্না সমনব্রহ্মণা অত্থি, যে ইমঞ্চ লোকং পরঞ্চ লোকং সয়ং অভিঞ্ঞা সচ্ছিকত্বা পবেদেন্তি।"
অর্থাৎ- এই মনুষ্যলোকে শীল সমাধিতে সম্যকভাবে প্রতিষ্ঠিত এমন শ্রমণ-ব্রাহ্মণ আছেন যাঁরা ইহলোকে ও পরলোকে স্বয়ং অভিজ্ঞান দ্বারা দর্শন করেছেন। তাদেরকে বলা হয় বিদ্যাধর। এমন বিদ্যা ও বিদ্যাধর পাঁচ প্রকারে আছে। যথা:-
(১) বেদ বিদ্যা এ বেদ বিদ্যাধর,
(২) মন্ত্র বিদ্যা ও মন্ত্র বিদ্যাধর,
(৩) গন্ধারী বিদ্যা ও গন্ধারী বিদ্যাধর,
(৪) লোকীয় বিদ্যা ও লোকীয় বিদ্যাধর,
(৫) আর্য বিদ্যা ও আর্য বিদ্যাধর।
(১) #বেদ_বিদ্যা_ও_বেদ_বিদ্যাধর:
সাম, যজু, ঋক, অথর্ব এই চার প্রকার মূলগ্রন্থসহ কপ্প, ব্যাকরণ, জ্যোতিসসত্থ, সিকখা, নিরুত্তি ও ছান নামে আরো ছয়টি ক্ষুদ্র গ্রন্থকে বেদ বিদ্যা বলে। এই বেদ বিদ্যায় পারদর্শী বেদ বিদ্যাধরগণ হলেন-
(২) #মন্ত্র_বিদ্যা_ও_মন্ত্র_বিদ্যাধর:
বিবিধ লক্ষ্মণ গ্রন্থ, বিবিধ নিমিত্ত গ্রন্থ, বিবিধ নক্ষত্র গ্রন্থ, বিবিধ গাথামন্ত্র গ্রন্থ, ঔষধ, ধাতু ইত্যাদি লৌকিক বিদ্যাসমূহকে মন্ত্র বিদ্যা বলা হয়। মন্ত্র বিদ্যাধরগণ (বেদ বিদ্যার) যে কোন একটি কন্ঠ (উচ্চারণ) বিদ্যা এবং হস্তবিদ্যাসহ প্রভৃতি বিদ্যায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনকারী ব্যক্তি হন।
(৩) #গন্ধারী_বিদ্যা_ও_গন্ধারী বিদ্যাধর:
ঔষধ বিদ্যা, আং বিদ্যা, পারদ বিদ্যা, লৌহ বিদ্যা নামক বিবিধ বিদ্যার গ্রন্থ সমূহে উল্লেখিত ধনসিদ্ধি, পথবী সিদ্ধি, উদক সিদ্ধি, আকাশ সিদ্ধি, আয়ু সিদ্ধি, চিন্তাময় সিদ্ধিসহ দশ রকমের সিদ্ধি-প্রাপ্ত হয়ে দেবতা ও দেবরাজ শক্রদের অলৌকিক শক্তি, অভিজ্ঞান শক্তির সমতুল্য যে অলৌকিক ঋদ্ধি শক্তিপ্রাপ্ত হয় তাকে গন্ধারী বিদ্যা বলা হয়।
#গন্ধারী_বিদ্যা:
"তত্থ কতমা চিন্তাময়া ইদ্ধি, বিজ্জাধরা বিজ্জং পরিজপ্পেত্বা আকাশে অন্তলিকখে হতথীম্পি, দসসেন্তি, অসসম্পি দসসেন্তি রথম্পি দসসেন্তি, পট্টিম্পি দসসেন্তি বিবিধম্পি সেনাব্যুহং দসসেন্তি, অযং চিন্তাময়া ইদ্ধি।"
এই মর্মে পতিসম্ভিদা মগগ গ্রন্থে বর্ণিত আছে। উক্ত দশটি ঋদ্ধিকে কেন চিন্তাময় ঋদ্ধি বলা হয়? বিদ্যারগণ বিদ্যাকে সূক্ষ্মতর ও জাগ্রত করে জলে, স্থলে ও আকাশে হস্তী বাহিনী সৃজনে প্রদর্শন করতে সক্ষম, অশ্ববাহিনী সৃজনে, প্রদর্শন করতে সক্ষম, রথ বাহিনী সৃজনে প্রদর্শন করতে সক্ষম, অস্ত্রধারী সেনাবাহিনী সৃজনে প্রদর্শন করতে সক্ষম, বিবিধ বহুরুপী সেনাও সেনাপতির সমাবেশ ও সৃজন করেও প্রদর্শন করতে সক্ষম। এই রকম মনের মনের ইচ্ছানুরূপ এক পলকের মধ্যে বাস্তবে রূপদানের অলৌকিক ক্ষমতাকে চিন্তাময় ঋদ্ধি বলা হয়।
