11/10/2025
গত বৃহস্পতিবারে আলোচ্য বিষয় সমূহে সারসংক্ষেপ
আলোচ্য বিষয়:- আল্লাহ, কুরআন ও রাসূল ﷺ–কে অবমাননা: ঈমান ধ্বংসের পথ।
স্থান:- আপসন পূর্ব পাড়া জামে।
আলোচক ছিলেন:- শাইখ নাজমুল বিন সাইদুর রহমান।
♦️গালি বা السب ও অবমাননা করার পরিচয়
👉গালি বা السب এর শাব্দিক অর্থ:
গালি তথা “السبّ” শব্দটি এসেছে “سَبَبَ” (সাব্বা) ধাতু থেকে, যার অর্থ হলো — গালি দেওয়া, অপমান করা।
এই باب (মূলধাতু)-এর আসল অর্থ “কাটা” বা “বিচ্ছিন্ন করা”।
👉শরীয়তের পরিভাষায় (ইসলামী সংজ্ঞায়):
উলামাদের মাঝে “سبّ” (গালি)-এর সংজ্ঞা ভিন্ন ভিন্নভাবে বর্ণিত হয়েছে। আল-দাসূকী রহঃ বলেন:
“السَّبُّ هُوَ الشَّتْمُ، وَهُوَ كُلُّ كَلَامٍ فَبِيحٍ، وَحِينَئِذٍ فَالْقَذْفُ وَالاسْتِخْفَافُ بِحَقِّهِ، وَإِلْحَاقُ النَّقْصِ بِهِ، كُلُّ ذَلِكَ دَاخِلٌ فِي السَّبِّ.”
অর্থাৎ “গালি (السبّ) হচ্ছে অশালীন কথা বলা। যে কোনো নোংরা বা অশোভন কথা ,তাই গালি। সুতরাং কারো প্রতি অপবাদ দেওয়া (قذف), কারো অধিকারকে তুচ্ছ করা (استخفاف), বা তার মানহানি করা (إلحاق النقص) —সবকিছুই গালির অন্তর্ভুক্ত।
👉ইমাম নববী রহঃ বলেন:
“السَّبُّ في اللغة الشتم، والتكلم في عرض الإنسان بما يعيبه.”
অর্থাৎ “ভাষাগতভাবে ‘সাব্ব’ মানে গালি দেওয়া, এবং মানুষের সম্মান বা ইজ্জতের ব্যাপারে এমনভাবে কথা বলা যা তাকে হেয় বা লজ্জিত করে।”
👉ইমাম সূয়ুতী রহ: বলেন:
“السب شتم الإنسان والتكلم في عرضه بما يعيبه.”
অর্থাৎ “‘সাব্ব’ মানে কাউকে গালি দেওয়া, এবং তার সম্মানহানিকর কথা বলা।”
👉শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ রহঃ বলেন:
“السب الذي ذكرنا حكمه من المسلم هو: الكلام الذي يقصد به الانتقاص والاستخفاف، وهو ما يفهم منه السب في عقول الناس على اختلاف اعتقاداتهم، كاللعن والتقبيح ونحوه.”