#গন্ধারী_বিদ্যাধর_কিভাবে_হওয়া_যায় :
বর্তমানকালে যারা গন্ধারী বিদ্যা আয়ত্তক্রমে পূর্বে বর্ণিত দশটি চিন্তাময় ঋদ্ধি প্রাপ্ত হতে চান তাদেরকে সর্বদা ত্রিরত্নকে নিজের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। অতঃপর বনদেবতা, পাহাড় দেবতা, রুকখটঠ, ভূমটঠ, পর্বত দেবতা, মন্ত্র বিদ্যারক্ষক 'বিদ্যা দেবতা', মহৌষধ বৃক্ষলতাদি ও পাথর, ধাতু দিগের রক্ষক " ঔষধী দেবতা" সহ অপরাপর সকল দেবতাগণকে নিজ সন্তানের মত মৈত্রী ও করুণা দিয়ে তাদেরকে অত্যন্ত আপন করে নিয়ে মিত্র ও সহায়রূপে পেতে পারলে তাদের প্রচেষ্ঠা সিদ্ধিলাভ করবে। এই গন্ধারী বিদ্যা দেবতাদের "কম্ম বিপাক ইদ্ধি" বা অলৌকিক শক্তিকেও আচ্ছাদিত ও ম্লান করে দিতে পারে।
#গন্ধারী_বিদ্যার_উৎপত্তি :
কেবট্ট সূত্রে বলা হয়েছে যে- "গন্ধারীতি গন্ধারেন, নাম ইসিনাকতা, গন্ধার রথে বা উপ্পনা বিজ্জা, ততথতির বহুইস য়োবসিসু, তেসু ইকেন কতাবিজ্জাতি অধিপ্পায়ো।" -এর মর্মার্থ হলো এই যে গন্ধার নাম জনৈক ঋষি সর্বপ্রথম এই বিদ্যার জন্ম দেন। আবার অন্য মতে গন্ধার নামক স্থানে এই বিদ্যা সর্বপ্রথম বিকশিত। পূর্বে উক্ত স্থানে বহু মুনি ঋষি বাস করতেন। তাদের মধ্যে জনৈক ঋষি এই বিদ্যার শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে দশটি সিদ্ধি ও ঋদ্ধি প্রাপ্ত হয়েছিলেন। তাই পরবর্তীকালে গন্ধার নামক স্থানকে ভিত্তি করে এই বিদ্যা গন্ধারী বিদ্যা বলে পরিচিত।
#গন্ধারী_বিদ্যার_শ্রেণীভেদ:
শীলকখন্ধ বগ্গ, কেবট্টসুত্তটীকা ইদ্ধি বিধপালি হারি (২৮৯) নং পৃষ্ঠা উল্লেখ আছে যে,- "চূল গন্ধারী মহাগন্ধারী দ্বে গন্ধারী বিজ্জা"। অর্থাৎ 'চূল গন্ধারী' ও 'মহাগন্ধারী' নামে দুই প্রকারের গন্ধারী বিদ্যা আছে।
#চূল_গন্ধারী_বিদ্যা_ও_বিদ্যাধর:
এই বিদ্যাধরগণ নিজস্বলদ্ধ ধ্যান ও অভিজ্ঞান বল ও ঋদ্ধিতে সন্তুষ্ট ও তৃপ্ত থেকে লৌকিক বলয়ের মধ্যে বিচরণ করেন। তাঁরা সমথ ভাবনায় সীমাবদ্ধ থাকেন বিধায় লৌকিক ধ্যান ও অলৌকিক শক্তি প্রাপ্ত হলে লোকোত্তর প্রজ্ঞা বা বিদর্শন জ্ঞানের অধিকারী হতে পারেন না। তাঁদের বিদ্যাকে বলা হয় গন্ধারী বিদ্যা।
#মহাগন্ধারী_বিদ্যাধর :
যে সকল চূলগন্ধারী বিদ্যাধর শুধু সমথ ভাবনায় সীমাবদ্ধ না রেখে বিদর্শন ভাবনার মাধ্যমে চতুরার্য সত্যকে প্রত্যক্ষ ও উপলদ্ধিক্রমে লোকোত্তর প্রজ্ঞার অধিকারী হয তাঁদেরকে মহাগন্ধারী বিদ্যাধর বলা হয়। তাঁদের বিদ্যাকে বলা হয় মহাগন্ধারী বিদ্যা।
#চুলগন্ধারী_বিদ্যাধরগণের_কাহিনী:
(ক) ' #কচ্চায়ন_মহাথের'- আমাদের সম্যক সম্বুদ্ধ গৌতমের পূর্ববর্তী ত্রিশ হাজার পূর্ব কল্পে সুমেধ নামক সম্যক সম্বুদ্ধ আবির্ভূত হয়েছিলেন। সুমেধ বুদ্ধ একটি বনে একাকী বিচরণকালে এক বিদ্যাধর আকাশ মার্গে ভ্রমণের সময় তার সাক্ষাত প্রাপ্ত তার মধ্যে অপরিমেয় ভক্তি ও শ্রদ্ধা জাগ্রত হলে তিনি সুগন্ধময় পুষ্পদ্বারা সুমেধ বুদ্ধের পূজা করেন। উক্ত পুণ্যের প্রভাবে উক্ত বিদ্যাধর অগণিতবার সুগতিপ্রাপ্ত হয়ে অন্তিম জন্মে আমাদের গৌতম বুদ্ধের সময়ে মহাশ্রাবকের একজন হিসাবে পরিগণিত হয়েছিলেন। তিনি হলেন ধর্মব্যাখ্যায় শ্রেষ্ঠ উপাধিপ্রাপ্ত মহাশ্রাবক কচ্চায়ন মহাথের| (ইহা অপদান অট্ঠকথা ২য় খন্ড ৫৩ নং এবং ২১২ নং পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে)
(খ) ' ুপ্পিয়_মহাথের' -সুমেধ বুদ্ধ হিমবন্তায় অবস্হান করাকালে জনৈক বিদ্যাধর ত্রিশাখা বিশিষ্ট একটি গাছের ডাল হস্তে ধারণ পূর্বক আকাশ মার্গে বিচরণ করাকালে বুদ্ধের সাক্ষাত প্রাপ্ত হলে অতীব শ্রদ্ধার সহিত তিনটি স্বর্গীয় দেবফুল দ্বারা বুদ্ধের পূজা করেন| উক্ত পুণ্যের প্রভাবে উক্ত বিদ্যাধর সুমেধ বুদ্ধের সময় হতে গৌতম বুদ্ধের সময় পর্যন্ত দীর্ঘ ত্রিশ হাজার কল্প কোনকালে দূর্গতিপ্রাপ্ত না হয়ে পাচশত জন্ম দেবরাজ হিসাবে, তিনশত জন্ম চক্রবর্তী রাজা হিসাবে জন্ম নিয়ে অগণিতবার সুগতিপ্রাপ্ত হয়েছিলেন| কোন জন্মে দ্বীন দরিদ্র ও হীনকূলে জন্মগ্রহন না করে শুধু ধন সম্পদশালী উচ্চ বংশে জন্মগ্রহন করেছিলেন| গৌতম বুদ্ধের সময় শ্রাবস্তী নগরীর অন্যতম শ্রেষ্ট এক শ্রেণীর পুত্র হিসাবে জন্ম নিয়ে মাত্র সাত দিন বয়সে অরহৎ হয়েছিলেন| তিনিই হলেন অরহৎ পুপ্পিয় থের| (ইহা পূর্বোক্ত গ্রন্থের ৮৫ নং পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে|)
(গ) ' #উত্তর_শ্রেষ্ঠী' -সুমেধ বুদ্ধ হিমবন্ত অরণ্যে বিচরণের সময় জনৈক বিদ্যাধর আকাশমার্গে উড়ে এসে সুমেধ বুদ্ধকে তিনটি স্বর্গীয় দেবফুল দ্বারা পূজা করেন| উক্ত পুণ্যের প্রভাবে তিনি পাঁচশতবার দেবরাজ হিসাবে, তিনশতবার চক্রবর্তী রাজা হিসাবে জন্ম নিয়ে সর্বদা সুগতিপ্রাপ্ত হয়েছিলেন| কোন জন্মেই তাকে দুঃখ দুর্দশা ও অভাবের আগুন স্পর্শ করতে পারেনি| এই ভদ্র কল্পে গৌতম বুদ্ধের সময়ে তিনি শ্রাবস্তীতে "উত্তর" নামক শ্রেষ্ঠী পুত্র হিসাবে জন্ম নিয়ে মাত্র ৭ দিন বয়সেই অরহত্ব প্রাপ্ত হন| (ইহা পূর্বোক্ত গ্রন্হের ১৭৫ নং পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে)| উপরে বর্ণিত তিনজন অরহতের পূর্বজন্মের গল্প হতে পাই যে-