অর্থাৎ “মুসলমানের পক্ষ থেকে যে ‘গালি’ বলা হয় তার অর্থ হলো — এমন কথা যার উদ্দেশ্য অন্যকে হেয় করা, তুচ্ছ করা বা অপমান করা। এমন কথা যা সাধারণ মানুষের বোধে ‘গালি’ হিসেবে বোঝা যায় — যেমন অভিশাপ দেওয়া (لعن), কটূক্তি করা (تقبيح), ইত্যাদি।”
👉কুরআনুল কারীমকে তুচ্ছ বা অবমাননা করা আল্লাহ তাআলার প্রতি কুফুর এবং ইসলামের ধর্ম ত্যাগ করার অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তাআলা বলেন:
قال تعالى: ﴿وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ (٦٥) لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ إِنْ نَعْفُ عَنْ طَائِفٍ مِنْكُمْ نُعَذِّبْ طَائِفًا بِأَنَّهُمْ كَانُوا مجرمين﴾ [التوبة: ٦٥، ٦٦]
তিনি (আল্লাহ) বলেন: “এবং যদি তুমি তাদেরকে জিজ্ঞাসা কর, তারা বলবে: ‘আমরা কেবল খেলা করছি এবং মজা করছি।’ বলো: ‘তুমি কি আল্লাহ ও তাঁর আয়াত এবং তাঁর রাসুলকে উপহাস করছ?’ ক্ষমা চাও না, তুমি ইতিমধ্যেই ঈমানের পর কুফুরে পতিত হয়েছ। যদি আমরা তোমাদের মধ্যে কিছু মানুষকে ক্ষমা করি, আমরা অন্যদের শাস্তি দেব, কারণ তারা অপরাধী ছিল।”
وقال تعالى: ﴿وَقَدْ نَزَّلَ عَلَيْكُمْ فِي الْكِتَابِ أَنْ إِذَا سَمِعْتُمْ آيَاتَ اللَّهِ يُكْفَرُ بِهَا وَيُسْتَهْزَأُ بِهَا فَلَا تَقْعُدُوا مَعَهُمْ حَتَّى يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ إِنَّكُمْ إِذًا مِثْلُهُمْ إِنَّ اللَّهَ جَامِعُ الْمُنَافِقِينَ وَالْكَافِرِينَ فِي جَهَنَّمَ جَمِيعًا﴾ [النساء: ١٤٠]
তিনি বলেন: “এবং তোমাদের উপর কিতাব নাজিল হয়েছে যে, যখন তুমি শুনবে আল্লাহর আয়াত যা কুফুর বা ঠাট্টার বিষয়, তখন তাদের সাথে বসো না যতক্ষণ না তারা অন্য কিছুর কথা বলে। নিশ্চয়ই তখন তুমি তাদের মতো হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ মুনাফিক ও কুফারদের একসাথে জাহান্নামে মিলিত করবেন।”
وقال تعالى: ﴿وَإِذَا رَأَيْتَ الَّذِينَ يَخُوضُونَ فِي آيَاتِنَا فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ حَتَّى يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ وَإِمَّا يُنْسِيَنَّكَ الشَّيْطَانُ فَلَا تَقْعُدْ بَعْدَ الذِّكْرَى مَعَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ﴾ [الأنعام: ٦٨]
তিনি বলেন: “যখন তুমি দেখবে যারা আমাদের আয়াত নিয়ে তর্ক করছে/ঠাট্টা করছে, তাদের থেকে সরে যাও যতক্ষণ না তারা অন্য কিছুর কথা বলছে। আর যদি শয়তান তোমাকে ভুলিয়ে দেয়, স্মরণের পর অন্যায়কারীদের সঙ্গে বসো না।”
قال إسحاق كما في تعظيم قدر الصلاة لمحمد بن نصر المروزي (۲) ۹۳۲: وَكُلُّ شَيْءٍ مِنَ الْوَقِيعَةِ فِي اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ أَوْ فِي شَيْءٍ أَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَى عَلَى أَنْبِيَائِهِ فَهُوَ كُفْرٌ يُخْرِجُهُ مِنْ إِيمَانِهِ، وَإِنْ كَانَ مُقِرًّا بِكُلِّ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَى
ইসহাক বলেছেন (মুহাদ্দিসরা): “এবং আল্লাহর প্রতি বা আল্লাহ যে কিছু তাঁর নবীদের প্রতি অবতীর্ণ করেছেন তার বিরুদ্ধে যে কোনো অবমাননা এটি কুফুর, যা মানুষকে তার ঈমান থেকে বের করে দেয়, যদিও সে আল্লাহর নাজিলকৃত সমস্তকিছুর স্বীকার।”
وقال ابن حزم رحم الله في المحلى بالآثار (۱۲/٤٣٨): كُلَّ مَنْ سَبَّ اللَّهَ تَعَالَى، أَوْ اسْتَهْزَأَ بِهِ، أَوْ سَبَّ مَلَكًا مِنْ الْمَلَائِكَةِ أَوْ اسْتَهْزَأَ بِهِ، أَوْ سَبَّ نَبِيًّا مِنْ الْأَنْبِيَاءِ، أَوْ اسْتَهْزَأَ بِهِ، أَوْ سَبَّ آيَةً مِنْ آيَاتِ اللهَ تَعَالَى، أَوْ اسْتَهْزَأَ بِهَا، وَالشَّرَائِعُ كُلُّهَا، وَالْقُرْآنُ مِنْ آيَاتِ اللهِ تَعَالَى فَهُوَ بِذَلِكَ كَافِرٌ مُرْتَدٌ، لَهُ حُكْمُ الْمُرْتَدُ، وَبِهَذَا نَقُولُ - وَبِاللَّهِ تَعَالَى التَّوْفِيقُ
ইবন হজম রহঃ বলেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহকে নিন্দা করে বা উপহাস করে, অথবা ফেরেশতা, নবী বা আল্লাহর আয়াতকে নিন্দা বা উপহাস করে, অথবা শরিয়তের সকল বিধান এবং কুরআনকে অবমাননা করে সে কুফুরে পতিত, এবং তার ওপর রিদ্দার হুকুম প্রযোজ্য। এটাই আমাদের সিদ্ধান্ত। আল্লাহই সাহায্যকর্তা।”
وقال القاضي عياض في الشفا (۲/۳۰۴): وأعلم أن من استخف بالقرآن أو المصحف أو بشيء منه أو سبهما أو جحده أو حرفًا منه أو آية أو كذب به أو بشيء منه أو كذب بشيء ما صرح به فيه من حكم أو خبر أو أثبت ما نفاه أو نفى ما أثبته على علم منه بذلك أو شك في شيء من ذلك فهو كافر عند أهل العلم بإجماع
ইমাম ইবনু রজব (রহ.) জামি‘উল উলূম ওয়াল হিকাম (১/৩১৮)-এ বলেন—
وقد يترك دينه، ويفارق الجماعة، وهو مقرّ بالشهادتين، ويدّعي الإسلام، كما إذا جحد شيئاً من أركان الإسلام، أو سب الله ورسوله، أو كفر ببعض الملائكة أو النبيين أو الكتب المذكورة في القرآن مع العلم بذلك.
অর্থাৎ “কখনও এমনও হয় যে একজন ব্যক্তি নিজের ধর্ম ত্যাগ করে, মুসলিম সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। যদিও সে মুখে শাহাদাতদ্বয় উচ্চারণ করে এবং নিজেকে মুসলমান বলে দাবি করে। যেমন: যদি সে ইসলামের কোনো রুকন অস্বীকার করে, অথবা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে গালি দেয়, অথবা ফেরেশতা, নবী, বা কুরআনে বর্ণিত কোনো কিতাবের প্রতি কুফরি করে, যদিও সে এগুলো সম্পর্কে অবগত থাকে।”
♦️রাসূল (সাঃ) গালি বা অবমাননা করা বিধান:
হারব তাঁর মাসাইল গ্রন্থে মুজাহিদ থেকে উল্লেখ করেছেন যে, উমরের (রাঃ) কাছে এমন এক ব্যক্তিকে আনা হয়েছিল, যে নবী ﷺ-কে গালি দিয়েছিল; তখন উমর তাকে হত্যা করেন। এরপর উমর (রাঃ) বললেন:
مَنْ سَبَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ، أَوْ سَبَّ أَحَدًا مِنَ الأَنْبِيَاءِ فَاقْتُلُوهُ
“যে কেউ আল্লাহ বা তাঁর রসূলকে গালি দেয়, অথবা কোনো নবীকে গালি দেয়, তাকে হত্যা কর।”
মুজাহিদ ইবন আব্বাস (রাঃ)-এর থেকে বর্ণনা করে বলেন :
أَيُّمَا مُسْلِمٍ سَبَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ، أَوْ سَبَّ أَحَدًا مِنَ الأَنْبِيَاءِ، فَقَدْ كَذَّبَ بِرَسُولِ اللَّهِ ﷺ
যে কোনো মুসলমান আল্লাহ বা তাঁর রসূলকে, অথবা কোনো নবীকে গালি দেয় ,সে বাস্তবে রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে মিথ্যাবাদী বলে সাব্যস্ত করল। আর এটি হলো রিদ্দাহ (ইসলাম ত্যাগ করা)। তাকে তওবা করতে বলা হবে; যদি ফিরে আসে (তওবা করে), তবে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে, আর যদি না ফিরে আসে, তবে তাকে হত্যা করা হবে।
وَذَكَرَ أَحْمَدُ عَنِ ابْنِ عُمَرَ أَنَّهُ مَرَّ بِهِ رَاهِبٌ، فَقِيلَ لَهُ: هَذَا يَسُبُّ النَّبِيَّ ﷺ , فَقَالَ ابْنُ عُمَرَ: لَوْ سَمِعْتُهُ لَقَتَلْتُهُ
এবং ইমাম আহমদ ইবন উমর (রাঃ)-এর থেকে বর্ণনা করেছেন যে, একবার তাঁর পাশ দিয়ে এক রাহিব (খ্রিষ্টান ধর্মগুরু) যাচ্ছিল, তখন লোকেরা বলল: “এই লোক নবী ﷺ-কে গালি দেয়।” তখন ইবন উমর (রাঃ) বললেন: “আমি যদি নিজে তা শুনতাম, তবে অবশ্যই তাকে হত্যা করতাম।”
শায়েখ ইবন বায (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর “ফাতাওয়া নূর ‘আলা আদ-দারব” গ্রন্থে (৪/১৪৬–১৪৯ পৃ.) বলেছেন :
“দ্বীনকে গালি দেওয়া ইসলাম ধ্বংসকারী সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহগুলোর একটি।
কারণ সমস্ত আলেমদের ঐকমত্য যে, দ্বীনকে গালি দেওয়া ইসলাম থেকে বেরিয়ে যাওয়া (রিদ্দাহ)।এটি মজা বা ঠাট্টার চেয়েও বেশি মারাত্মক। আল্লাহ তাআলা বলেন:
(قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ • لَا تَعْتَذِرُوا قَد كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ) [التوبة: 65-66]
“বলুন, তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াত ও তাঁর রসূলকে নিয়ে ঠাট্টা করছিলে? অজুহাত দিও না, তোমরা তো ঈমান আনার পর কাফের হয়ে গেছ।” (সূরা আত-তাওবা, ৯:৬৫–৬৬)
নবী ﷺ-এর যুগে এক দাসী ছিল, সে দ্বীনকে গালি দিত। তার প্রভু তাকে বারবার নিষেধ করেও যখন সে তওবা করেনি, তখন সে তাকে হত্যা করে। নবী ﷺ তখন বলেছিলেন: “তোমরা সাক্ষী থাকো, তার রক্ত অপচয় নয়।”
অতএব দ্বীনকে গালি দেওয়া ইসলাম থেকে বের করে দেয়, যেমন নবী ﷺ-কে গালি দেওয়াও ইসলাম ত্যাগের সমান। এবং এমন ব্যক্তির রক্ত হালাল হয়ে যায় (অর্থাৎ সে হত্যাযোগ্য), আর তার সম্পদ রাষ্ট্রের (বাইতুল মাল)-এর অধীনে চলে যায়। কারণ সে মুরতাদ (ইসলাম ত্যাগকারী), যে ইসলাম ভঙ্গকারী কাজ করেছে।
الله أعلم بالصواب