(১) লোকভূমিতে বিদ্যাধরগণ আছেন,
(২) বিদ্যাধরগণ আকাশে বিচরণ করার ক্ষমতাসহ বহুবিধ ঋদ্ধির অধিকারী|
(ঘ) #পিলিন্দবচ্ছ_মহাথের -শ্রাবস্তীর অধিবাসী পিলিন্দবচ্ছ ছিলেন একজন চুল গন্ধারী বিদ্যাধর| তিনি আকাশে বিচরণ করতে পারতেন, অন্যের চিত্তকে বুঝতে পারতেন| রাজগৃহের রাজার শ্রদ্ধা ও পূজা সৎকারপ্রাপ্ত হয়ে তিনি বহু খ্যাতি ও যশ অর্জন করেছিলেন| গৌতম বুদ্ধ রাজগৃহে আগমন করলে পিলিন্দবচ্ছের বিদ্যার ক্ষমতা বিলুপ্ত হয়ে যায়| এহেন অভূতপূর্ব সমস্যার সম্মুখীন হলে তিনি চিন্তা করেন যে, মহাগন্ধারী বিদ্যাধর যে স্হানে আগমন করেন সে স্হানে চুলগন্ধরী বিদ্যার ক্ষমতা বিলুপ্ত হয় (অকেজো হয়) এভাবে তার পূর্ববর্তী গুরুদের উক্তি তার মনে হলো| তখন তিনি আমার চুল গন্ধারী বিদ্যার কষমতা বিলুপ্ত হওয়ার কারণ নিশ্চয় কোন এক মহাগন্ধারী বিদ্যাধর এখানে আগমন করেছেন| এখন গৌতম বুদ্ধ রাজগৃহে আগমন করেছেন বলে শুনেছি| গৌতম বুদ্ধ তাহলে নিশ্চয় একজন মহান্ধারী বিদ্যাধর হবেন| এই ভেবে তিনি গৌতম বুদ্ধের নিকট গমন করে বুদ্ধের নিকট প্রব্রজ্যার প্রার্থনা করেন| তখন গৌতম বুদ্ধ তাকে প্রব্রজ্যা দিয়ে উপযুক্ত ধর্মদেশনা করেন এবং (কর্মস্হান) বিদর্শন সাধনা করতে নির্দেশ দিলে অল্পকালের মধ্যে তিনি অরহত্ব মার্গফলে প্রতিষ্ঠিত হন|
(ঙ) #জটিল_শ্রেষ্ঠীর_বিদ্যাধর_পিতা বারাণসী রাজ্যে জনৈক শ্রেষ্ঠীর এক অপরুপ সুন্দরী কন্যা ছিলেন| যৌবনে পদার্পণ করলে কন্যাকে সাততলা বিশিষ্ট প্রাসাদের সপ্তম তলায় কড়া প্রহরায় অতিযত্নে রাখা হয়| একদা কন্যাটি বাতায়ন খুলে বহির্দৃশ্য অবলোকন করাকালে এক বিদ্যাধর আকাশ মার্গে উড়ে যাবার সময় উক্ত কন্যাকে দেখে প্রেমে পড়ে যান এবং তারা এভাবে মিলিত হলে তাদের ঔরষ্যে একটি পুত্র সন্তান জন্ম লাভ করেন| পরবর্তীকালে উক্ত পুত্র সন্তানটি রাজগৃহের পয়তাল্লিশ জন সর্বশ্রেষ্ঠ শ্রেষ্ঠীর অন্যতম একজন হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেন জটিল শ্রেষ্ঠী নামে| এই ঘটনা পাঠে চুলগন্ধারী বিদ্যাধরগণও সাধারণ মানুষের মত প্রেম-প্রীতির সংযোজন ছিন্ন করতে সহজে পারেন না তা বুঝা যায়| (ইহা ধর্মপদ অট্ঠকথা ২য় খন্ড ২৯৩ নং পৃষ্ঠায় উল্লেখিত আছে|
(৪) #লোকীয়_বিদ্যা_ও_লোকীয়_বিদ্যাধর:
বুদ্ধ শাসন বহির্ভূত সময়ে সরভঙ্গ,সুমেত্ত, অরক প্রভৃতি ঋষি মুনিদের মত যারা কসিনা (কৃৎস্ন) কর্মস্হান সাধনার মাধ্যমে ধ্যানবল প্রাপ্ত হয়ে ত্রিবিদ্যা,অষ্টবিদ্যা লাভ করেন তাদেরকে লোকীয় বিদ্যাধর এবং ঐ বিদ্যাকে লোকীয় বিদ্যা বলা হয়| লোকীয় বিদ্যাধরগণ অত্যন্ত ক্ষমতাশালী অলৌকিক শক্তিধর হন| তারাও দেব ব্রম্মাদের শক্তিকে ম্লান করে দিতে পারতেন| বুদ্ধের শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞা এই তিন শিক্ষার মধ্যে সমাধি এই বিদ্যার শিক্ষা হয়| সমথ ও বিদর্শনের মধ্যে সমথই এই বিদ্যার অন্তর্গত হয়| ঋষি কিষবচ্ছ, নারদ ও দেবিল ঋষিসহ অনেক লৌকীয় বিদ্যাধরের গল্প বিভিন্ন জাতক ও বিভিন্ন গ্রন্হে পাওয়া যায়|
(৫) #আর্য_বিদ্যা_ও_আর্য_বিদ্যাধর:
অনিত্য বিদ্যা, দুঃখ বিদ্যা, অনাত্মাবিদ্যা, মার্গ বিদ্যা, ফল বিদ্যা এবং চতুরার্য্য সত্য জ্ঞানকে আর্যবিদ্যা বলা হয়|
চার প্রকারের আর্যবিদ্যাধর :
ক) শ্রোতাপন্ন বিদ্যাধর
খ) সকৃদাগামী বিদ্যাধর
গ) অনাগামী বিদ্যাধর ও
ঘ) অরহৎ বিদ্যাধর |
#দীক্ষিত_শিষ্যদের_করণীয়:
মহাগন্ধারী বিদ্যা শোয়েয়াংগ্য ইচ্ছাসয় মহিদ্ধীজে গইং এর দীক্ষাপ্রাপ্ত শিষ্যগণের পুতি জপ করা, সমথ ভাবনা করা সাধনার প্রারম্ভিক পর্যায়ের করণীয় কর্ম হয়| পুণ্য অর্জনের জন্য রোগী দুঃখীদের সেবা করা এবং সমথ ভাবনা করা চুলগান্ধারী বিদ্যা অনুসরণকারীদের প্রাথমিক করণীয় হলেও শীল সমাধি ও প্রজ্ঞার স্তর উন্নীত হয়ে আর্যবিদ্যাধর হওয়ার জন্য বিদর্শন ভাবনাই হচ্ছে মহাগন্ধারী বিদ্যা অনুসরণকারীদের মুখ্য করণীয়|
তাই মার্গফল প্রাপ্তির জন্যে আমাদেরকে আর্যষ্টাঙ্গিক মার্গকেই জীবনের সর্বক্ষেত্রে অনুসরণ, অনুকরণ ও প্রভাবিত করতে হবে| কারণ অভি ভোগ বা অতি ত্যাগ বুদ্ধের নির্দেশিত পথ নয়| নয় অতি ভোগ, নয় অতি ত্যাগ, এর মধ্যবর্তী পথই বুদ্ধের "মজ্ঝিমপটিপদা" এবং তাই মুক্তির একমাত্র ঋজু পথ, এর কোন বিকল্প নেই| এই পথে চলা ব্যতীত সাধক কখনো চতুরার্য্য সত্যকে দর্শন ও উপলব্ধি করতে পারবেন না|
মজ্ঝিমপটিপদা' বলতে নিম্নে বর্ণিত আট প্রকার মার্গ বা পথকে (আর্য-অষ্টাঙ্গিক মার্গ) বুঝায়|
১) সম্মা দিটঠি (সম্যক দৃষ্টি)
২) সম্মা সংকল্প (সম্যক সংকল্প)
৩) সম্মা বাচ (সম্যক বাক্য)
৪) সম্মা কম্মান্ত (সম্যক কর্ম)
৫) সম্মা আজীব (সম্যক জীবিকা)
৬) সম্মা ব্যায়াম (সম্যক ব্যায়াম)
৭) সম্মা সতি (সম্যক স্মৃতি)
৮) সম্মা সমাধি (সম্যক সমাধি)
#উৎস : শোয়েয়াংগ্য দীক্ষা ও বিদর্শন সাধনা পদ্ধতি -উ পঞ্ঞা জোত মহাথের